ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক ড. সিতারা পারভিন আহমদ সাবেক প্রধান বিচারপতি ও সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের (সদ্যপ্রয়াত) জ্যেষ্ঠ কন্যা। তার সহকর্মী ও জীবনসঙ্গী অধ্যাপক ড. আহাদুজ্জামান মোহাম্মদ আলী। ২০০৫-২০০৬ সালের দিকে আমেরিকায় ছোট বোনের কাছে বেড়াতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন সিতারা পারভিন। সাংবাদিকতা বিভাগের অসামান্য জনপ্রিয় এই শিক্ষক অগণন ছাত্রছাত্রী, বন্ধু ও সহকর্মীদের হৃদয় ভেঙে চুরমার করে দিয়ে চলে গিয়েছিলেন। তখন তার কন্যা সবে কৈশোর-উত্তীর্ণ। সেই দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে তার পরিবারের সবাই এখন কীভাবে বাঁচেন! আমেরিকার মতো উন্নত-সভ্য রাষ্ট্রের সড়কে কীভাবে যখন-তখন এ রকম অবজ্ঞাজনিত সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে? দায়ীদের কী শাস্তি হলো, জানতে ইচ্ছা করে।

সত্তর দশকের শেষদিকের ঘটনা। আমার বড় ভাইয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন পারভেজ ভাই; বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি। প্রাণোচ্ছল, টগবগে তরুণ, গণমানুষের মুক্তির লড়াইয়ে জানবাজি যুদ্ধে সদা নিবেদিত। বাংলা একাডেমির সামনে রোড ডিভাইডারের ফাঁকা অংশ দিয়ে 'ট্রাফিক-বিধি সম্পর্কে নিরেট-মগজ' রিকশাচালক হঠাৎ রিকশাটি ঘোরাতে গেল। অন্যদিকে চলমান দ্রুতগতির গাড়ির আঘাতে রিকশার যাত্রী পারভেজ ভাই ঘটনাস্থলেই নিহত হলেন। রিকশাচালক যেমন বেকুব, তেমনি গাড়িটির চালকও বেপরোয়া। না হলে এই অবজ্ঞাজনিত দুর্ঘটনা এড়ানো যেত। পারভেজ ভাইয়ের পরিবারটি শোকে শেষ হয়ে গেল। তার স্বপ্ন ভেঙে খান খান হলো। এই মৃত্যুর জন্য দায়ী যে সড়ক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ; তাদের কেউ কিন্তু শাস্তি পেল না।

সত্তর-আশি-নব্বই দশকজুড়ে একটি প্রধান বাংলা দৈনিকের সাংবাদিক সংস্কৃতিমান মানুষ ফিরোজ আহমদ সজ্জন, অতিথিবৎসল। ফিরোজের ছোট দুটি বোনই ছিলেন অধ্যয়নশীল। বড়টির বিয়ে হয়েছিল ধানমন্ডিতে। আশির দশকের শুরুর সময়কার ঘটনা। একদিন রিকশাযাত্রী হয়ে সেই তরুণী যাচ্ছিলেন শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশে। সাতমসজিদ রোডে চরম ট্রাফিক-বিধি লঙ্ঘন করে উল্টো লেন ধরে একটা ট্রাক এসে সেই রিকশাকে চাপা দেয়। সেই রাস্তায়ই সব শেষ। দুটি পরিবারের সেই কান্না কীভাবে ভুলবে মানুষ! কার কী বিচার হয়েছে; কেউ শাস্তি পেয়েছে কিনা, জানা যায়নি।

এভাবে অবজ্ঞাজনিত সড়ক দুর্ঘটনায় কত মানুষ মারা যাচ্ছে, কত শতজন চিরতরে পঙ্গুত্ববরণ করছে, তার হিসাব কে রাখে! বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা স্টাডি সেন্টারের গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, নব্বই দশকের মাঝামাঝি অবধি যেখানে বছরে এ ধরনের অবজ্ঞাজনিত সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ছিল প্রায় এক হাজার, এখন তা প্রায় ২৫ গুণ; ২৫ হাজার। একই ধরনের দুর্ঘটনায় আহত যেখানে বছরে ছিল সাত-আট হাজার, সেখানে এখন আহতের সংখ্যা ৭০-৮০ হাজার কমপক্ষে। এদের বিশাল অংশই চিরতরে পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে।

এই তো সেদিনের ঘটনা; ২৯ মার্চ। মিরপুরের বিআরবি কলোনির বাসা থেকে বেরিয়ে দুই মেয়েকে নিয়ে নৌবাহিনী স্কুলের পথে- একটা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার যাত্রী ছিলেন মিসেস সাবিনা ইয়াসমিন ও তার দুই মেয়ে (৯ বছরের হুমায়রা, ৫ বছরের রাফিয়া)। দ্রুতগামী একটা বাস প্রবল বেগে ধাক্কা দিল অটোরিকশাকে। মা সাবিনা আর মেয়েরা ছিটকে পড়লেন রাস্তায়। শিশু দুটি প্রাণে বেঁচে গেলেও মা সাবিনা শেষ হাসপাতালে নিতে নিতেই। এর দু'দিন আগে মেয়েকে নিয়ে স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার পথে রিকশাযাত্রী ওয়ারীর বাসিন্দা মিসেস রফিকা নিহত হন বাসের ধাক্কায়।

কত নির্মম মৃত্যু এই নগরীর রাস্তায় সদা-অপেক্ষমাণ! সবকিছুই যেন প্রতিকারহীন! এসব ঘটনার নিষ্ঠুরতার শিকার এই শিশুগুলোর ছবি, খবর অনেকেই দেখতে পারেন না। পত্রিকার পাতায় তাকাতে ভয় পান। কিন্তু আমাদের সড়ক নিরাপত্তার কাজে যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত, তাদের কি একটুও হেলদোল আছে! ঘাতক গাড়িচালকদের কি এতটুকু মায়া-মমতা জন্মাবে মনুষ্য-প্রাণের প্রতি; কোনোদিন?

আশির দশকের মধ্যভাগের ঘটনা। তখনকার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার তার অফিসে আলোচনায় ডাকলেন সব চালক সমিতি ও বাস-ট্রাক মালিক সমিতির নেতাদের; সংখ্যায় ১৫-২০। আর পাঁচজন সাংবাদিক- সবাই দৈনিক পত্রিকাগুলোর স্টাফ বা সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার। দীর্ঘকালের অভিজ্ঞতায় সবাই সড়কের অবজ্ঞাজনিত মানুষ হত্যা ও পঙ্গু বানানোর তথাকথিত সড়ক দুর্ঘটনার শক্ত বিশ্নেষক। পুলিশ কমিশনার ভেবেছিলেন, এই রিপোর্টাররাই পারবেন সড়কের এই প্রাণহানি ঠেকাতে, ওই চালক-মালিকপক্ষকে বুঝিয়ে পথে আনতে। তার উদ্দেশ্য ছিল সাংবাদিকদের দিয়ে বেপরোয়া চালক ও গাড়ি মালিকদের অনাচার দূর করার একটা সফল পরামর্শ-সভা অনুষ্ঠান। সকাল ১০টায় শুরু হয়ে সে সভা চলে বেলা ৩টা অবধি। তুমুল বাগ্‌বিতণ্ডা চলে সাংবাদিকদের সঙ্গে চালকপক্ষ ও মালিকপক্ষের মিলিত চক্রের প্রতিনিধিদের।

সাংবাদিকরা সড়কে কঠোর নিয়মশৃঙ্খলা রক্ষায় গাড়ির চালক ও মালিকদের সব বিষয় গভীর বিশ্নেষণ করে বুঝিয়ে বললেন বারবার। আর আইন লঙ্ঘনের শাস্তির বিধান এবং সড়কের অবকাঠামোগত সমস্যাগুর সমাধান চাইলেন সরকারের কাছে। অন্যদিকে চালকপক্ষ এবং মালিকপক্ষ কোনো নিয়মবিধি ও যুক্তি-বিবেচনার আলোচনার পথে না গিয়ে উল্টাপাল্টা কথা চালিয়ে গেল। পুলিশ কমিশনার সাংবাদিকদের সড়ক নিরাপত্তার নিয়মশৃঙ্খলা-বিধি রক্ষায় আইনের পক্ষে কিছুটা পক্ষপাত দেখালেন, কিন্তু এগোতে পারলেন না। শেষ অবধি পাঁচ ঘণ্টার আলোচনা সভাটি ভণ্ডুল করে দিল চালক-মালিকপক্ষ। একইভাবে যুগ যুগ ধরে বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা স্টাডি সেন্টার কাজ করছে। কিন্তু তাদের পরামর্শ কেউ শুনছে না।

সড়কের সব চলাচল-বিধির 'রোড সাইন' নিয়ে এক মেধাবী প্রকৌশলী একখানা বই লিখেছেন। চালকদের জন্য একেবারেই অপরিহার্য বই সেটি; গাড়ির মালিকদের জন্যও। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মাওলা ব্রাদার্স তা প্রকাশ করেছে প্রায় তিন বছর আগে। কিন্তু সেই অপরিহার্য পাঠ্যবইটির ক্রেতা জুটছে না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় মিলে সেই বই ছেপে নিয়ে প্রচার করতে পারত চালক ও গাড়ির মালিকদের মধ্যে। তাতে চালকদের ট্রাফিক-বিধি শেখার কাজটি সফল হতো অনেকখানি। অবজ্ঞাজনিত সড়ক দুর্ঘটনা কমতও অনেকটা। সড়কে দুর্ঘটনার নামে এসব অবজ্ঞাজনিত প্রাণহত্যা, এসব পঙ্গু বানানোর আয়োজন কীভাবে থামবে? যারা সড়কের বিধিবিধান কঠোরভাবে মানাবেন সাধারণ পথচারী ও যাত্রীদের; তারা তো জেগে জেগে ঘুমান সর্বদা। কে আছে- এ জগতে তাদের এই নিদ্রা ভাঙায়!

খায়রুল কবীর খোকন: বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব, সাবেক সংসদ সদস্য ও ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক