সমকাল :কভিড মহামারি থেকে এ পর্যায়ে এসে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ ব্যবসা-বাণিজ্যে কোন ধরনের প্রভাব ফেলছে?
মীর নাসির :পুনরুদ্ধার পর্যায়ে হঠাৎ করে সব ধরনের পণ্য চাহিদা বেড়েছে। সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়েছে। এতে আমদানি করা পণ্যের দাম ব্যাপক বেড়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের দর অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। পণ্য পরিবহনে জাহাজভাড়া অনেক বেড়েছে এবং কমার কোনো লক্ষণ নেই। এদিকে বাংলাদেশেও টাকার অবমূল্যায়ন হচ্ছে। এতে আমদানি মূল্য বাড়ছে। আবার বন্দরে পণ্য খালাসের সময় সরকারকেও বেশি শুল্ক্ক দিতে হচ্ছে। সবটা মিলে অভ্যন্তরীণ বাজারও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে। কভিড-পরবর্তী ২০২১ সালে আমরা অনেকটা সামলে নিয়েছিলাম। কিন্তু শিল্পের কাঁচামাল ও জাহাজভাড়া বৃদ্ধি এবং টাকার অবমূল্যায়নের কারণে অভ্যন্তরীণ বাজারভিত্তিক শিল্প বড় চ্যালেঞ্জের মুখে আছে। এখানে পণ্য মূল্য বাড়ছে। কিন্তু মানুষের ক্রয় ক্ষমতা অর্থনীতির হিসাবে হয়তো বাড়ছে। কিন্তু মূল্যবৃদ্ধি তাদেরও সংকটে ফেলছে। ক্রেতা সংকটে থাকলে স্বাভাবিকভাবে এর অভিঘাত শিল্পে কম-বেশি পড়বে। প্রকৃত অর্থে আমরা একটা ক্রস-ক্রাইসিসের মধ্যে আছি। আমরা রপ্তানি আয় বাড়াতে চাচ্ছি। এ জন্য নানা প্রণোদনা আছে, যার কারণে ৫০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সম্ভাবনা আছে। কিন্তু রপ্তানির তুলনায় আমাদের আমদানি অনেক বেশি। এর বড় অংশের ব্যবহার অভ্যন্তরীণ বিশাল বাজারে। উদ্ভূত পরিস্থিতি এ বাজারে জটিল পরিস্থিতি তৈরি করছে।

সমকাল :শ্রীলঙ্কার মতো কোনো সংকটের আশঙ্কা আমাদের আছে?
মীর নাসির :না, আমার তা মনে হয় না। সরকার কিছু বিষয় সামাল দিচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যাতে বড় সংকট না হয়, তার জন্য বিলাসী পণ্য আমদানি নিরুৎসাহিত করছে। ভোজ্যতেলসহ নিত্যপণ্যের বাজারের দামে হয়তো লাগাম পরাতে পারছে না, তবে শুল্ক্ক প্রত্যাহার করে সহনীয় পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করছে।

সমকাল :সামনে নতুন কোনো চ্যালেঞ্জ দেখছেন?
মীর নাসির :জ্বালানি নিয়ে বড় শঙ্কা আছে। তেলের দাম বাড়ছে। বিদ্যুতের দাম বাড়ছে। গ্যাসের সংকট আছে, যার কারণে বিদ্যুৎ এবং সার কারখানা ছাড়া বাকি গ্যাসনির্ভর শিল্পে উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অতিদ্রুত দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন বাড়ানো না গেলে এবং ভবিষ্যৎ চাহিদা মেটাতে ভূমিতে এবং সাগরে গ্যাসক্ষেত্র আবিস্কারে মনোযোগী না হলে এ সমস্যার সমাধান নেই। আমদানি করা এলএনজির দাম অনেক বেশি। প্রতি বছর পুরোনো শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে, নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎ চাহিদা বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে হয়তো সমস্যা হবে না। কিন্তু গ্যাসের সমস্যার কোনো সমাধান দেখছি না।

সমকাল :সংকটের মধ্যেও আমাদের আশার জায়গাটা কোথায়?
মীর নাসির :আশার বড় জায়গা আমাদের অভ্যন্তরীণ কৃষি উৎপাদন। প্রায় ২০ কোটি মানুষের আহার জোগানের জন্য মৌলিক খাদ্যশস্য নিজেরাই উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করেছি। মৌলিক খাদ্য ব্যবস্থাপনায় আমরা যথেষ্ট দক্ষতার স্বাক্ষর রাখছি।

সমকাল :কিন্তু মূল্যস্ম্ফীতির কারণে দেশের অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর মধ্যে অস্বস্তি আছে। অনেকে মূল্যবৃদ্ধি কোনোভাবে সামাল দিতে পারছেন না।
মীর নাসির :এটা ঠিক। কিন্তু এটাও ঠিক যে, এ পরিস্থিতি এখন কেবল বাংলাদেশের নয়। এটা বৈশ্বিক সমস্যা। মূল্যস্ম্ফীতি ইউরোপ-আমেরিকাতেও হচ্ছে। প্রতিটি উৎপাদন পর্যায়ে জ্বালানির ব্যবহার আছে। জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। ফলে দাম তো বাড়বেই। তবে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি পরে ঘটেছে। কভিড-পরবর্তী সময়ে জোগানের তুলনায় হঠাৎ ব্যাপক চাহিদা বৃদ্ধি সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘটায়।

সমকাল :ব্যবসায়ীদের একটি অংশের কারসাজি ও অতি মুনাফা প্রবণতাও জিনিসপত্রের দাম বাড়াচ্ছে বলে অনেকে মনে করেন। এ বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই।
মীর নাসির :কেউ কেউ অনৈতিক পন্থায় কিছু বেশি মুনাফার চেষ্টা করেন। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু এটাও মাথায় রাখতে হবে, দেশীয় উৎপাদন বা আমদানি করা হোক, সব পণ্যের ক্ষেত্রে ক্রেতা পর্যন্ত সরবরাহ চেইন অনেক বড়। এখানে উৎপাদক বা আমদানিকারকের বাইরে ডিলার, সাবডিলার এবং বহু ধাপে খুচরা বিক্রেতা আছে। প্রতি ধাপে কিছু দাম বাড়ে। সবটা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। আজকাল গুদাম থেকে সয়াবিন তেল বের হচ্ছে। অথচ কয়েকদিন আগে খুঁজেও পাওয়া যাচ্ছিল না। সাপ্লাই চেইন অনেক লম্বা হওয়ার কারণে সরকারও হয়তো এর পুরোটা মনিটর করতে পারে না। এ কারণে মাঝেমধ্যে সমস্যা হচ্ছে।

সমকাল :চলতি মূল্যবৃদ্ধির ধারা কখন কীভাবে লাগাম পরাতে হবে বলে মনে করেন?
মীর নাসির :আমি আশাবাদী মানুষ। সমস্যা হয়তো এক সময় থাকবে না। এক সময় কভিড সমস্যার পুরোপুরি দূর হবে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধও শেষ হবে। জ্বালানি তেলের দাম হয়তো আবারও ৬০ ডলারে নামবে। আবার কভিড-পরবর্তী চাহিদা ও জোগানের যে ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে, তাও এক সময় স্বাভাবিক হবে। এখন কোনটা কখন হবে আগাম বলা সম্ভব নয়। আমি বিশ্বাস করি, নতুন চ্যালেঞ্জ মানুষকে নতুন করে বাঁচতে শেখায়। বাংলাদেশের মানুষ প্রতিটি সংকটে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছে। তাদের উদ্যম আছে। এ উদ্যমই ছোট একটা দেশের মধ্যে প্রায় ২০ কোটি মানুষকে শান্তিপূর্ণ অবস্থায় রেখেছে। আমাদের কৃষিতে অনেক মানুষের সম্পৃক্ততা। কোটির ওপর মানুষ বিদেশে কাজ করে টাকা পাঠায়। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কয়েক কোটি মানুষ নির্ভরশীল। অর্থাৎ এখানে মানুষের নির্ভরশীলতা একক কোনো খাতে নয়। কোনো একটি বিশেষ সংকট হয়তো কিছু মানুষকে সমস্যায় ফেলছে, তবে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর ওপর নয়। এভাবে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনোয়ার ইব্রাহীম