করোনার কারণে পরপর দু'বছর মন্দা থাকায় এবার ঈদকেন্দ্রিক অর্থনীতি মোটামুটি স্বাভাবিক ধারায় ফিরেছে। গত দুই বছর ঈদকেন্দ্রিক বেচাকেনা ঝিমিয়ে থাকলেও এ বছর তুলনামূলক জমে উঠেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, করোনার আগের সময়, অর্থাৎ ২০১৯ সালের তুলনায় এ বছর বেচাকেনা বেড়েছে। তবে সবাই যে খুব ভালো ঈদ করতে পারছেন, তা নয়। দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের অনেকের কাছে ঈদের খুশি সেভাবে ধরা দেয়নি।

গত দুই বছর রমজানে ইফতার পার্টি, বিয়ে, ঈদের ছুটিতে গ্রামে ফেরা ও ভ্রমণ- সবই ছিল সীমিত। এবার এসব কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক। করোনার আগের মতোই প্রচুর মানুষ শহর থেকে গ্রামে ফিরেছে। ভ্রমণকেন্দ্র জমে উঠেছে। ফলে পরিবহন খাতের ব্যবসাও ভালো হয়েছে। রাজধানী ঢাকার বিপণিবিতান, ফুটপাত সব খানেই বেচাকেনা বেড়েছে। সমকালের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, বিভাগীয় ও জেলা শহরেও একই অবস্থা।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি জানিয়েছে, এবারের ঈদে ২০১৯ সালের তুলনায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বেশি বেচাকেনা হয়েছে। সমিতির প্রাথমিক প্রাক্কলন, এবারের ঈদে সারাদেশে এক লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার বেচাকেনা হবে। দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলালউদ্দিন সমকালকে বলেন, এ বছর ঈদে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি বেচাকেনা হয়েছে। করোনার সময়ে অনেক ব্যবসায়ী লোকসানে পড়েছিলেন। এ বছর তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। অনেক নতুন পুঁজি গঠনের সুযোগ পেয়েছেন।

দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ড আড়ং জানিয়েছে, গত ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশের ২৫টি বিক্রয়কেন্দ্র ও অনলাইনে তাদের ২৫ লাখ পিস পোশাক বিক্রি হয়েছে। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আজকের ডিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফাহিম মাশরুর সমকালকে বলেন, ঈদ উপলক্ষে বেচাকেনা দ্বিগুণ হয়েছে। বলা যায়, করোনার চেয়ে এ বছর অনলাইনে বেচাকেনা বেশি। চালডাল ডটকমের সিইও জিয়া আশরাফ সমকালকে বলেন, রমজানজুড়ে দৈনিক গড়ে ১২ হাজার অর্ডার সরবরাহ করা হয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে অনেক বেশি। রিকন্ডিশন্ড গাড়ি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বারভিডার সভাপতি আবদুল হক সমকালকে বলেন, গত দুই বছরের তুলনায় এ বছর দেশে গাড়ির চাহিদা বেড়েছে। ঈদ সামনে রেখে এ বছর ব্যক্তিগত গাড়ি বিক্রি বেড়েছে।

গবেষণা সংস্থা সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম সমকালকে বলেন, করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যুহার কমে যাওয়ায় মানুষ স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পেরেছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। অনিশ্চয়তা কেটে গেছে। ফলে ব্যবসায়ীরা বাড়তি বিনিয়োগ করেছেন। আর ভোক্তারা গত দুই বছর অনিশ্চয়তার কারণে খরচে যে লাগাম টেনেছিলেন, সেখান থেকে সরে এসে কেনাকাটা বাড়িয়েছেন। ফলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাঙ্গা ভাব সৃষ্টি হয়েছে। তবে এ সময়ে মূল্যস্ম্ফীতির কারণে সমাজের নিম্ন ও স্বল্প আয়ের মানুষ সমস্যায় আছে। সামগ্রিক অর্থনীতির গতির সঙ্গে তাদের জীবন চলছে না।

ঈদে সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকে পোশাক ও জুতার। এ ছাড়া এসি, টিভি, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, ব্লেন্ডার, ইলেকট্রিক কুকারসহ বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক পণ্য, মোবাইল ফোন, মোটরসাইকেল বিক্রিও বেড়েছে। এমনকি খেলনা বিক্রিও বেড়েছে। এদিকে কয়েক দিন ধরে দেশের গ্রামগঞ্জের হাটবাজারগুলোতেও বেশ জমজমাট বেচাকেনা হচ্ছে। শহরে থাকা চাকরিজীবী, পেশাজীবী, শ্রমজীবী মানুষ ঈদ করতে গ্রামে ফিরেছেন। ফলে গ্রামে ভোগ্যপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য ও সেবার বাড়তি চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে পরিবহন সেবার চাহিদা বেড়েছে।

বাগেরহাটের মোল্লাহাট উপজেলার দারিয়ালা গ্রামের মুদি দোকানদার শিকদার আতাউর রহমান সমকালকে বলেন, সেমাই, চিনি, দুধ, ভোজ্যতেল, বিভিন্ন ধরনের মসলা, পোলাও চাল, কোমল পানীয় ও চায়ের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। একই গ্রামের ভ্যানচালক জসিমউদ্দিন বলেন, এক সপ্তাহ ধরে প্রচুর মানুষ যাতায়াত করছেন। তার আয়ও বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। পাশের গ্রাম কাচনার কৃষক আবদার জানান, তার ক্ষেতের প্রায় ৯০০ বাঙ্গি গত এক সপ্তাহে বিক্রি হয়েছে। তিনি দামও পেয়েছেন ভালো।

এদিকে ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ মনে করছে, এবারের ঈদের ছুটিতে কমপক্ষে ১০ লাখ মানুষ দেশের বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে ভ্রমণ করবেন। এ জন্য দেশের প্রধান প্রধান পর্যটন কেন্দ্র কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সিলেট, বান্দরবানের হোটেল-মোটেলসহ পর্যটন-সংশ্নিষ্টরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন

লেনদেন চাঙ্গা: এবার ঈদের অর্থনীতির চাঞ্চল্যের প্রভাব পড়েছে ব্যাংক লেনদেনে। বাড়তি লেনদেনের কারণে সাপ্তাহিক ছুটির দিন গতকাল শনিবার সারাদেশে ব্যাংক খোলা ছিল। ব্যাংক খোলা রাখার কারণ ব্যাখ্যায় বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, এ বছর ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ব্যবসা-বাণিজ্যে অধিক পরিমাণে লেনদেন সংঘটিত হচ্ছে বিধায় ব্যাংক ব্যবস্থায় নগদ অর্থ জমা ও উত্তোলনের পরিমাণ বেড়েছে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ব্যাংক খোলা রাখার সিদ্ধান্তে অনেক ব্যাংকারের মধ্যে অসন্তোষ থাকলেও এ দিন বেশ লেনদেন হয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা। বিশেষ করে অনেক ব্যবসায়ী টাকা জমা দিয়েছেন।

রাষ্ট্রীয় মালিকানার অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শামস-উল ইসলাম সমকালকে বলেন, এবার ঈদের অর্থনীতি অনেক চাঙ্গা। কেনাকাটার পাশাপাশি অনেকে বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। আমদানি দায় মেটাতেও অনেক বেশি ব্যয় হচ্ছে। যে কারণে ডলারের দর বাড়ছে। শনিবারও ব্যাংকগুলোতে বেশ লেনদেন হয়েছে।

ঢাকার বাইরের চিত্র: চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, করোনার ভয়াবহতা কমে আসায় ঈদ সামনে রেখে এবার বেশ বিনিয়োগ করেন ব্যবসায়ীরা। আশানুরূপ বেচাকেনা হওয়ায় সেই বিনিয়োগ ফল দিয়েছে। রমজান মাসের শুরু থেকেই শপিংমলে আসছেন ক্রেতারা। চট্টগ্রামের মিমি সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এ কে এম আব্দুল হান্নান চৌধুরী বলেন, 'মিমি সুপার মার্কেট বিদেশি ব্র্যান্ডের জিনিসপত্রের জন্য বিখ্যাত। মার্কেটের এই খ্যাতি ধরে রাখতে এবারের ঈদে নতুন করে প্রায় ১২০ থেকে ১২৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন ব্যবসায়ীরা। বেচাকেনাও ভালো হচ্ছে। আমিন সেন্টার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি শাহিদ আলী সমকালকে বলেন, 'পরপর দুই বছর করোনার কারণে ব্যবসা করা যায়নি। করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় ব্যবসায়ীরা নতুন করে বিনিয়োগ করেছেন। ফলে কিছুটা হলেও এই ঈদে ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা যাবে। চট্টগ্রামের ডিজাইনার্স ফোরামের প্রধান উপদেষ্টা রওশন আরা চৌধুরী বলেন, এবার ঈদে বেচাকেনা হয়েছে বেশ।

বরিশাল ব্যুরো জানায়, বিপুলসংখ্যক মানুষ ঈদ উদযাপন করতে কর্মস্থল থেকে ফিরেছেন স্বজনের কাছে। তারা ঈদ উৎসবের জন্য করছেন প্রচুর কেনাকাটা। শ্রমজীবী মানুষেরও আয় বেড়েছে এ সময়। হিজলা উপজেলার অন্যতম বাণিজ্যিক এলাকা খুলনা বন্দরের হাওলাদার বস্ত্র বিতানের মালিক গণি হাওলাদার সমকালকে বলেন, রমজানের শেষ সপ্তাহ থেকে বিক্রি বেড়েছে। এখন প্রতিদিন যেভাবে ক্রেতা আসছেন এবং কেনাকাটা করছেন, সেভাবে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকলে গত দুই বছরের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। বরিশাল নগরীর কাশিপুরের মুদি ব্যবসায়ী মাহেব হোসেন বলেন, সব শ্রেণির ক্রেতাই ঈদের প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী কিনছেন। তার দোকানে এখন ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা বিক্রি হচ্ছে প্রতিদিন। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বিক্রি বেড়েছে তিন গুণ।

খুলনা ব্যুরো জানায়, গত দুই বছর করোনার প্রকোপে ঈদ ছিল অনেকটা নিরানন্দ। মানুষের কাজকর্ম কমে যাওয়ায়, আবার কারও কারও কাজকর্ম না থাকায় অনেকের হাতে টাকা ছিল না। টাকা না থাকায় মার্কেটে ভিড় ছিল তুলনামূলক কম। তা ছাড়া করোনার ভয়ে মানুষের ভিড়ের মধ্যে অনেকে গত দুই বছর ঈদের সময় মার্কেটে আসেননি। কিন্তু এবারের ঈদে আর সেই চিত্র নেই। শুক্রবার বিকেল ৪টায় নগরীর ক্লে রোডে গিয়ে দেখা যায়, চারদিকে শুধু মানুষ আর মানুষ। মানুষের চাপ বেড়ে যাওয়ায় এই সড়কটিতে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এই সড়কটির দুই পাশে রয়েছে ১৮ থেকে ২০টি শপিংমল। ঈদের আগে শেষ সময়ে সবাই ছুটছেন কেনাকাটা করতে। সড়কটির মুখে ডাকবাংলো মোড়ে দেখা এনজিওকর্মী মুরাদ শেখের সঙ্গে। তিনি বলেন, দুই বছরের ব্যবধানে আবার ঈদের আনন্দ ফিরে এসেছে। মার্কেটগুলোতে এখন উপচে পড়া ভিড়। গত বছর রোজার ঈদের সময় তিনি বোনাস পাননি। এবারের ঈদে বোনাস পাওয়ায় পরিবারের সদস্যদের জন্য ঈদের পোশাক কিনতে পেরেছেন।

বিষয় : ঈদের অর্থনীতি ঈদকেন্দ্রিক অর্থনীতি

মন্তব্য করুন