এবার বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে জাতিসংঘের মূল প্রতিপাদ্য ছিল- 'ডিজিটাল অবরোধের ভেতরে সাংবাদিকতা'। মূল প্রতিপাদ্যের ব্যাখ্যা সংবলিত যে সংক্ষিপ্ত ধারণাপত্র, সেখানে তিনটি বিষয়কে সামনে আনা হয়েছে- ডিজিটাল নজরদারি, ডিজিটাল আক্রমণ এবং সামাজিক মাধ্যমের আগ্রাসনের কবলে প্রচলিত সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকতা। এই ধারণাপত্রের উৎস হিসেবে ইউনেস্কোর একটি গবেষণা প্রতিবেদনের কথা বলা হয়েছে, যার শিরোনাম ছিল 'থ্রেটস অ্যান্ড সাইলেন্স :ট্রেন্ডস ইন দ্য সেফটি অব জার্নালিস্ট'। প্রতিবেদনে ২০১৬ থেকে '২০ সাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণের নতুন ধরন সম্পর্কে বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, এই পাঁচ বছরে বিশ্বজুড়ে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ৪শ সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। পরিসংখ্যান বিশ্নেষণ থেকে দেখা যায়, এই সংখ্যা আগের পাঁচ বছরের সাংবাদিক হত্যার তুলনায় ২০ শতাংশ কম। তবে সাংবাদিক হত্যা কিছুটা কমলেও সাংবাদিকদের ওপর ডিজিটাল আক্রমণ এবং আইনের নানা মারপ্যাঁচে গ্রেপ্তার ৩০ শতাংশ বেড়েছে। বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন চালু হওয়ার পর ২০১৮ সাল থেকে সাংবাদিকদের যেমন খুশি, যখন খুশি গ্রেপ্তার ও হাতকড়া পরিয়ে ছবি তুলে জনসমক্ষে প্রদর্শনের চিত্রটিও আমাদের জানা।

কিছুদিন আগে পেগাসাস নামে একটি ডিজিটাল নজরদারি নেটওয়ার্কের কথা ফাঁস হয়েছিল অপর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মধ্য দিয়ে। যে অনুসন্ধান করেছিল বিশ্বের ১৬টি সংবাদমাধ্যম একযোগে। কানাডার সিটিজেন ল্যাব বেশ বিস্তারিতভাবেই পেগাসাস নজরদারির ভেতরে কারা আছে সে সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করেছিল। সেখানেই দেখা গিয়েছিল বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান, বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাদের পাশাপাশি সাংবাদিকরা পেগাসাস নজরদারির তালিকায় আছেন। ইউনেস্কোর প্রতিবেদনেও প্রায় একই ধরনের তথ্য উঠে এসেছে। এই প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা শুধু নয়, গণতান্ত্রিক পরিবেশ আছে এমন অনেক দেশেও সাংবাদিকদের ডিভাইসের ওপর কর্তৃপক্ষ কড়া নজর রাখছে। এসব নজরদারির মাধ্যমে সাংবাদিকদের অনুসন্ধান এবং প্রতিবেদন তৈরির কাজ মাঝপথেও থামানো হচ্ছে। এ ধরনের অবস্থা স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং মুক্ত গণমাধ্যমের জন্য ধীরে ধীরে উদ্বেগজনক হচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিজিটাল নজরদারির পাশাপাশি সাংবাদিকদের ডিজিটাল আক্রমণের কবলেও পড়তে হচ্ছে। বেশকিছু দেশে এমনভাবে ডিজিটাল আইন করা হয়েছে, যেখানে সাংবাদিকতার যে কোনো বিষয়বস্তুই ওই আইনে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ থাকছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকার, বেশকিছু ক্ষেত্রে প্রভাবশালী অপরাধী চক্র ভিন্নমতের কিংবা নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থের বিরুদ্ধে লেখালেখি করা সাংবাদিকদের ডিজিটাল মাধ্যমে নানা রকম বিভ্রান্তি ছড়িয়ে, মিথ্যা তথ্য দিয়ে চরিত্র হনন করা হচ্ছে। এই অবস্থাটা সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে পেশাগত দায়িত্ব পালনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থায় এ ধরনের ডিজিটাল আক্রমণ অনেক বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। একাধিক দেশে সরকারের বিরুদ্ধে মতপ্রকাশের পর সেই পোর্টাল বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাও আছে। সাইবার অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে রিপোর্টের পর সাইবার হামলা চালিয়ে পুরো সংবাদপত্র অফিসের সার্ভার ব্যবস্থা জিম্মি করার উদাহরণও আছে।

ডিজিটাল আগ্রাসন সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে- এই আগ্রাসন খুব বড় মাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব রাখছে প্রচলিত সংবাদমাধ্যমগুলোর রাজস্বের ক্ষেত্রে। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রামের মতো ডিজিটাল সামাজিক মাধ্যম সংবাদপত্র ও সম্প্রচার মাধ্যমের বিজ্ঞাপনের বাজার দখল করে নিয়েছে। এর ফলে সংবাদপত্র ও সম্প্রচার মাধ্যম রাজস্ব হারিয়ে অনেক ক্ষেত্রে রুগ্‌ণ শিল্পে পরিণত হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে রয়েছে। আবার ডিজিটাল সামাজিক মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে নিজেদের প্রতিবেদনকে জনপ্রিয় করার কাজটিও করতে হচ্ছে অনেক সংবাদমাধ্যমকে। এর বিপরীতে সামাজিক মাধ্যমের জটিল নীতির মধ্যে পড়ে কোনো কোনো সংবাদমাধ্যম যে আয়ের সুযোগ পায়, তার পরিমাণও অত্যন্ত নগণ্য। এই প্রতিবেদনে সংবাদমাধ্যমের লিংক শেয়ারের ক্ষেত্রে রাজস্ব ভাগাভাগিতে অস্ট্রেলিয়ার নতুন আইনকে একটি প্রগতিশীল উদারহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

এই বাস্তবতার মধ্যে আমরাও আছি। একটা বিষয় স্পষ্ট, যতই নজরদারি, আক্রমণ, আগ্রাসন থাকুক না কেন; এখন পর্যন্ত বিশ্বস্ত তথ্যের নির্ভরযোগ্য মাধ্যম প্রচলিত সংবাদপত্র কিংবা সম্প্রচার মাধ্যম। কারণ সংবাদপত্র, সংবাদমাধ্যমকে একটি সুনির্দিষ্ট সম্পাদকীয় নীতিমালা এবং রাষ্ট্রীয় আইনের ভেতরে থেকেই পরিচালিত হতে হয়। অন্যদিকে সামাজিক মাধ্যম দায়দায়িত্বহীন। এর কোনো গেটকিপার নেই। যে যা খুশি লিখতে পারে। বরং এসব সামাজিক মাধ্যমে অসত্য তথ্য, গুজব ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং তা যে কোনো ব্যক্তি, জনজীবন, সমাজ, রাষ্ট্র, জাতিকে মুহূর্তেই বিপন্ন করে তুলতে পারে। প্রতিদিন হাজারে হাজারে মিথ্যা তথ্য, ফেক নিউজ, ঘৃণাবাক্য, সাইবার বুলিং ছড়ালেও সব ধরনের আইনের ঊর্ধ্বেই থেকে যাচ্ছে ফেসবুক-ইউটিউবের মতো মাধ্যম। কিন্তু প্রচলিত সংবাদপত্র ও সম্প্রচার মাধ্যম ছোট্ট ভুল করলেও সাংবাদিক এবং কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহী বা ভুল স্বীকার করতে হয়; খবর প্রত্যাহার করতে হয়। কখনও কখনও আইনের আওতায়ও যেতে হয়।

এ কারণেই এখন প্রচলিত সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সরকার-সংবাদমাধ্যম কর্তৃপক্ষ এবং নাগরিক সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগই পারে বিপর্যয়কর পরিস্থিতি রুখতে। দেশে দেশে সরকারকে কঠোর আইন করে ফেসবুক-গুগলের মতো প্ল্যাটফর্মের ব্যবসায়িক আগ্রাসন, ভুয়া তথ্যের আগ্রাসন বন্ধ করতে হবে। অস্ট্রেলিয়ার মতো আইন করে ফেসবুকের মতো প্রতিষ্ঠানকে দায়বদ্ধ করতে হবে।

সংবাদমাধ্যম কর্তৃপক্ষকে ডিজিটাল মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করার জন্য বিনিয়োগ করতে হবে। ডিজিটাল মাধ্যম থেকে আয়ের পথ বাড়াতে হবে।

আর নাগরিক সমাজকে আগ্রাসী ডিজিটাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ হতে হবে। এগুলোর বিপজ্জনক সাইবার অপরাধ বিস্তৃত করার বিষয়ে এবং প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের নির্ভরযোগ্য তথ্য বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হবে। না হলে প্রচলিত দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যম দায়িত্বহীন তথাকথিত সামাজিক মাধ্যমের কাছে পরাজিত হতেই থাকবে।

রাশেদ মেহেদী: সাংবাদিক