আব্দুস সালাম অর্থাৎ সালাম ভাই রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুলের ক্রীড়া শিক্ষক ছিলেন। আমরা এই সালাম ভাইকে ভয় পেতাম। নেটের একটি খনিতে ১০-১২টি হকি বল নিয়ে হকি মাঠে আসতেন আর খেলার প্র্যাকটিস শেষ হলেই তাঁর নিজস্ব পদ্ধতিতে কোচিং করাতেন। যে তাঁর হাতে পড়ত তার জীবন 'শ্যাষ', আমি বহুবার পড়েছি। স্ট্যামিনা কীভাবে ভাঙাতে হয় তা তিনি জানতেন আর কড়ায় গণ্ডায় আদায় করতেন। তখন বিদেশি কোচের প্রয়োজন পড়েনি। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে নবি কালাত, তাহের জামান, নাভিদ আলম, সাইদ আনোয়ার এসেছিল। ব্যাংককে ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ ১৭-০ গোলে হেরেছিল। কোচ এমন খেলোয়াড় নিয়েছিলেন, যারা প্রথম বিভাগ হকিই খেলেনি। এখন আছেন গোপীনাথন কৃষ্ণা মূর্তি। মালয়েশিয়ার। বিকেএসপির কোচ। আমাদের একটা বদ্ধমূল ধারণা, বিকেএসপির কোচ দিয়ে জাতীয় দলের কোচিং করানো। বিকেএসপির কোচিং আর জাতীয় দলের কোচিংয়ে পরিবেশ আকাশ-পাতাল ফারাক। এই বিদেশি কোচদের থেকে কখনোই আহামরি ফল পাওয়া যায়নি। আর ভবিষ্যতেও তাঁরা দিতে পারবেন বলে আশা নেই। বাংলাদেশ ১৯৮৫ সালে ১৭ গোল দেওয়া পাকিস্তানকে নাভিশ্বাস তুলে দিয়েছিল। কোচ ছিলাম আমরাই।

আমাদের একটি জাতীয় টিম ম্যানেজমেন্ট কমিটি আছে, যার সদস্যরা প্রাধান্য দেন বিদেশি কোচদের। জার্মানির অলিভার কার্জকে হেড কোচ করে তাঁর সঙ্গে সব সাপোর্ট স্টাফ মানে উপদেষ্টা, টেকনিক্যাল উপদেষ্টা, ভিডিও অ্যানালিস্ট, ফিজিও থেরাপিস্ট- সব জার্মানির। ব্যয় হবে ২৩০০০ ডলার। সাবেক কোচ পিটার গার্হার্ডও থাকবেন উপদেষ্টা। এলাহি কারবার! মাহাবুব হারুনকে স্থানীয়দের পক্ষে হেড কোচ করা হয়েছিল। কোচ হারুন, মামুন, রাজু, জামাল হায়দার, নুরুল ইসলাম, কাওসার আলি তাঁদের ওপর আস্থা রেখে বাংলাদেশ হকির দায়িত্ব দেওয়া হলে এতদিনে বাংলাদেশ হকি জয়ের ধারাবাহিকতায় চলে আসত। মাইকেল জ্যাকসনের ছিল কালো থেকে সাদা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা। বিভিন্ন অপারেশন আর ওষুধের প্রভাবের ধকল সইতে না পেরে জীবনই দিয়ে দিলেন। হকি কর্মকর্তারা বিদেশি কোচের কোচিংয়ে হকির স্বাভাবিক ফল বারবার হাতছাড়া করছেন। ধারাবাহিক তো হতেই পারছেন না। ওমানের কাছে হারলাম ৬-২ গোলে। অথচ দুই মাস আগে পেনাল্টি শুট আউটে ওমানকে হারিয়েছিলাম।

পাকিস্তানের কোচ নিয়ে বলেছিলাম। তাঁরা আসার পর আমরা কোচকে সন্তুষ্ট করতে 'হামকো বাডড় তোমকো দওয়াত' ধরনের উর্দু বলে অযাচিত তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলি। কখনোই পাকিস্তানি কোচরা বাংলা বলেন না। কারণ হলো, আমরা আগডুম বাগডুম উর্দু বলতেই থাকি। প্রথমেই আমরা ভাষার সঙ্গে আপসে চলে যাই। রক্তের বিনিময়ে ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করেছি। ওই যে বলে- 'কাজির গরু কেতাবে থাকে'; বাস্তবে পাওয়া যায় না। শুধু খেলার রাজ্য নয়, ভাষার প্রতি আমাদের আবেগ রয়েছে। তবে ব্যবহারে কার্পণ্য আছেই। আদালতে ৮০ শতাংশ বাদী-বিবাদী গ্রামের; রায় হয় ইংরেজিতে। এরা 'বুইজ্জা সারা'।

আবার খেলায় ফিরি। আমাদের খেলোয়াড়রা নির্দি্বধায় এশীয় মানের, দেশি কোচদের মান অবশ্যই গর্ব করার মতো। অভাবটা হলো কর্তাদের বিদেশি কোচের জন্য প্রীতি। এ রোগটির আশু সার্জারি দরকার। আমাদের বহু দক্ষ 'অর্থোপেডিক' ক্লাব কর্তা রয়েছেন, তাঁদের সময়োচিত পদক্ষেপে হকিতে সুষ্ঠু পরিবেশ আনতে সাহায্য করবে। বিদেশি কোচরা যে টাকা নেন, তা দিয়ে আমরা সাত-আটজন দেশি কোচ নিয়োগ দিতে পারি। বিদেশি কোচদের যেমন অর্থ প্রয়োজন, তেমনি দেশি কোচদেরও। তাঁদের নিয়োগের সময় অর্থ বরাদ্দ এত কম, যা দৃষ্টিকটু।

বিদেশি কোচ নিয়েও ভালো ফল না পাওয়াতে কর্তারা আর কী বলবেন, 'মন দিল না বঁধু, মন নিল যে শুধু,/আমি কী নিয়ে থাকি।' কী নিয়ে আর কর্তারা থাকবেন; আবার বিদেশি কোচ খুঁজবেন! বলব, 'ন্যাড়া বারবার বেলতলায় যায় না'- এ প্রবাদটি অনুধাবন করুন।

মেজর (অব.) সাহাবুদ্দিন চাকলাদার: জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারপ্রাপ্ত ও সাবেক অধিনায়ক, জাতীয় এবং সেনাবাহিনী হকি দল