রানা প্লাজা দুর্ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে তৃতীয় বৃহত্তম শিল্প দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচিত। এ দুর্ঘটনায় ১ হাজার ১৩৫ জন পোশাক শ্রমিক প্রাণ হারায়, যার অধিকাংশ নারী। এটি বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে একটি 'টার্নিং পয়েন্ট'। দুর্ঘটনার পরে 'কমপ্লায়েন্স' ইস্যু নিয়ে সারাবিশ্বে হই চই শুরু হয়। পোশাকশিল্পে নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও শ্রম নিরাপত্তা সৃষ্টির লক্ষ্যে পাঁচ বছরের জন্য বায়ারদের চাপে সৃষ্টি হয় দুটি প্রতিষ্ঠান 'অ্যাকর্ড' ও 'অ্যালায়েন্স'। তারা সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিগুলোতে পরিদর্শন শুরু করে। ফলে এসব ফ্যাক্টরি সুদৃঢ় ভিত্তি পায়। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর গার্মেন্ট শিল্পকারখানা স্বমহিমায় ফিরে আসে। কিন্তু কেউ কি কখনও মনে রেখেছে দুর্ঘটনায় নিহত, আহত ও নিখোঁজ পরিবারগুলোর মর্মবেদনা? এখনও ২২৬ জন নিখোঁজ শ্রমিকের পথ চেয়ে বসে আছে তাদের মা, স্ত্রী, পুত্র-সন্তানরা। প্রতিবছর ২৪ এপ্রিল বহু নিখোঁজ শ্রমিক পরিবারের সদস্যরা ছবি নিয়ে ঘুরেফিরে চোখের জলে বুক ভিজিয়ে নীরবে প্রস্থান করে। রাষ্ট্র, মালিক বা শ্রমিক সংগঠনগুলো তাদের কোনো খোঁজ রাখেনি।
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল বুধবার। অন্যান্য দিনের মতো সুন্দর একটা সকাল। সবেমাত্র বৈশাখের মৃদুমন্দ দখিনা সমীরণে প্রকৃতি উত্তপ্ত হতে শুরু করেছে। বৃক্ষরাজি ফুল-ফল-পল্লবে বিকশিত। সকালে ঢাকা মহানগরীতে সবে কর্মচাঞ্চল্য শুরু হয়েছে। সকাল ৯টার দিকে বিভাগীয় কমিশনার সামছুদ্দিন আজাদ চৌধুরী আমাকে জানালেন, সাভার বাসস্ট্যান্ডে একটি আটতলা বিল্ডিং ধসে পড়েছে। তখন আমি মিন্টো রোডে আমার বাংলোর দোতলায় নাশতা করছিলাম। আমার সঙ্গে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জসিম উদ্দিন ছিলেন।
এর পর আমি ও এডিসি জসিম সাভারের দিকে রওনা হই। তখনও ঘটনার ভয়াবহতা না বুঝে এনডিসিকে বলি, তুমি সব হাসপাতাল ও অ্যাম্বুলেন্স সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে টেলিফোন করে বলে দাও, তারা যেন সাভারের দিকে রওনা দেয়।
বেলা যত বাড়তে থাকে; আহত ও নিহতের সংখ্যা তত বাড়তে থাকে। আহতদের চিকিৎসায় এনাম মেডিকেল কলেজ, সিএমএইচ, সাভারের ক্লিনিকগুলো অগ্রণী ভূমিকা রাখে। ঢাকা মহানগরীতে অবস্থিত সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও ক্লিনিকগুলোতেও আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। সময় যত গড়াতে থাকে লাশের সংখ্যা তত বৃদ্ধি পেতে থাকে। নিহতদের স্থানীয় অধর চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ে নেওয়া হয় এবং জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা লাশ ও গ্রহণকারীর পরিচয় নিশ্চিত হয়ে দাফনের খরচ বাবদ ২০ হাজার টাকা প্রদান করেন। আহত প্রত্যেককে পাঁচ হাজার টাকা প্রদান করা হয়।
দুর্ঘটনার প্রথম পাঁচ দিন স্বেচ্ছাসেবকরা সম্মুখ সারিতে থেকে উদ্ধার কাজে অংশগ্রহণ করেছেন। পরে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে ইট সরিয়ে লাশ উদ্ধারের সিদ্ধান্ত হলে স্বেচ্ছাসেবকদের সরাসরি উদ্ধার কাজ থেকে দূরে রাখা হয়। প্রকৃতপক্ষে ২৮ এপ্রিল ২০১৩ তারিখে শ্রমিক শাহিনাকে উদ্ধার করতে গিয়ে স্বেচ্ছাসেবক ইজাজ উদ্দীন চৌধুরী কায়কোবাদ আগুনে পুড়ে গেলে প্রথম পর্বের অভিযান শেষ হয় এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়। এ সময় সরাসরি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে বীরত্বের সঙ্গে কাজ করেছেন এমন ৮০ জনের তালিকা তৈরি করা হয়। এজাজ উদ্দীন চৌধুরী কায়কোবাদ একজন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী ছিলেন। এজাজের বাসা মিরপুরের মাটিকাটা এলাকায়। তার বাবার নাম আবদুর রউফ। এজাজ গাজীপুরে তার ভগ্নিপতি ইকবাল হোসেনের প্রতিষ্ঠান 'ন্যাচার প্লাস কনজুমার্স অ্যান্ড ফুড লিমিটেড'-এর ক্রয় ব্যবস্থাপক। ২৫ এপ্রিল বোনের বাসায় টিভিতে ঘটনা দেখে সাভারে যাবেন জানিয়ে দুপুরে বের হয়ে যান এজাজ। দুই দিন পর রাত ২টায় ফোন করে তার স্ত্রীকে জানান, তিনি সাভারে উদ্ধার কাজে আছেন। স্বেচ্ছাসেবকরা ২৮ এপ্রিল রাতে শাহিনা নামক এক শ্রমিক ভবনের পেছনের দিকে ছোট একটা ঘরে আটকা পড়ে আছেন; জানতে পান। তাকে উদ্ধারের জন্য এজাজ উদ্দীন চৌধুরী কায়কোবাদ ড্রিল মেশিন দিয়ে বিম কাটতে গিয়ে হঠাৎ শর্ট সার্কিটের ফলে এলাকাটি ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হলে শাহিনা মৃত্যুবরণ করেন। কায়কোবাদ আগুনে পুড়ে মারাত্মকভাবে আহত হন। তাকে তাৎক্ষণিক সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে ৩০ এপ্রিল সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৪ মে রাতে মারা যান তিনি। ৭ মে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়। তিনি মানবতার প্রতীক হিসেবে বেঁচে আছেন; থাকবেন কোটি মানুষের হৃদয়ে। এজাজ উদ্দিন চৌধুরী কায়কোবাদকে মরণোত্তর জাতীয় কোনো পুরস্কারে ভূষিত করার সুপারিশ করছি। এটি করা হলে একদিকে তার আত্মা যেমন শান্তি পাবে, অন্যদিকে তিনি সাহসিকতার প্রতীক হয়ে পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে বেঁচে থাকবেন।
শেখ ইউসুফ হারুন: নির্বাহী চেয়ারম্যান (সিনিয়র সচিব), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়; সাবেক জেলা প্রশাসক, ঢাকা