বর্তমানে আমরা অবিশ্বাস্য পদ্ধতিগত মৌলিক পরিবর্তন (প্যারাডাইম শিফট) প্রত্যক্ষ করছি। এই পরিবর্তন ঘটছে প্রচলিত ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তরের পথ ধরে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির আবির্ভাবে ক্ষিপ্রগতিতে ঘটছে ডিজিটাল রূপান্তরধর্মী এ পরিবর্তন। তৃতীয় শিল্পবিপ্লবে বাংলাদেশেও অনলাইনে ক্রয়াদেশে বার্গার, পিৎজা বাসায় সরবরাহ করতে দেখা যাচ্ছে। আর চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে দেখা যাবে আপনার থ্রিডি প্রিন্টার থেকে তা প্রিন্ট করে সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে। পদ্ধতিগত এই মৌলিক পরিবর্তনে চ্যালেঞ্জ থাকলেও অবশ্যম্ভাবীভাবে তা সেসব দেশের জন্য কোনো বিপদ বয়ে আনবে না, যারা ডিজিটাল রূপান্তরে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দক্ষতার উন্নয়ন করবে। যারা চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে সৃষ্ট নজিরবিহীন সুযোগ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সুপরিকল্পিত কার্যক্রম, নীতি ও কৌশলের বাস্তবায়ন করবে। এ ক্ষেত্রে আমাদের ইতিবাচক দিক হচ্ছে, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে প্রেরণাদায়ী 'রূপকল্প ২০২১'-এর মূল উপজীব্য ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে সাফল্য। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে শক্তি, সাহস ও প্রেরণা জোগাচ্ছে ডিজিটাল বাংলাদেশ। আর তাই দেখা যাচ্ছে, আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ইন্টারনেট অব থিংসের মতো প্রাগ্রসর (ফ্রন্টিয়ার) বা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, যা ইতোমধ্যে অর্থনীতির দ্রুত বিকাশে অবদান  রাখতে শুরু করেছে। তার ব্যাপক ব্যবহারকে গুরুত্ব দিয়ে প্রণয়ন করা হয়েছে উচ্চাভিলাষী 'স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১' রূপকল্প।

কেমন হবে ২০৪১ সালের স্মার্ট বাংলাদেশ? সমালোচকরা হয়তো বলবেন, অতিমাত্রায় উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা। ব্যক্তিজীবনেই হোক বা রাষ্ট্র পরিচালনায়; কোনো লক্ষ্য অর্জনে উচ্চাভিলাষ না থাকলে তা হবে নদীতে হাল ছাড়া নৌকার মতোই ভেসে চলা। ১৩ বছর আগে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের ঘোষণার পর এমন একটি উচ্চাভিলাষী আধুনিক কর্মসূচির বাস্তবায়ন 'অসম্ভব' বা 'কঠিন হবে'; এমন অনেক কথাই শোনা গিয়েছিল। সরকারদলীয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছ থেকে ডিজিটাল বাংলাদেশ নিয়ে সমালোচনাও ছিল প্রবল। কিন্তু সব সমালোচনাকে ছাপিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন বাস্তবতা। এই সাফল্য থেকে একটি বিষয় সামনে চলে এসেছে। আর তা হলো, দেশ ও মানুষের কল্যাণে গৃহীত কর্মসূচি যত উচ্চাভিলাষীই হোক; লক্ষ্য স্থির রেখে তা বাস্তবায়নে আন্তরিক হলে ভালো ডিভিডেন্ড (লভ্যাংশ) পাওয়া যায়। ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে আমরা ডিজিটাল অর্থনীতি নামক নতুন একটি খাত পেয়েছি। প্রত্যক্ষ করেছি মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট প্রেরণ। আর 'স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১' রূপকল্পের বাস্তবায়নে হয়তো দেখা যাবে স্পেস অর্থনীতি নামক আরেকটি খাত। দেশে তৈরি স্যাটেলাইট মহাকাশে প্রেরণ করা হচ্ছে। এমন উচ্চাশা থেকে শুধু স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১ রূপকল্পেই নয়; এর আগে ঘোষিত 'রূপকল্প ২০৪১'-এও স্পেস অর্থনীতি গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। স্পেস অর্থনীতি গড়ে তোলার পরিকল্পনাকে সাধুবাদ জানাতে হয় দুটি কারণে। প্রথমত, বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিলে স্পেস গবেষণা ও অর্থনীতি এবং তথ্যপ্রযুক্তির সম্প্রসারণে মহাকাশে বাংলাদেশকে আরও বিভিন্ন ধরনের স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্যাটেলাইটে বিনিয়োগ লাভজনক। যুক্তরাজ্যের 'স্যাটেলাইট কমিউনিকেশনস :উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে প্রভাব' শীর্ষক এক সমীক্ষায় দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ১ পাউন্ড ব্যয় করে ৪৫ পাউন্ড আয় করা সম্ভব।

বিশ্নেষণে দেখা যায়, 'রূপকল্প ২০৪১'-এর অভীষ্ট অর্জন দ্রুততর করতেই 'স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১' রূপকল্প প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০৪১-এর ভিত্তিমূলে রয়েছে দুটি প্রধান অভীষ্ট। প্রথমত, ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে একটি উন্নত দেশ, যেখানে বর্তমান মূল্যে মাথাপিছু আয় হবে ১২ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার এবং যা হবে ডিজিটাল বিশ্বের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ হবে সোনার বাংলা, যেখানে দারিদ্র্য হবে সুদূর অতীতের ঘটনা। প্রেক্ষিত পরিকল্পনার এই লক্ষ্য অর্জনে সহযোগিতা করতেই 'স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১' রূপকল্পে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগানো হচ্ছে। কারণ, আগের তিনটি শিল্পবিপ্লবের চেয়ে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে বিশ্বে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটবে। সরকার এসব প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার করে ২০৪১ সালের মধ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে আইসিটি খাতের অবদান ২০ শতাংশের বেশি নিশ্চিত করতে চায়। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) তথ্যমতে, জ্বালানি, পরিবহন, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ এবং ডিজিটাল উৎপাদন- এই পাঁচটি প্রধান ক্ষেত্র দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হবে। লক্ষণীয়, 'স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১' রূপকল্পে এর চেয়েও বেশি ক্ষেত্রগুলোকে দক্ষতার দ্বারা পরিচালনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আওতায় কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বাণিজ্য, পরিবহন, পরিবেশ, শক্তি ও সম্পদ, অবকাঠামো, বাণিজ্য, গভর্ন্যান্স, আর্থিক লেনদেন, সাপ্লাই চেইন, নিরাপত্তা, এন্টারপ্রেনিউরশিপ, কমিউনিটির মতো খাত প্রযুক্তি দ্বারা পরিচালিত হবে এবং প্রতিটি খাত হবে স্মার্ট। যেমন স্মার্ট কৃষি, স্মার্ট শিক্ষা ইত্যাদি।

স্মার্ট বাংলাদেশ রূপকল্পের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়- জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি, উদ্ভাবনী জাতি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল সমাজ বিনির্মাণ। সুচিন্তিতভাবে এর বাস্তবায়নে প্রস্তাব করা রয়েছে। প্রথমত, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় জাতীয় নলেজ স্ম্ফিয়ার বিনির্মাণ; জ্ঞানভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনায় অবকাঠামো নির্মাণ; স্থানীয় পর্যায়ে আন্তর্জাতিক স্টার্টআপ মেন্টর ও বিজনেস কোচ সৃষ্টি, অল্টারনেটিভ স্কুল ফর স্টার্টআপ এডুকেটরস অব টুমরো (অ্যাসেট) এবং সেন্টার ফর লার্নিং ইনোভেশন অ্যান্ড ক্রিয়েশন অব নলেজ (ক্লিফ) প্রতিষ্ঠা। দ্বিতীয়ত, উদ্ভাবনী জাতি গঠনে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সক্ষমতা তৈরি, মানসম্মত উদ্ভাবন এবং নিয়ন্ত্রণের ওপর। উদ্যোক্তা তৈরিতে নতুন উদ্যোগ হিসেবে সেল্‌ফ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড এন্টারপ্রেনিউরশিপ ডেভেলপমেন্ট (সিড) এবং কনটেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং ও লিংকেজ ল্যাব (সেল) স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। তৃতীয়ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল সমাজ বিনির্মাণে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিতকরণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। স্মার্ট বাংলাদেশ রূপকল্প বাস্তবায়নে আইসিটি বিভাগ ইতোমধ্যে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে অন্যতম বিসিসির এনহ্যান্সিং ডিজিটাল গভর্নমেন্ট অ্যান্ড ইকোনমি প্রকল্পের আওতায় সেন্টার ফর ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভুলেশন ও ডিজিটাল লিডারশিপ একাডেমি প্রতিষ্ঠা এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা। প্রশ্ন হচ্ছে, স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণ কি আদৌ সফল হবে? অনুমান করা যায়, স্মার্ট বাংলাদেশ নিয়ে যত বেশি আলোচনা হবে; অনেকের মধ্যেই এমন প্রশ্নের উদ্রেক হবে। কিন্তু এ ব্যাপারে নৈরাশ্যবাদী হওয়ার কোনো কারণ আছে বলে মনে করি না।

অজিত কুমার সরকার: সিনিয়র সাংবাদিক