চিন্তার ঐশ্বর্যে, প্রচলিত সব সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে পেরেছেন যারা তাদেরই একজন ছিলেন আবুল মাল আবদুল মুহিত। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের চল্লিশ ছুঁই ছুঁই সময় থেকে টানা দশ বছরের অর্থমন্ত্রী ছিলেন তিনি। বারোটি অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন ও পেশ করার এক সফল ও সার্থক কারিগর আবুল মাল আবদুল মুহিত। আজ অর্ধশত বছরের বাংলাদেশের যে উন্নয়ন উজ্জ্বলতা, এর পেছনের অর্থনৈতিক গতিপ্রকৃতি নির্মাণ আর সাহসের অন্যতম কারিগর আবুল মাল আবদুল মুহিত।
ক্ষুদ্র-স্বার্থহীন প্রবহমান নীতিদর্শনে লালিত এক কর্মবীর। পৃথিবী যে সময়কে হারিয়ে এসেছে, যে সময়ের শিক্ষা ও প্রগতি ভাবত বৃহত্তর জনসমষ্টির কল্যাণ, সে সময়ের ব্রতী মুহিত। দেশের আপামর মানুষের জনসম্পৃক্তির হিসেব কষা হলে আমরা তাকে পাই পরিণত বয়সে। আশি ছুঁই ছুঁই সময়ে গভীরের অদম্য তারুণ্য নিয়ে তিনি খোলা হাতে, খোলা মনে দেশের অর্থনৈতিক খাত পরিচালনার দায়িত্বে আসেন। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ উভয় আমলে প্রজাতন্ত্রের ডাকসাঁইটে কর্মকর্তার অবসরকালীন জীবনের কর্মমুখরতার গভীরে আমাদের পক্ষে পৌঁছানো ছিল কঠিন। এমন কর্মবীরের জীবনের ছন্দ ধরতেই বহুদিন কেটে যায় আমাদের। ততদিনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের বহু সাফল্য রচনায় সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন তিনি। সফল অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব থেকে অবসরের কিছু আগে আমি সুযোগ পাই তার জীবনের গল্প শুনবার। যদিও আমি অনেক আগে থেকেই চাইছিলাম তার জীবনীনির্ভর একটা প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ একটা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী মুহিত আমাকে সময় দিতে পারছিলেন না। বহুবার বলার পর, কাজের ফাঁকে কখনও অফিসে, কখনও বাসায় আমি তার জীবনের গল্পগুলো শুনতে যাই। সব স্মৃতি যেন মস্তিস্কে সাজানো। সাল ধরে পুরোনো মানুষের নামগুলোও তিনি ঝটপট নামিয়ে আনেন স্মৃতির দর্পণে। তার মেধা ও স্মৃতিশক্তি মোহিত করেছিল। স্মৃতি কুড়াবার জন্য একদিন তার হাত ধরে ছুটে গিয়েছিলাম পৈতৃকভিটা সিলেটে। সিলেটে বাড়ির আশপাশেই জীবনের অনেক গল্প। খুঁজে পাওয়া যায় শৈশব-কৈশোরের দিনগুলো। বলেছিলেন, জীবনের প্রথম সতেরো বছর তিনি কাটিয়েছেন সিলেটে। জন্মভিটার জায়গাটি দেখিয়ে বলেছিলেন, 'এইখানে একটা টিনের ঘর ছিল, সামনে উঠোন। আর বাড়ির সামনে দিয়ে চলে গিয়েছিল সে সময়কার শিলং রোড।' তার কথায় আমার মনের পটে এঁকে ওঠে তার শৈশব-কৈশোরের দাপিয়ে বেড়ানো দৃশ্যগুলো। শুধু তার বাড়িতেই নয়, নিয়ে গিয়েছিলেন শৈশবের স্কুল আর কৈশোর পেরোনোর কলেজেও। হারিয়ে গিয়েছিলেন ছেলেবেলায়। জীবনের গভীর গাঁথুনি শুরু হয়ে যায় স্কুল-কলেজেই। মুহিত স্বপ্নের সাহসে চলেছেন পথ। তার জীবনের ভিত্তি ও যাত্রাপথ যেন এক জাদুবাস্তবতা। তার জীবনের ১০ বছর বয়স বড় গুরুত্বপূর্ণ। স্বাপ্নিক হিসেবে স্বপ্ন দেখা কিংবা 'কালি কলম মন' জেগে ওঠে তখনই। বলছিলেন, দশ বছর বয়সেই তিনি খুঁজেছেন তার জন্মতারিখের সঙ্গে মিল আছে এমন মনীষীর। খুঁজেও পেয়েছিলেন। মাইকেল মধুসূদন দত্ত। সেই তখন থেকেই তার জীবনের বড় অনুপ্রেরণায় ছিলেন মধুসূদন।
মেট্রিকে ভালো ফল করলেন। স্কলারশিপ পেলেন। তার মুখস্থশক্তি ছিল প্রখর। একবার পড়লেই সব মনে থাকত। তাই একবার পড়ার পর বই ফেলে দিতেন। সে সময়ের জীবনপ্রবাহে প্রগতি কিংবা সংস্কৃতি, দুই প্রস্তাবেই সবচেয়ে বেশি প্রভাব ছিল ধর্মের। মুহিত ছিলেন ধর্মানুরাগী ও মুক্তমনা। সিলেটে বাড়ির পাশের মসজিদের মুয়াজ্জিন ছিলেন চার বছর। তিনি সময়ের যোগ্যতম প্রতিনিধি। তাই যেদিকে তাকিয়েছেন সেদিকেই সম্ভাবনা। ধর্ম, রাজনীতি, সমাজ চেতনা সবকিছুই তাকে পূর্ণ করেছে প্রকৃত মানবিকতায়। কৈশোরেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাহচর্য লাভ করেন মুহিত। সে এক উদ্দীপ্ত অভিজ্ঞতা। কৈশোরের জীবনচেতনা তারুণ্যকে জাগিয়েছে নতুন শক্তিতে। ভাষা আন্দোলনের উত্তাল সময়ে শুরু হয় মুহিতের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন। ইতিহাস তাকে যুক্ত করে নেয় ভাষাসংগ্রামী হিসেবেও। ইংরেজি সাহিত্যের তুখোড় ছাত্র মুহিত রাজনীতি, ছাত্র সংসদ থেকে শুরু করে জীবনের সব অলিগলিতেই রাখতে শুরু করেন উজ্জ্বল স্বাক্ষর।
জীবনের সূচনা থেকেই টেনেছে গান। জ্ঞান ও সাহিত্যের গভীরতা চষে বেড়িয়েছেন সারাটি জীবন। কবিতার রসাস্বাদন করেছেন বহুবার। করেছেন আবৃত্তিও। সাহিত্য রচনায় ব্রতী হয়েছিলেন প্রবন্ধ রচনার মধ্য দিয়ে। ছিলেন শিল্পের অনুরাগী। কথায় কথায় জানতে পারি বর্তমানে যেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে শিল্পকলা একাডেমি সেই জায়গাটিও তার হাত হয়েই যায় আর্টস কাউন্সিলে। একসময় এখানে গড়ে তুলেছিলেন শিল্প চত্বর। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে সেখানে স্থাপন করেন শিল্পকলা একাডেমি। মুহিতের বয়ানে উঠে আসে অতীত, উঠে আসে সোনামাখা ইতিহাস। ১৯৫৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ হতে হতেই কর্মজীবন। প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান থেকে কেন্দ্রীয় পাকিস্তান সরকারের নানা দায়িত্বে সরব থেকেছেন আবুল মাল আবদুল মুহিত। সিভিল সার্ভিসে থেকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের গাম্ভীর্য যেভাবে অন্যদের সাধারণ জনগণের জীবন বাস্তবতা থেকে দূরে নিয়ে যায়, মুহিতের ক্ষেত্রে সেটি ঘটেনি। তিনি বরাবরই ক্ষুধার্ত থেকেছেন শিকড়ের সন্ধান ও জ্ঞান অন্বেষণে। তাই মানুষই থেকেছে তার আপন হয়ে। মুহিত বিশ্বাস করতেন, তার জীবনে জ্ঞানতৃষ্ণার মূল দুয়ারটি উন্মুক্ত হয় ১৯৬৩ সালে। ২০১৮ সালে মুহিতের হাত ধরে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল অতীতের স্মৃতি কুড়িয়ে আনতে। সে সময়কার পাঠ-পঠন, শিক্ষকদের কথা কিছুই ভোলেননি তিনি। আমাকে নিয়ে যান হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি পাড়ার সেই পুরোনো বাসাটিতে, যেখানে কেটেছে অতীত।
যে জীবন জ্ঞান আহরণের, সে জীবনে বাড়তেই থাকে তৃষ্ণা। বাল্যবেলার স্বপ্ন ছিল পড়তে হবে অক্সফোর্ডে। সে স্বপ্নও থাকেনি অপূরণ। যাওয়া হয়েছিল ওয়াশিংটন ডিসিতেও। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সরকারের ইকোনমিক কনস্যুলার হিসেবে আবুল মাল আবদুল মুহিত তখন ওয়াশিংটনে। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রারম্ভে বাংলাদেশে রক্ত রণাঙ্গন। তখন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত মুহিত তার অবস্থান থেকেই মুক্তিকামী দৃঢ়চেতা এক সংগঠকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। আবুল মাল আবদুল মুহিতের বর্ণাঢ্য জীবনে এটি এক স্বর্ণালি অধ্যায়। একজন জ্ঞানতাপস, সিভিল সার্ভিসের তুখোড় কর্মকর্তা আর উচ্চাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজের ভেতর থেকে বের করে আনেন আলাদা এক সংগ্রামী মানুষকে। দেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে একাট্টা ছিল সেই চেতনা। সেদিনের সেই ভূমিকা সারা পৃথিবীতেই প্রবাসী বাঙালিদের সংঘবদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রেও ছিল এক অনন্য প্রেরণা। স্বাধীন বাংলাদেশে পরিকল্পনা কমিশনের সচিব হিসেবে দায়িত্ব নেন মুহিত। অল্পদিনেই দেশের অর্থনৈতিক ভিত তৈরির লক্ষ্য থেকে নামেন নতুন অভিযানে। ১৯৮১ সালে স্বেচ্ছায় চাকরি থেকে অবসর নেন মুহিত। কাজ করেন ফোর্ড ফাউন্ডেশন ও ইফাদের সঙ্গে।
১৯৮২-৮৩ সালে শর্তসাপেক্ষে এরশাদ সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে দেশ ও জাতীয়তার প্রশ্নে নিজের শর্তে অটল থেকে সে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়ে মুহিত নিজের বিশ্ববীক্ষণ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রজ্ঞা ও উন্নয়নচিন্তা নিয়ে সুনাম ও সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, আইডিবিসহ জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের হয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করেন মুহিত। জয়লাভ করে ৬ জানুয়ারি ২০০৯ তারিখে শপথ গ্রহণ করেন অর্থমন্ত্রী হিসেবে। ওখান থেকেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক খাতে সূচিত হয় এক নতুন যুগের। জীবনব্যাপী দায়িত্বের বহরগুলো ছিল অন্যরকম। যে মানুষগুলোর সঙ্গে মিশেছেন, জাদুকরি মাথায় মনে রেখেছেন সবাইকে। তার অধ্যয়নের জীবনে আরেক দরজা খুলে যায় টানা প্রায় এক যুগ ধরে কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেটে উপস্থিতির মধ্য দিয়ে। তখন নতুন করে আবিস্কার করেন বাংলাদেশের সম্ভাবনা। জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতায় এর প্রতিফলন দেখা যায়। মনে পড়ে ২০১৯ সালে তখন তিনি সাবেক অর্থমন্ত্রী। আমার বিশেষ অনুরোধে নাটোরে কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত থাকবেন বলে রাজি হলেন। আমরা নাটোরে যাচ্ছিলাম ট্রেনে করে। ট্রেনে যেতে যেতে কথা হচ্ছিল মন্ত্রী থাকাকালীন নানা বিষয় নিয়ে। বলেছিলেন, 'আমিই প্রথম বড় বাজেট প্রণয়নের পক্ষে ছিলাম। কারণ আমি ভেবেছি বাজেট যত বড় হবে, মানুষ তত সেবা পাবে। এবং হয়েছেও তাই। আমার এই কাজে সাহস জুগিয়েছেন শেখ হাসিনা। নেতৃত্ব যদি ঠিক না থাকে, তাহলে কিছুই সম্ভব নয়।'
সময়ই তার যোগ্য প্রতিনিধি নির্বাচন করে। আর সময়ের এই সত্য যেন এক ছায়া ফেলেছিল আবুল মাল আব্দুল মুহিত ও তার বন্ধুদের ওপর। সহপাঠীদের পাঁচজন মেধা, প্রজ্ঞা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার প্রমাণ রেখেই বাংলাদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। অনন্য এক আলোকমালায় আলোকিত ব্যক্তিত্ব আবুল মাল আবদুল মুহিত। চেয়ার মানুষকে তৈরি করে ঠিক, কিন্তু মুহিতের ক্ষেত্রে অনেক সময় বিষয়টির উল্টোও ঘটেছে হয়তো। তিনিই একেকটি চেয়ারকে অলঙ্কৃত করেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে অনন্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৬ সালে তিনি লাভ করেছিলেন দেশের সর্বোচ্চ সম্মান স্বাধীনতা পদক। তিনি বলেছিলেন, কোনো অতৃপ্তি ছিল না তার। জ্ঞান আহরণ আর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পেরে দারুণ তৃপ্ত মন নিয়ে তিনি প্রস্তুত পৃথিবী ছেড়ে যেতে। তাই হয়েছে। পৃথিবীর বুকে অন্যরকম অর্থনীতির এক বাংলাদেশের সূচনা করে তিনি পাড়ি জমিয়েছেন অন্যভুবনে। যেখানেই থাকুন, তার আত্মার শান্তি কামনা করি।
শাইখ সিরাজ :কৃষি ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব