অমর একুশের গানের রচয়িতা এবং বাংলা ভাষার শীর্ষস্থানীয় কলাম লেখক আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর প্রয়াণে আমরা যেমন শোকে স্তব্ধ, তেমনই শূন্যতায় চঞ্চল। বৃহস্পতিবার স্থানীয় ভোরবেলা তিনি যখন লন্ডনের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন ঢাকায় জ্যৈষ্ঠের মেঘলা দুপুর। ভ্যাপসা আবহাওয়া যেন আরও ভারাক্রান্ত করে তুলেছিল এই কীর্তিমান বাঙালির মৃত্যু সংবাদ। আমরা দেখেছি, সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাগরিকদের আলোচনায় উঠে এসেছে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও প্রাণঢালা ভালোবাসা। বস্তুত রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ বিশিষ্টজনের আনুষ্ঠানিক শোক প্রকাশের মধ্য দিয়ে গোটা জাতির বেদনাই প্রতিফলিত হয়েছে। যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বাঙালি সম্প্রদায়ের মধ্যেও নেমে এসেছে শোকের ছায়া। আমরা জানি, বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার একুশে ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। সেই পথ ধরে একুশের গানও বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত ও উচ্চারিত হচ্ছে। এর রচয়িতার প্রয়াণও তাই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের উপজীব্য ও মাতৃভাষাপ্রেমী বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর শোক ও শ্রদ্ধার উপলক্ষ হয়ে উঠবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। আমরা বিশ্বাস করি- আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী শারীরিকভাবে চিরপ্রস্থানে গেলেও জীবন ও কর্ম দিয়ে তিনি আমাদের মধ্যে নিঃসন্দেহে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। পারিবারিক কারণে পঁচাত্তর-পরবর্তী দীর্ঘ সময় প্রবাসে অবস্থান করলেও দেশমাতৃকা তাঁকে স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদকসহ শীর্ষ সারির সব সম্মানে ভূষিত করে মর্যাদার আসনে বসিয়ে রেখেছে।

বাংলাদেশের গড় আয়ুর অনুপাতে আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী পরিণত বয়সেই প্রয়াণ লাভ করলেন- আবেগের ঊর্ধ্বে উঠেই তা স্বীকার করতে হবে। কিন্তু এটাও অনস্বীকার্য যে, তিনি প্রায় শেষ দিন পর্যন্ত বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় মগ্ন ছিলেন। হাসপাতালের শয্যায় শুয়েও দেশ ও জাতি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা প্রকাশ করে গেছেন। আমরা জানি, মাত্র মাসখানেক আগে তাঁর এক কন্যার অকাল প্রয়াণ ঘটেছে। স্ত্রীকেও হারিয়েছেন এক দশকের বেশি সময় আগে। এসব ঘটনা তাঁকে মানসিক ও শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত করেছে নিশ্চয়; কিন্তু চেতনায় শানিত থেকেছেন। বাংলা ভাষা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ ছিল তাঁর চেতনার কেন্দ্রবিন্দু। ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ- রাষ্ট্রব্যবস্থার তিন কাল দেখেছেন। তিন আমলেই ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগতভাবে ঝড়-ঝাপ্টা সামলেছেন; কিন্তু আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের মাঠ ছেড়ে যাননি। চেতনা, মেধা, মনন ও আড্ডায় তিনি ছিলেন প্রাণবন্ত ও তারুণ্যে ভরপুর। স্বাভাবিকভাবেই আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম, তিনি আরও অনেক বছর আমাদের মাঝে থাকবেন এবং জাতি তাঁর মেধা ও মননে উপকৃত হতে থাকবে। দুর্ভাগ্যবশত, তার আগেই তাঁকে চলে যেতে হলো। বয়সের তুলনায় না হলেও জাতির প্রতি তাঁর অবদান ও প্রয়োজনীয়তার নিরিখে এটা অবিসংবাদিতভাবে অকাল মৃত্যু। তাঁর শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর বিদায়ে বেদনার মধ্যেও স্বস্তির বিষয় হচ্ছে- তিনি একটি সার্থক জীবন যাপন করে গেছেন। ব্যক্তিগত লাভালাভের বদলে দেশ ও জাতির জন্য আজীবন উৎসর্গিত থেকেছেন। যদিও সাহিত্যিক হিসেবে জীবন শুরু করেছিলেন এবং সেখানে স্বল্পকালের মধ্যেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন; কিন্তু তিনি কেবল সাহিত্যে নিজেকে সীমিত রাখেননি। বলা চলে, কলামিস্ট হিসেবে তিনি বিশ্বরেকর্ড করেছেন। দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রায় প্রতিদিনই রাজনৈতিক বিশ্নেষণ লিখে গেছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সভা-সেমিনারে বক্তব্য রেখেছেন; সামাজিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগে পরামর্শ দিয়েছেন। আদর্শ ও বিশ্বাসের সঙ্গে কখনও আপস করেননি। জীবনের প্রায় সর্বক্ষেত্রে ঋজুতা দিয়ে তিনি অর্জন করেছিলেন সর্বজনীন শ্রদ্ধা। অবশ্য আমরা মনে করি- সবচেয়ে বড় সার্থকতা ব্যক্তি হিসেবে তাঁর সততা, নিষ্ঠা ও দেশপ্রেম। আমরা বিশ্বাস করি, তাঁর জীবনাদর্শ যেমন পরবর্তী প্রজন্মকে পথ দেখিয়ে চলেছে, তেমন ভবিষ্যতেও চলবে।

সমকাল পরিবারের সঙ্গে আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর ঘনিষ্ঠতা সমকাল আত্মপ্রকাশের সময় থেকেই। তিনি আমাদের জন্য নিয়মিত কলাম লিখেছেন, সাক্ষাৎকার দিয়েছেন; দেশে এলেই সমকালে উপস্থিত হয়ে প্রেরণা জুগিয়েছেন, আলো ছড়িয়েছেন। তিনি ছিলেন সমকালের অন্যতম প্রধান অভিভাবক। তাঁর মৃত্যুতে আমরা ঘনিষ্ঠ স্বজন হারানোর বেদনা অনুভব করছি। আমরা আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি। তাঁর পরিবারের প্রতি জানাই গভীর শোক ও সমবেদনা। এই কীর্তিমান ব্যক্তির শারীরিক প্রস্থান হলেও তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক উপস্থিতি অম্লান হয়ে থাকবে আমাদের মাঝে।