বিদেশে বিপুল অর্থ পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত পি কে হালদার ভারতের পশ্চিমবঙ্গে শনিবার গ্রেপ্তার হয়েছেন। রোববার সমকালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, ভারতের অর্থ গোয়েন্দা সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডাইরেক্টরেট (ইডি) সেখানকার অশোকনগর থেকে পি কে হালদারকে তার ছোট ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী ও কয়েকজন সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করেছে। তাকে গ্রেপ্তারের পর ইডির পক্ষ থেকে দেওয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুরোধে ওই গ্রেপ্তার অভিযান চালানো হয়। শুধু তাই নয়; বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর থেকে জানা যায়, পি কে হালদার ও তার সহযোগীরা নাকি গত ছয় মাস ধরে ইডির নজরদারিতে ছিলেন। সেদিক থেকে বিএফআইইউ ও দুদককে সাধুবাদ জানাতে হয়। কারণ পি কে হালদার যে প্রক্রিয়ায় ও যে পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ ও পাচার করেছেন বলে অভিযোগ; তা অত্যন্ত আলোচিত একটি ঘটনা। দীর্ঘ সময় ধরে ওই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড তিনি পরিচালনা করেছেন, যা প্রভাবশালী কারও সহযোগিতা ছাড়া সম্ভব ছিল না। তা সত্ত্বেও বিএফআইইউ দেশের ব্যাংকিং খাতে যে কোনো আর্থিক কেলেঙ্কারি প্রতিরোধের পাশাপাশি প্রতিকারের জন্য কাজ করা যার মূল দায়িত্ব; দুদক যে কোনো দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ যার প্রধান দায়িত্ব; পি কে হালদার ইস্যুটি অন্য অনেক অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনার মতো অন্তত ধামাচাপা পড়তে দেয়নি। বরং যে কোনোভাবে পি কে হালদার ও তার কুকর্মের সহযোগীদের গ্রেপ্তারে সচেষ্ট থেকেছে।

পি কে হালদারের বিরুদ্ধে অভিযোগ, বিভিন্ন ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি অন্তত সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে তা কানাডা, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করেছেন। কারও কারও হিসাবে তার আত্মসাৎকৃত টাকার অঙ্কটা ১০ হাজার কোটিরও বেশি। এ টাকাগুলো তিনি এক দিনে আত্মসাৎ করেননি, আর এক দিনেও তা বিদেশে পাচার করেননি। একটি সহযোগী বাংলা দৈনিকের এক প্রতিবেদনমতে, 'অদৃশ্য এক আশীর্বাদে' ২০০৯ সালে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হওয়ার মধ্য দিয়ে পি কে হালদারের উত্থান। এর পর একটি বেসরকারি ব্যাংকের এমডি হয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে মুমূর্ষু করে দিয়ে যান। একই সময়ে তিনি নামে-বেনামে বহু কোম্পানি খুলেছেন। সেগুলো ব্যবহার করে শেয়ারবাজারের মাধ্যমে একের পর এক প্রতিষ্ঠান দখল করেছেন, আবার সেসব প্রতিষ্ঠান থেকে আত্মীয়স্বজন ও সহযোগীদের নামে ঋণ নিয়ে তা বিদেশে পাচার করেছেন। মূলত ২০১৯ সালের দিকে যখন তার দখলকৃত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হতে শুরু করে, তখনই তিনি ওই প্রভাবশালীদের সহযোগিতায়, এমনকি তার দেশত্যাগের ওপর দুদকের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বিদেশে পালিয়ে যান।

আমাদের বক্তব্য, ২০০৯ থেকে ১৯- এ ১০ বছরে পি কে হালদার বাংলাদেশের আর্থিক খাতে একেবারে সংশ্নিষ্ট সব নিয়ন্ত্রক সংস্থার নাকের ডগায় বসে এই যে একের পর এক কেলেঙ্কারির জন্ম দিলেন, তা সম্ভব হতো না যদি এখানকার ব্যাংকিং বা খোদ আর্থিক ব্যবস্থায় কোনো গলদ না থাকত। এ গলদ থাকার কারণেই আমরা এর আগে এখানে হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপসহ বিভিন্ন কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটতে দেখেছি। যেগুলোর কারণে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। শুধু তাই নয়, দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা ইতোপূর্বে গত কয়েক বছরে একাধিকবার দেশ থেকে প্রতিবছর অন্তত ২৭ হাজার কোটি টাকা পাচার হওয়ার কথা বলার সময় দেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক ব্যবস্থার ওই গলদের বিষয়টি উল্লেখ করেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো, আজ পর্যন্ত সংশ্নিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি। বরং কখনও এ ধরনের প্রতিবেদনকে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে; কখনও বড় বড় আর্থিক কেলেঙ্কারিকেও লঘু করে দেখার প্রয়াস চালিয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা, পি কে হালদার ও তার যেসব সহযোগী ভারতে গ্রেপ্তার হয়েছে তাদের দ্রুত দেশে এনে বিচারের মুখোমুখি করা হবে এবং একই সঙ্গে যেসব প্রভাবশালী মহলের প্রশ্রয়ে তিনি একের পর এক কেলেঙ্কারি ঘটালেন; তাদেরও খুঁজে বের করে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হবে। সর্বোপরি, দেশের পুরো ব্যাংকিং ও আর্থিক ব্যবস্থাটিকে গভীর পর্যালোচনার মাধ্যমে গলদমুক্ত করা হবে।