ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ পর্ব। তৎকালীন ভারতে একদিকে প্রাচীনপন্থিদের ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার, জাতিভেদ প্রথা প্রভৃতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল; অন্যদিকে পাশ্চাত্যের ভাবধারার নব্য শিক্ষিত উগ্রপন্থিদের বিদেশিয়ানা সমাজ জীবনে ডেকে এনেছিল মহাবিপর্যয়। হিংসার আস্টম্ফালন ও প্রবৃত্তির প্রাবল্য গোটা সমাজ জীবনকে জরাগ্রস্ত ব্যাধির মতো হতাশ করে তুলেছিল। অশিক্ষা, কুশিক্ষা ও দারিদ্র্যের নিষ্পেষণে জর্জরিত মানুষ ধর্মীয় মূল্যবোধ ভুলতে বসেছিল। ইহকাল খুইয়ে পরকাল ভাগ্যের হাতে সঁপে দিয়ে মাঝদরিয়ার ডুবন্ত হতভাগার মতো মানুষ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। কে শোনাবে তাদের আশার বাণী? এমনি এক যুগসন্ধিক্ষণে প্রেমের ঠাকুর পতিত উদ্ধারকারী শ্রী শ্রী প্রভু জগদ্বন্ধু সুন্দর আজ থেকে ১৫২ বছর আগে এ ধরাধামে আবির্ভূত হন।

ফরিদপুর শ্রীধাম শ্রীঅঙ্গন মহানাম সম্প্রদায় ও ফরিদপুরবাসী প্রভু সুন্দরের ১৫২তম আবির্ভাব উৎসবের আয়োজন করেছে। এ উৎসব ২৫ বৈশাখ থেকে ২ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ (ইং ৯ মে থেকে ১৭ মে পর্যন্ত) ৯ দিনব্যাপী ধর্মীয় ভাবগম্ভীর পরিবেশে উদযাপিত হচ্ছে। প্রভু জগদ্বন্ধু সুন্দর ১২৭৮ বঙ্গাব্দের ১৬ বৈশাখ (ইং ১৮৭১ সালের ২৮ এপ্রিল) পবিত্র সীতা নবমী তিথিতে মুর্শিদাবাদের ডাহাপাড়া গ্রামে আবির্ভূত হন। তাঁর মাতা বামাদেবী, পিতা দীননাথ ন্যায়রত্ন। ১৭ মাস বয়সে প্রভু সুন্দরের মাতৃবিয়োগ ঘটে। পিতা দীননাথ ন্যায়রত্ন মুর্শিদাবাদ থেকে প্রভু সুন্দরকে সঙ্গে নিয়ে ফরিদপুর আসেন। শহরের ব্রাহ্মণকান্দা গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ব্রাহ্মণকান্দার অদূরেই গোয়ালচামট শ্রীধাম শ্রীঅঙ্গন অবস্থিত। শ্রী শ্রী প্রভু জগদ্বন্ধু সুন্দরের প্রকট লীলাকাল অতি সংক্ষিপ্ত। মাত্র ৫০ বছর বয়সে ১৩২৮ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাসের ১ তারিখে তিনি লীলা সংবরণ করেন।

প্রভু সুন্দরের দিব্য জীবনের দুটি দিক রয়েছে। একটি তার আধ্যাত্মিক। আধ্যাত্মিক দিক থেকে তিনি অবতার পুরুষ। তাঁর বিশ্বজনীন বাণী 'হরিপুরুষ জগদ্বন্ধু মহাউদ্ধারণ'। অপরটি সমাজের পিছিয়ে পড়া, খেটে খাওয়া অচ্ছুৎ বুনা, বাগদী, ডোম ও হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীকে উদ্ধারের জন্য বন্ধুরূপে প্রকাশ। বিংশ শতাব্দীর মহাত্মা গান্ধীর হরিজন আন্দোলন বা এ যুগের মাদার তেরেসা, নেলসন ম্যান্ডেলা প্রমুখ বিশ্বনন্দিত সমাজহিতৈষীর বহু আগে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে প্রভু জগদ্বন্ধু সুন্দর জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অধিকারবঞ্চিত মানুষকে মানুষের মর্যাদায় উন্নীত করার মহৎ কাজে অংশগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন মানবতার মূর্ত প্রতীক। ধর্মীয় পরিচয় তাঁর ছিল বটে; কিন্তু ধর্মীয় গণ্ডির বেড়াজাল তাঁকে আবদ্ধ করতে পারেনি। তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষের ধর্ম মানবধর্ম। সাধনা তাঁর মানব কল্যাণ। আর এ সাধনায় জাতি-ধর্ম-বর্ণের কোনো ভেদ নেই।

সুবল চন্দ্র সাহা: বীর মুক্তিযোদ্ধা ও আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট