স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে আমরা মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছি। এটি যেমন গর্বের একটি বিষয়, ঠিক তেমনি ভাবনারও বিষয়। কারণ শিল্প ও রপ্তানির ওপর আমাদের অর্থনীতি অনেকটাই নির্ভরশীল। আর এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের ফলে বাজার সুবিধায় যে পরিবর্তন আসবে সেটি আমাদের চিন্তার কারণ। সেই প্রেক্ষাপটে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির কোনো বিকল্প নেই।
বিগত বছরগুলোতে আমাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে মাথাপিছু আয়, জিডিপি প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি, দারিদ্র্য বিমোচন, মানব উন্নয়ন সূচকসহ সব ক্ষেত্রেই আমাদের অর্জন তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো। আর শিল্প, বিশেষ করে রপ্তানিমুখী খাত আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে, যার গুরুত্ব আমাদের প্রতিটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় উল্লেখ আছে। ২০৪১ সালের মধ্যে একটি স্বনির্ভর ও উন্নত অর্থনীতির দেশ হওয়ার যে রূপকল্প নিয়ে আমরা কাজ করছি, তা অর্জন করতে হলে রপ্তানিমুখী শিল্পায়নের কোনো বিকল্প নেই। মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বাণিজ্য সুবিধার পরিবর্তনগুলো হিসাব-নিকাশে নিয়ে আমাদের আগামী ৫০ বছরের কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। সে ক্ষেত্রে আমাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রাখতে হবে।
প্রথমত, স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বিগত দশকগুলোতে আমরা আমাদের বাণিজ্য সুবিধা পেয়ে আসছি। এর ওপর ভিত্তি করে আমরা তৈরি পোশাক খাতের মতো একটি বড় শিল্প প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি, অর্থাৎ আমাদের প্রবৃদ্ধির পেছনে শুল্ক্কমুক্ত বাজার সুবিধার বিষয়টি বিশেষভাবে কাজ করেছে। গ্র্যাজুয়েশনের সঙ্গে সঙ্গে যদি আমরা আমাদের বাজারগুলোতে শুল্ক্কমুক্ত সুবিধা ধরে রাখতে না পারি তাহলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে। যদিওবা ইউরোপীয় ইউনিয়নে আমরা জিএসপি প্লাস এভেইল করতে পারব, তবে অন্যান্য বাজারের ক্ষেত্রে আমাদের প্রয়োজনীয় কৌশল ও পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে এফটিএ করার বিষয়টি এখন সময়ের দাবি। এটি একদিকে যেমন আমাদের রপ্তানি বাজার ধরে রাখতে সাহায্য করবে, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।
দ্বিতীয়ত, প্রতিযোগী দেশগুলোর দিকেও আমাদের তাকাতে হবে। রপ্তানি বাজারে আমাদের অন্যতম প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটি বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পন্ন করেছে। বিশেষ করে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভিয়েতনামের এফটিএ করার বিষয়টি শুধু তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন নয় বরং এর প্রভাবে আমাদের রপ্তানিতে পিছিয়ে পড়াটাই স্বাভাবিক। এ ছাড়াও ভিয়েতনাম রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ চুক্তিতে যুক্ত হয়েছে। আমদানি-রপ্তানির দিক থেকে সম্ভাবনাময় দেশগুলোর মধ্যে এ ধরনের চুক্তির মাধ্যমে শুধু বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হচ্ছে তা নয়, বরং কমন মার্কেট সৃষ্টি হওয়ার ফলে সেসব দেশে প্রচুর পরিমাণে বিনিয়োগ বাড়ছে। সময় এসেছে আমাদেরও এসব ব্যাপারে আরও জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার, তা না হলে আমরা প্রতিযোগিতার দিক থেকে অনেক পিছিয়ে পড়ব।
তৃতীয়ত, বিজিএমইএর সঙ্গে আমি প্রায় দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে সংশ্নিষ্ট আছি। এই সময়কালে আমার কাজের একটা বড় অংশজুড়ে আছে বাজার বহুমুখীকরণের বিভিন্ন উদ্যোগ। তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় হলেও ২০২০ সালের ডব্লিউটিওর তথ্য অনুযায়ী বিশ্বে আমাদের পোশাক রপ্তানির শেয়ার মাত্র ৬.২৬ ভাগ। কভিড মহামারির কারণে ২০২০ সালে আমাদের শেয়ার কিছুটা কমে এসেছে, ২০২১-এর শেষ কয়েকটি মাসে রপ্তানিতে কিছুটা গতি সঞ্চার হওয়ায় আমাদের শেয়ার ৭ ভাগ ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করি। আমাদের প্রবৃদ্ধি উত্তরোত্তর ধরে রাখার জন্য নতুন বাজার সম্প্রসারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিগত এক দশকে আমরা বিজিএমইএ থেকে বাজার সম্প্রসারণে স্কোপিং মিশনসহ বেশকিছু কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাজার বহুমুখীকরণে উৎসাহ দেওয়ার জন্য নতুন বাজার রপ্তানি প্রণোদনা ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে চালু করেছেন, যার ফলে নতুন বাজারে আমাদের পোশাক রপ্তানি বিগত ১২ বছরে ৮৫০ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। এখনও আমাদের নতুন বাজারে অনেক সম্ভাবনা রয়েছে, বিশেষ করে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে ব্রাজিল, মেক্সিকো, চিলি, আর্জেন্টিনা ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, জাপান, রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, সৌদি আরব এবং বাহরাইন আমাদের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। তবে নতুন বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে শুল্ক্ক একটি প্রধান বাধা এবং বেশকিছু দেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে অ-শুল্ক্ক বাধাও রয়েছে। এই দেশগুলোতে আমাদের বাজার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে শুল্ক্কমুক্ত সুবিধা প্রয়োজন। তাই এ ব্যাপারে আমাদের দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বাণিজ্যিক সংশ্নিষ্টতা প্রয়োজন।
চতুর্থত, শুল্ক্কমুক্ত বাজার সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময় আমরা চিন্তা করি আমরা কী হারাব। একটি বিষয় মাথায় রাখা দরকার, এফটিএ নেগোসিয়েশন একটি উইন-উইন সিচুয়েশন। যেহেতু আমাদের রাজস্ব আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আমদানি শুল্ক্ক থেকে আসে, ট্রেড লিবারাইজেশনে যেতে গেলে আমাদের কিছু শঙ্কা আছে। তবে যথাযথ অর্থনৈতিক বিশ্নেষণের মাধ্যমে আমাদের স্বার্থের জায়গাগুলোকে বের করতে হবে। আবার একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বাজার শক্তিশালী করার মতো কৌশল নিতে পারলে আমদানি শুল্ক্ক আয়ের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে মুক্ত বাণিজ্যের সুবিধা নেওয়া সম্ভব।
পঞ্চমত, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এফটিএ-সংক্রান্ত আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আমাদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ ও বাণিজ্য পরিবেশে বর্তমান জটিলতা দূর করতে হবে। যেন আমাদের ট্রেড পার্টনারদের অশুল্ক্ক বাধার সম্মুখীন হতে না হয়। উদাহরণস্বরূপ, ব্রাজিল আমাদের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি বাজার, তবে ব্রাজিলিয়ান বিফ আমদানির ক্ষেত্রে আমাদের এখানে কিছু অশুল্ক্ক বাধা রয়েছে, যা আমাদের সম্পর্কে একটি নেতিবাচক বার্তা দেয়। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানির ক্ষেত্রে ফিউমিগেশন-সংক্রান্ত জটিলতার বিষয়টি আমাদের জন্য বিব্রতকর। আমরা যেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের কটন দিয়ে তৈরি পোশাকের ওপর শুল্ক্ক প্রত্যাহারের অনুরোধ করছি, সেখানে এরকম জটিলতা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আবার দেশীয় বাজার থেকে কাঁচামাল সংগ্রহের পাশাপাশি চাহিদা মেটানোর জন্য আমাদের তুলা ও সুতা আমদানি করতে হয়, এক্ষেত্রে ভারত অন্যতম প্রধান উৎস। তবে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ৩৪টি ল্যান্ড কাস্টমস স্টেশন থাকা সত্ত্বেও সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বর্তমানে কেবল বেনাপোল-পেট্রাপোল বন্দর দিয়ে তুলা, সুতা এবং ফেব্রিক আমদানি করা যায়। এ ধরনের অশুল্ক্ক বাধা অপসারণ করতে পারলে তা বাণিজ্য সহায়ক হবে। পাশাপাশি এফটিএ করার ক্ষেত্রে আস্থা ও আগ্রহ আরও বাড়বে।
ষষ্ঠত, আমাদের সামগ্রিক ইজ অব ডুয়িং বিজনেস বা ব্যবসায়িক পরিবেশ আরও সহজতর করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। মেগা প্রকল্পগুলো আমাদের সামগ্রিক অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করবে। সেই সঙ্গে নীতি স্থিতিশীলতা এবং ইনসলভেন্সি রেজুলেশন মেকানিজমের মতো বিষয়গুলো নিয়েও আমাদের কাজ করতে হবে। তাহলে স্থানীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়বে।
সপ্তমত, অবাধ তথ্যপ্রবাহের এই যুগে আমাদের তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ এবং গবেষণার ওপরে জোর দিতে হবে। হালনাগাদ তথ্যের জন্য বিভিন্ন সময় আমাদের বিভিন্ন দপ্তর এবং প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হতে হয়, যা একদিকে সময়ের অপচয় করে, অন্যদিকে এর ফলে কাজের গতিও বাধা পায়। অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানিসংক্রান্ত অবাধ ও রিয়েল টাইম তথ্য নিশ্চিত করতে পারলে বিনিয়োগকারীরা উপকৃত ও উৎসাহিত হবেন। এক্ষেত্রে ইউরোপ, আমেরিকার মতো উন্নত দেশগুলোর লাইভ ডাটা পোর্টাল অনুসরণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক ও রাজস্ব বোর্ড ডায়নামিক ট্রেড পোর্টাল চালু করতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে, 'ইনফরমেশন ইজ পাওয়ার'। তথ্যের সহযোগিতা নিয়ে আমরা আমদানি শুল্ক্ক আয়ের ওপর নির্ভরতা কমানোর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ বাজার শক্তিশালী করতে পারি, যা আমাদের একটি টেকসই অর্থনীতি নির্মাণে সহায়তা করবে।
বিগত ৫০ বছরে আমাদের অর্জন অনেক, আর আগামী ৫০ বছর আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতিতে আমরা যে গতি অর্জন করেছি, তা ধরে রাখতে এবং তথ্য ও প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়নে উন্নীত হতে আমাদের এখন থেকেই কাজ করতে হবে।
আমাদের একটি সমন্বিত 'জাতীয় রপ্তানি কৌশল' প্রয়োজন, যেখানে বস্ত্র ও পোশাক খাতের পাশাপাশি অন্যান্য খাত বহুমুখীকরণের সম্ভাবনা যাচাই করে সেসব সম্ভাবনাময় খাতের বাজারগুলোকেও আমাদের এফটিএ আলোচনার তালিকায় রাখতে হবে। পাশাপাশি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইনসংক্রান্ত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করাসহ জাতীয় পর্যায়ে নেগোসিয়েশন স্কিল বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
ফারুক হাসান :সভাপতি, বিজিএমইএ