সমস্যাকে সামগ্রিকভাবে বিবেচনা না করে খণ্ডিতভাবে সমাধানের চেষ্টা কী নেতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে; তার একটা 'আদর্শ' উদাহরণ রাজধানীর তেজগাঁও থেকে আব্দুল্লাহপুর সড়কে নির্মিত ইউটার্নগুলো। সোমবার সমকালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্র দু'বছর আগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) নির্মিত এ সড়কের ১০ ইউটার্নের দুটি ইতোমধ্যে গুটিয়ে নেওয়া হয়েছে। যানজট কমার বদলে বেড়ে যাওয়ার কারণে বাকিগুলোও একই ভাগ্য বরণ করতে যাচ্ছে। এর ফলে এসব প্রকল্পের পেছনে ব্যয়িত প্রায় ৩১ কোটি টাকার পুরোটাই গচ্চা যেতে বসেছে। জনগণের সুবিধা করতে গিয়ে জনগণেরই অর্থের শ্রাদ্ধ করার এমন উদাহরণ এদেশে বিরল না হলেও একেবারে নাকের ডগায় এমন দৃষ্টান্ত মেনে নেওয়া যায় না।

উল্লেখ্য, ১০ বছর আগে তৎকালীন ডিএনসিসি মেয়র রাজধানীর যানজট কমানোর উদ্যোগের প্রথম ধাপ হিসেবে তেজগাঁও-আব্দুল্লাহপুর সড়কে ১০টি ইউটার্ন নির্মাণের ঘোষণা দেন। তার আকস্মিক মৃত্যুতে প্রকল্পটি সাময়িক থমকে গেলেও বর্তমান মেয়র তা শেষ করার উদ্যোগ নেন। সেই সময় কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ প্রকল্পগুলো আরও ভেবে বাস্তবায়নের পরামর্শ দিলেও তা কানে তোলা হয়নি। যদি তা শোনা হতো তাহলে অন্তত রাষ্ট্রীয় অর্থের এমন অপচয় হতো না।

আরও বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, যে প্রকৌশলীর পরামর্শে এ প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল, আজ সেই প্রকৌশলীই বলছেন, তার পরামর্শ মেনে এসব ইউটার্ন তৈরি করা হয়নি। তিনি নাকি ইউটার্ন নয়; টার্নইয়ার্ডের কথা বলেছিলেন। প্রতিবেদনে তাকে উদ্ৃব্দত করে যেমনটা লেখা হয়েছে, 'কিছু টার্নইয়ার্ড তার পরামর্শমতো তৈরি করেনি ডিএনসিসি। এ কারণে সেগুলোতে ফল আসছে না।' এর পরিপ্রেক্ষিতে এটা বলা নিশ্চয় অত্যুক্তি হবে না যে, অন্য অনেক সরকারি প্রকল্পের মতো এখানেও প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি স্পষ্ট। বহু বছরের পর্যবেক্ষণ থেকে জনমনে একটা ধারণা জন্মেছে, সরকারি কর্মকর্তা অনেকের মধ্যেই কমিশন পাওয়ার সম্ভাবনা আছে এমন প্রকল্প গ্রহণে তড়িঘড়ি করার ব্যাপারে আগ্রহ একটু বেশিই দেখা যায়।

কেউ যদি একই রকম সন্দেহ আলোচ্য প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের ব্যাপারেও পোষণ করে, তাহলে তাকে খুব একটা দোষ দেওয়া যাবে না। এমন অভিযোগ তোলার আরেকটা কারণ হলো, প্রতিবেদনেই বিশিষ্ট পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামছুল হককে উদ্ৃব্দত করে লেখা হয়েছে, উন্নত দেশে সড়কের চেয়ে ফুটপাত থাকে চওড়া। আর এখানে ফুটপাত সংকুচিত করে ইউটার্ন বানানো হয়েছে। তাই এসব ইউটার্ন দিয়ে রাজধানীর যানজটের সমাধান হবে না। এ কথাগুলো প্রকল্পসংশ্নিষ্ট প্রকৌশলীরা জানেন না, তা হতে পারে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তারা এসব জেনেও ওই অকার্যকর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছেন।

মানতে হবে যে, ঢাকার যানজট হঠাৎ গজিয়ে ওঠা কোনো সমস্যা নয়। তা ছাড়া সমস্যার কারণটি অনেকাংশে বর্ধিষুষ্ণ এ শহরের রাস্তার সংখ্যা ও প্রশস্ততা প্রয়োজনের তুলনায় কম হওয়ার ফল হলেও এটা অস্বীকার করা যাবে না যে, মূলত অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে তা আজকের প্রকট রূপ ধারণ করেছে। অন্যভাবে বলতে গেলে, রাতারাতি যেমন সমস্যার সমাধান করা যাবে না, তেমনি বিক্ষিপ্ত কোনো প্রয়াস থেকেও রাজধানীবাসীর মুক্তি মিলবে না। অনেকের মনে থাকার কথা, যানজট নিরসনের নামে এক সময় জনগণের করের টাকায় গড়া এ শহরের বিভিন্ন সড়কের আইল্যান্ডগুলো তুলে দেওয়া হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে দুর্ঘটনা রোধ, এমনকি সৌন্দর্যবর্ধনের কথা বলে সেগুলোকে প্রচুর অর্থ ব্যয়ে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। মোদ্দা কথা, যানজট কমানোর নামে রাস্তার ওপর জনগণের অর্থ ব্যয় করে যে কোনো ধরনের কাঠামো গড়া ও ভাঙার এ খেলা থেকে তো বটেই; সব ধরনের বিক্ষিপ্ত প্রচেষ্টা থেকে আমরা নিস্কৃতি চাই। আমাদের প্রত্যাশা, ঢাকার সড়ক ও যানবাহন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত সব কর্তৃপক্ষ একসঙ্গে এ বিষয়ে স্বীকৃত বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বসবে। সেখান থেকে যে সমাধান বেরিয়ে আসবে, তা সর্বোচ্চ নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা হবে।