শ্রীলঙ্কায় সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংকট এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে মাসাধিককালের আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে ৯ মে। ওই দিন প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে পদত্যাগে বাধ্য হন। ১২ মে নতুন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্য থেকেও আশার আলো দেখা যাচ্ছে। নতুন প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে নতুন কেউ নন। অভিজ্ঞতায় টইটম্বুর তিনি। রনিল বিক্রমাসিংহে এবার ষষ্ঠবারের মতো শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী হলেন। এদিক থেকে তিনি সম্ভবত বিশ্বে রেকর্ড করেছেন। তাঁকে ঘিরে অনেক সমালোচনা থাকলেও পার্লামেন্টের অন্যান্য সদস্যের মধ্যে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তিনিই অগ্রগণ্য। তবে, ক্ষমতাসীন দলের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর পদায়নকে যেভাবে শ্রীলঙ্কার জনগণ অপমান হিসেবে দেখছে, তাতে এ পর্যায়ে তাঁর গুরুত্ব কমে যেতে পারে।
পার্লামেন্টের বর্তমান অবস্থায় কেবল রনিল বিক্রমাসিংহেই নন, অন্য যে কেউ যেমন- সাজিত প্রেমাদাসা, কারু জয়সুরিয়া বা ক্ষমতাসীন দলের বাইরের যে কেউ ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছে সাপেক্ষে প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন। তবে চলমান সংকটে জাতিকে এটা যাচাই করে দেখাতে হবে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অর্পিত দায়িত্ব পালনের ক্ষমতা রনিল বিক্রমাসিংহের রয়েছে কিনা। সম্ভাব্য স্বল্প সময়ের মধ্যে নির্বাচন হবে। এর মধ্যে তাঁকে লেনদেনের ভারসাম্যে যেমন একটা স্বস্তিকর অবস্থা তৈরি করতে হবে, তেমনি অর্থনৈতিক অন্য সমস্যাগুলো সমাধানের একটা শক্ত ভিত্তি রচনা করতে হবে। যেভাবে আন্দোলন হচ্ছে তাতে চ্যালেঞ্জগুলো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই কেবল নয়, চিন্তা ও প্রত্যাশার জায়গা থেকেও অনেকটা নৈরাজ্যিক; যা এমনকি বৈদেশিক লেনদেনে 'ব্যালান্স অব পেমেন্ট' সমস্যার সমাধানের চেয়েও কঠিন। তবে এ চ্যালেঞ্জ কেবল রনিল বিক্রমাসিংহের জন্যই নয়, এ সময়ে শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রিত্বের দায়িত্ব নিয়ে যাঁরাই আসতেন (সাজিত, কারু জয়সুরিয়া, সারাথ ফনসেবা, আনুরা কুমারা বা অন্য কেউ) সবাই এ সমস্যার সম্মুখীন হতেন।
বর্তমানে শ্রীলঙ্কার শিক্ষিত জনগোষ্ঠী কিংবা জনমত তৈরির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মানসিকতায় নৈরাজ্যিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তার ফলে দেশটি হয়তো এক বিপর্যয়কর সমাপ্তির দিকে যাবে। বর্তমান ধারাকে বিশ্নেষণ করে এটা বলা যায়, খুব সম্ভবত শ্রীলঙ্কান সমাজে সংকট ও ভোগান্তি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছার পরই পরিস্থিতি বাস্তবতার আলোকে দেখার প্রজ্ঞা তৈরি হবে।
সংকটের সময়ে শ্রীলঙ্কায় সামাজিক ও রাজনৈতিক মানসিকতার এক জ্বলন্ত উদাহরণ হলো বর্তমানে জনপ্রিয় স্লোগান 'গোটাগোহোম'। গোটা গো হোম অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া বাড়ি যাও। এ স্লোগান বস্তুত বিশৃঙ্খল ও অসাংবিধানিক প্রকৃতি প্রকাশেরও উদাহরণ। ১৯৭৮-এর সংবিধান দ্বারা শাসনের এ পদ্ধতি ইচ্ছাকৃতভাবেই তৈরি করা হয়েছে! সেখানে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতির শাসন অগ্রাহ্য হবে না। তবে অভিশংসন হলে কিংবা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হলে সেটি ভিন্ন কথা। এমনকি শ্রীলঙ্কায় প্রধানমন্ত্রী এবং অন্য মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা প্রস্তাবে সরকার যদি পরাজিতও হয়, তাতেও প্রেসিডেন্টের কিছুই হবে না। যদিও তিনি মন্ত্রিপরিষদের নেতা। তার মানে অনাস্থা ভোটের প্রভাব কেবল প্রধানমন্ত্রী কিংবা অন্য মন্ত্রীদের ওপরই পড়বে; এর বাইরে গুরুতর অবস্থায় তার প্রভাব এমনকি পার্লামেন্টের ওপরও পড়তে পারে।
সাংবিধানিক ধারা অনুযায়ী ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে কেবল তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিশংসনের মাধ্যমেই নড়ানো যাবে। তবে সংবিধানের ধারা অনুযায়ীই কোনো অভিশংসনে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে জেতাও অত্যন্ত কঠিন। কারণ এর জন্য পার্লামেন্টে প্রস্তাবের পক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকতে হবে। যদিও প্রেসিডেন্টকে পদত্যাগের জন্য বলা যাবে, তবে এ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সাংবিধানিকভাবে পদত্যাগে তিনি বাধ্য নন। এমনকি শক্তিশালী পক্ষ থেকে পদত্যাগের কথা বলা হলেও তা শুনতে তিনি বাধ্য নন। তাঁর ইচ্ছে হলে তিনি পদত্যাগ করতে পারেন। পদত্যাগ করার পর পরবর্তী প্রেসিডেন্ট পার্লামেন্টের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মনোনীত হবেন। তার মানে এতে পার্লামেন্টে সবচেয়ে ক্ষমতাধর দল কিংবা গ্রুপের সিদ্ধান্তের প্রভাব থাকবে।
ফলে প্রেসিডেন্টকে পদত্যাগের ব্যাপারে যে কোনো সহিংসতা কিংবা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনও সংবিধানের ধারা অনুযায়ী অসংবিধানিক 'বিপ্লব' হিসেবে গণ্য করা যাবে। যদিও শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্টকে পরাজিত করা যাবে, যদি তার জন্য সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। যদি দেশ ভয়ানক দুর্দশায় পড়ে, নৈরাজ্যজনক পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে, যেভাবে ব্যাংক ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যায়, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষ তীব্র আকার ধারণ করে।
শ্রীলঙ্কায় আন্দোলনে বর্তমানে তারুণ্যের যে জোয়ার দেখা যাচ্ছে তার একেবারে শুরু থেকে আমার আস্থা ও অনুরোধ ছিল, এ আন্দোলন যেন সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় পরিচালিত হয়। লেখালেখি ও ভিডিও আলোচনার মাধ্যমে আমি এ অনুরোধ জানিয়েছিলাম। এ অনুরোধ জানিয়েছিলাম প্রবীণ শিক্ষিতদের উদ্দেশ্যে, যাঁরা গুরুত্বপূর্ণ মতামত দেন এবং আন্দোলনরত তরুণদের পরামর্শক। আমি ওইসব তরুণের জ্ঞাতার্থে আমার মতামত দেইনি যাঁরা সরাসরি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। তবে তরুণরা আন্দোলনের যে পথ বেছে নিয়েছেন শিক্ষিত প্রবীণরা প্রায় বিনাবাক্য ব্যয়ে তাই মেনে নিয়েছেন এবং তাঁরা ইতিবাচকভাবে বলেছেন, সেটাই সঠিক পথ। তাঁরা তাঁদের এভাবে আন্দোলনে উৎসাহিত করেছেন, প্রেরণা দিয়েছেন এবং তাঁদের পথে আন্দোলন চালিয়ে যেতে অনেকটা বাধ্যও করেছেন।
অবস্থাদৃষ্টে স্পষ্ট, তাঁরা তরুণদের এটা বলেননি যে, তাঁদের মূল দাবি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং জোরপূর্বক এ আন্দোলন চালিয়ে গেলে তার পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। দাবি সবসময়ই যৌক্তিক হওয়া চাই। অসম্ভব কোনো দাবি করা এবং নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করা উচিত নয়। শ্রীলঙ্কায় যেখানে তরুণদের আন্দোলন হওয়া উচিত যথার্থ ও আদায়যোগ্য প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধনে, সেখানে তাঁরা নাছোড়বান্দার মতো 'গোটাগোহোম' স্লোগান দিয়েই যাচ্ছেন। এর মাধ্যমে যেন দেশটির যেসব সংস্কার প্রয়োজন তা আদায় হয়ে যাবে। এর চেয়ে যৌক্তিক হতো, শ্রীলঙ্কায় বর্তমানে আইনের ঊর্ধ্বে থাকা প্রেসিডেন্টকে যদি তাঁরা বোঝাতে সক্ষম হতেন, যাতে প্রেসিডেন্ট নিজেকে আইনের মধ্যে এনে সংবিধান সংশোধনে রাজি হন। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করেন। তা না করে তাঁরা একগুঁয়ের মতো, 'গোটাগোহোম' স্লোগান দিয়েই যাচ্ছেন। কার্যত তার বাস্তবায়ন কি সহজ হবে?
এমনকি এই পর্যায়েও যদি তরুণ প্রজন্ম এই অবাস্তবায়নযোগ্য স্লোগান দেওয়া বন্ধ করতে উদ্যোগী হন। এমনকি তাঁরা যদি এই স্লোগানের মাধ্যমে জিতেও যান, মানে প্রেসিডেন্ট পদত্যাগ করেন, যদিও তা অসম্ভবও মনে হয়। তারপরও তখন পুরো পদ্ধতিগত ব্যাপক সংস্কার করতে হবে। এরপর হয়তো বলা যাবে, তাঁরা সফল। কেবল তখনই তাঁদের এই জোরপূর্বক জাগরণ ইতিহাসের পাতায় লেখা হবে যে, তাঁদের আন্দোলন শ্রীলঙ্কায় একটি প্রত্যাশিত ও জরুরি ইতিবাচক ফল এনেছে।
ভিক্টর ইভান :সাংবাদিক; শ্রীলঙ্কার বাণিজ্যিক সংবাদপত্র ডেইলি এফটি থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর

মাহফুজুর রহমান মানিক