আবার এশিয়ান গেমস নাই হয়ে গেল। সেপ্টেম্বর মাসের ১০ থেকে ২৫ তারিখে চীনের হাংঝুতে সব প্রস্তুতি শেষের পরও কভিড-১৯ এর আবার আগ্রাসনে থেমে যেতে হলো। সঙ্গে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন এশিয়ান গেমসের প্রশিক্ষণরত সব ফেডারেশনের অনুশীলনও বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দিল। আমরা ৪২টি ইভেন্টের মধ্যে ১৮টিতে অংশ নিতে প্রস্তুতিতে ছিলাম। এশিয়ান গেমসে ১৯৮৬ সালে সিউলে বক্সিংয়ে মোশাররফ সিলভার পেয়েছিল, ২০১০ সালে ক্রিকেটে গুয়াংঝুতে স্বর্ণ পেয়েছিল। ক্রিকেট অলিম্পিকে ১৯০০ সালে আর কমনওয়েলথ গেমসে ১৯৯৮ সালে- এ দু'বার মাত্র অন্তর্ভুক্ত হয়ে ছিল। আজ পর্যন্ত আমাদের এশিয়ান গেমস থেকে অর্জন হলো : স্বর্ণ একটি (ক্রিকেট), সিলভার পাঁচটি (কাবাডি ৩ আর ক্রিকেট ২), ব্রোঞ্জ ছয়টি (কাবাডি ৪, ক্রিকেট ১, বক্সিং ১)।

এবার যদি এশিয়ান গেমস হতো তাহলে আর্চারিতে আমাদের মেডেল পাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা ছিলই। হকিতে আমরা ভালো করব আমাদের এ আশা পুষ্ট। আমরা ১৯৮৫ সালে জাপান আর চীনকে হকচকিয়ে দিয়ে ছিলাম কিন্তু আজ ওরা কোথায় উঠে গেছে আর আমরা এখনও পরিকল্পনা আর 'দেখ লাংগা' আস্ম্ফালনেই দিন পার করছি। ক্রীড়াঙ্গনে আমাদের গর্ব ক্রিকেট এবং সেই ক্রিকেটের আভিজাত্য হলো টেস্ট। টেস্ট খেলতে অনেক ক্রিকেটারের অনীহা। অনেকেই বলেন, আমাদের ক্রিকেট খেলোয়াড়দের কারও কারও অনেক টাকা। তাই কারও গোসসা তারা থোড়াই আমলে নেন, দয়া হলে টেস্ট খেলতেও পারেন। ক্রিকেট কেন সর্বত্রই আলুথালু অবস্থা?

ক্রীড়াঙ্গন সময়কে উপেক্ষা করে নয়, এ মুহূর্তের 'বার্নিং ইস্যু' নিয়ে বলাই যায়, লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ছিলেন ভারতের কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী। একটি রেল দুর্ঘটনায় তিনি সব দায়িত্ব নিজ কাঁধে নিয়ে পদত্যাগ করেছিলেন। আমাদের রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন সাহেবের স্ত্রী শাম্মী আখতার মনির নিকট আত্মীয়ের কাছে টিকিট চাওয়াতে টিটি শফিকুল ইসলামকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। ঘটনাটি ভাইরাল হওয়ার পর রেলমন্ত্রী দক্ষ ফরোয়ার্ডের মতো ডানে-বামে ডজ করে এক পিচ্ছিল অবস্থার জন্ম দেন। পরে সবকিছু মেনেও নেন। ওই টিটির বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহারের পাশাপাশি আরও কিছু নির্দেশনাও দেন।

আলেকজান্ডার ভারতবর্ষ জয় করে মেসিডোনিয়াতে ফেরত গিয়েছেন। গায়ে প্রচণ্ড জ্বর। ধর্মীয় অনুশাসন হলো সূর্য উদিত হওয়ার সময় প্রাসাদ থেকে আধা মাইল দূরে নদীতে ডুব দিয়ে এসে এক কোপে একটি ষাঁড়ের গর্দান বিচ্ছিন্ন করা। প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে প্রথম দিন ধর্মীয় অনুশাসন শেষ করলেন। দ্বিতীয় দিন আরও জ্বর তবু পালন করলেন অনুশাসন। তৃতীয় দিনে আরও জ্বর তবু কনকনে ঠান্ডা পানির নদীতে ডুব দিয়ে এসে ষাঁড় বলি দিলেন এবং জ্বরের কাছে দিজ্ঞ্বিজয়ী হার মানলেন। আলেকজান্ডার হয়তো অন্যকে দিয়ে এ ধর্মীয় অনুশাসন করিয়ে নিতে পারতেন। তবে হয়তো 'মেসেজ'টা যেত যে আলেকজান্ডার তার রাজত্ব তুলে দিয়েছেন। বড় কথা হলো, ক্ষমতা কেউ ছাড়তে চান না। বরিস বেকার আমার পছন্দের টেনিস তারকা। ব্যাংক প্রতারণার দায়ে আড়াই বছর সশ্রম কারাদণ্ড এখন ভোগ করছেন। খেলা ছাড়ার পর নোভাক জকোভিচের কোচও ছিলেন। সেদিন তার গার্লফ্রেন্ড দেখা করতে গিয়েছিলেন, দুঃখ করে বলেন, কারা কর্তৃপক্ষ তার সোনালি রঙের চুল পাল্টে অন্যান্য কয়েদির চুলের মতো করতে বলেছে। আইন কতই না কঠোর।

এশিয়ান গেমস না হওয়াতে আমরা সময় পেলাম। এখন এ সময়টা ক্রীড়া মহলকেও গোছাতে ব্যয় করা দরকার। আমরা ব্যর্থ হই, কারণ আমাদের কোনো দীর্ঘ পরিকল্পনা নেই। আমরা সেই গ্রাম্য কথা 'উঠ ছেমড়ি তোর বিয়া' মানে তড়িঘড়িতে বিশ্বাসী। প্রশিক্ষণ সব সময়ই মধ্যম মানের, মানসিক প্রস্তুতি নেই বললেই চলে, যার জন্য শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে নিজের ক্ষমতা থাকার পরও প্রয়োগে ব্যর্থ এবং এক ক্রিকেট বাদে সব দলই অর্থনৈতিক দুরবস্থার শিকার। এ দেশ আর কতকাল শুধু অংশগ্রহণ করে কিছু কর্মকর্তার দেশ ঘোরার জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অপচয় করবে? কঠোর না হলে এ ক্রীড়াঙ্গন থেকে সফলতার আশা করা বৃথা।

এ দেশের ক্রীড়াঙ্গন দৃষ্টান্তের সৃষ্টি করেছে সব আজগুবি ধ্যান-ধারণার। বিশ্বে কোথাও দোকানসহ স্টেডিয়াম নেই, আমাদের আছে। ক্রীড়াঙ্গনকে মানসম্পন্ন করতে হলে ফেডারেশনগুলো একাডেমি তৈরি করে শিশুদের নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ চালু করুন। অবশ্যই সফলতা আসবে।

মেজর (অব.) সাহাবুদ্দিন চাকলাদার: জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারপ্রাপ্ত ও সাবেক অধিনায়ক, জাতীয় এবং সেনাবাহিনী হকি দল