কান চলচ্চিত্র উৎসবের ৭৫তম আসরের তৃতীয় দিনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনীনির্ভর চলচ্চিত্র 'মুজিব :দ্য মেকিং অব অ্যা নেশন'-এর ট্রেলারের প্রিমিয়ার প্রদর্শিত হয়েছে। এর পরিচালক শ্যাম বেনেগাল আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নির্মাতা। এর আগে তিনি ভারতের মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীকে নিয়ে ১৯৯৬ সালে নির্মাণ করেছিলেন 'দ্যা মেকিং অব দ্য মহাত্মা'। ২০০৫ সালে নির্মাণ করেন 'নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস :দ্য ফরগটেন হিরো'। চলচ্চিত্র তথা সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন পদ্মশ্রী (১৯৭৬), পদ্মভূষণ (১৯৯১), দাদাসাহেব ফালকে (২০০৫) এবং এএনআর ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড (২০১৩)।

একদিকে বঙ্গবন্ধুর ওপর একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের জন্য অপেক্ষা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একজন ভারতীয় নির্মাতার পারফরম্যান্স দেখার আগ্রহ; সব মিলিয়ে চলচ্চিত্র নিয়ে বাঙালির মধ্যে একটা উত্তেজনা কাজ করছিল। এ অবস্থায় 'মার্শে দ্যু ফিল্ম' নামে বিশ্ব চলচ্চিত্রের ব্যস্ততম বাণিজ্যিক শাখায় ভারতীয় প্যাভিলিয়নে উন্মোচিত ট্রেলারটি দেখে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে জনমনে। মনে রাখতে হবে, জাতির পিতার প্রতি মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রমাণ এসব প্রতিক্রিয়া।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনী এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রের অভাব নিয়ে একটা জাতীয় হাহাকার বিদ্যমান ছিল। অবশেষে মুজিববর্ষে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এই বাঙালির ওপর কয়েকটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। ইতোমধ্যে মুক্তি পেয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ছোট বোন রেহানা নিবেদিত চলচ্চিত্র 'চিরঞ্জীব মুজিব'। প্রধানমন্ত্রীর স্পিচ রাইটার মো. নজরুল ইসলাম এই চলচ্চিত্রের নির্দেশক এবং নির্মাতা জুয়েল মাহমুদ এর সৃজনশীল পরিচালক। বঙ্গবন্ধুর জীবনীভিত্তিক আরেকটি চলচ্চিত্র 'টুঙ্গিপাড়ার মিয়া ভাই' আমরা টেলিভিশনে দেখেছি।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এর আগেও চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রয়াস দেখা গেছে। ২০০৭ সালে স্বলিখিত রাজনৈতিক উপন্যাস 'পলাশী থেকে ধানমন্ডি' অবলম্বনে টিভি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন সদ্য প্রয়াত লেখক ও কলামিস্ট আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী। এতে বঙ্গবন্ধু চরিত্রে নেওয়া হয়েছিল পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। ভিএফএক্স বা স্পেশাল ইফেক্ট-জাতীয় প্রাযুক্তিক বাহাদুরির মানদণ্ডে আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী নির্মিত সিনেমাটি হয়তো চোখ ধাঁধিয়ে দেয় না; কিন্তু নামকরণ, কাহিনি ও সংলাপ দিয়ে এটি বাঙালির স্বাধীনতার শত বছরের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে বঙ্গবন্ধুর আজীবনের সংগ্রামকে সঠিকভাবে তুলে ধরতে পেরেছিল। ইউটিউবেও সুলভ এই চলচ্চিত্র যে কেউ দেখে নিতে পারেন।

উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক চরিত্রকে কীভাবে চলচ্চিত্রের মতো বড় পরিসরে ধরে রাখা যায়, সে নিয়ে আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর ভাবনা ছিল বহুমুখী। ২০০৫ সালে তিনি ভাবলেন, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটি নাটক বানাবেন। পরে চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লিখেছিলেন। লন্ডনের এক সাংবাদিকের পরামর্শে সেই চলচ্চিত্রের নাম দেন 'দ্য পোয়েট অব পলিটিক্স'। ১০০ কোটি টাকার একটা চিন্তা করে অমিতাভ বচ্চনকে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর চরিত্রায়ণের পরিকল্পনা ছিল এই গুণী মানুষের। পরে এক যুগ পার হয়ে গেলেও অর্থের অভাবে তিনি এই অসাধারণ পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করতে পারেননি।


যা হোক, শ্যাম বেনেগালের 'মুজিব :দ্য মেকিং অব অ্যা নেশন' শীর্ষক চলচ্চিত্রের ট্রেলার দেখে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় দেশের সাধারণ মানুষ থেকে বোদ্ধা সমাজ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। পুরো সিনেমা যেহেতু দেখা হয়নি; ট্রেলারে উপস্থাপিত 'বঙ্গবন্ধু' নিয়েই সবাই মূল্যায়ন করেছেন। খ্যাতনামা অভিনেতা শুভাশীষ ভৌমিক তাঁর টাইমলাইনে লিখেছেন, 'বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠ এমনই এক ইউনিক, যা কোটি কোটি মানুষের অতি পরিচিত এবং কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে গেঁথে আছে। দৃশ্যমান বঙ্গবন্ধুর চেয়ে শুধুমাত্র তাঁর কণ্ঠ যদি কেউ রপ্ত করতে পারেন, তিনিই পারেন কোনো চলচ্চিত্রে তাঁর চরিত্রে অভিনয়ের বিশ্বাসযোগ্যতা ফুটিয়ে তুলতে। মেকআপ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। সে ক্ষেত্রেও বিষয়টি বাস্তবের কাছাকাছি যায়নি। বঙ্গবন্ধুর চরিত্রে অভিনয়ের আগে তাঁর প্রাপ্তব্য ১৪৮টি অডিও ভাষণ আর অন্তত ৫০টি ভিডিও ক্লিপিং শোনা এবং দেখা উচিত। না হলে অভিনেতার প্রস্তুতি বলে যে কথাটা প্রচলিত, সেটা পরিপূর্ণ হবে না।'

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও যোগাযোগ বিভাগের শিক্ষক রাজীব নন্দী ফেসবুকে লিখেছেন- 'কোনো মহৎ ব্যক্তি বা অনুকরণীয় কারও বায়োপিক বানানো খুব বিপজ্জনক কাজ। ভক্ত এবং অনুসারীদের মধ্যে তিনি এমনভাবে বিরাজমান থাকেন যে, তুলনামূলক বিশ্নেষণে বায়োপিক প্রচেষ্টাটি বিনোদনে পরিণত হয়। বঙ্গবন্ধুর শারীরিক ও মানসিক উচ্চতা, ঋজুতা, কণ্ঠ, চাহনি এগুলো সেলুলয়েডের বিষয় না। এগুলো হৃদয়ের অন্তস্তলে গভীরভাবে দৃশ্য ধারণের ব্যাপার। শ্যাম বেনেগাল তাঁর ক্যারিয়ারের সম্ভবত সবচেয়ে বড় সুযোগকে বড় ব্যর্থতায় পরিণত করেছেন। বঙ্গবন্ধুর বায়োপিক করতে গিয়ে ট্রেলারেই জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানকে হাসাহাসির পাত্র বানানোর প্রকল্পে কারা লাভবান হলো?'

শ্যাম বেনেগালের মতো নির্মাতা নিজের নামের প্রতি সুবিচার করতে পেরেছেন কি? ট্রেলারে ৭ মার্চের ভাষণকে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু সঠিকভাবে তুলে ধরতে পেরেছেন কি? সাত মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধুর আশপাশে যাঁরা ছিলেন তাঁদের পোশাক, মাঠের দৃশ্য সঠিকভাবে এসেছে বলে মনে হচ্ছে না। ট্রেলারে ব্যবহূত বিমান হামলার দৃশ্য দেখাতে গিয়ে ভিএফএক্সের ব্যবহার নিম্নমানের হয়েছে বলে অনেকেই মন্তব্য করেছেন। ৭ মার্চের ভাষণে মাউথপিসের সামনে কলরেডী লেখা লোগোটা পর্যন্ত অনুপস্থিত। ৭ মার্চের ভাষণ প্রদানকালে বঙ্গবন্ধুর চোখে চশমা ছিল না। তিনি চশমা চোখে রেসকোর্সে এসেছিলেন, কিন্তু ভাষণ প্রদানকালে খুলে রেখেছিলেন। অথচ আমরা ট্রেলারে দেখেছি, 'বঙ্গবন্ধু' চশমা চোখে ভাষণ দিচ্ছেন!

চলচ্চিত্রটির ইংরেজি এবং বাংলা নামের মধ্যেও অসংগতি রয়েছে। বাংলায় বলা হচ্ছে- 'মুজিব :একটি জাতির রূপকার'। অন্যদিকে ইংরেজিতে বলা হচ্ছে 'মুজিব :দ্য মেকিং অব অ্যা নেশন'। দুটি নাম কি এক হলো? ট্রেলারের বাইরে সিনেমার একটা ক্লিপে স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেছা, বঙ্গবন্ধু আর শেখ মনির একটা দৃশ্য দেখলাম। কিন্তু কোথায় বঙ্গমাতা? কোথায় জাতির পিতা? বঙ্গমাতার চোখের যে গভীরতা, পান খেয়ে লাল মুখাবয়ব, লুঙ্গি পরিহিত বঙ্গবন্ধুর পাশে এক সাগর মায়া নিয়ে দণ্ডায়মান মুজিবের রেণুকে পেলাম না। পুরো সিনেমা রিলিজ হলে তখন আপনারা মিলিয়ে নেবেন।

৭ মার্চের ভাষণের বঙ্গবন্ধু আর ৫২-এর ভাষা আন্দোলনের বঙ্গবন্ধু একই! স্বাধীন বাংলাদেশেও একই বঙ্গবন্ধু? শ্যাম বেনেগাল বিদেশি লোক। তাঁকে তো আমরা দোষ দিতে পারব না। এই পুরো প্রকল্পের যাঁরা বাংলাদেশি তত্ত্বাবধায়ক, তাঁদের অবশ্যই আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।

শেখ আদনান ফাহাদ: সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়