'মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস তদন্তে' বেসরকারিভাবে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের গঠিত গণকমিশনের শ্বেতপত্র নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে, বিতর্ক চলছে। গত ১১ মে দুর্নীতি দমন কমিশন ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে এই শ্বেতপত্র দাখিল করা হয়। শ্বেতপত্রে ১১৬ জন ধর্ম ব্যবসায়ী ও হেফাজতের ঘাঁটি হিসেবে এক হাজার মাদ্রাসার নাম তুলে ধরা হয়েছে।

২০ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, 'গণকমিশনের ভিত্তি নেই। গণকমিশনের নামে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'

এমন প্রেক্ষাপটে সমকাল উক্ত গণকমিশনের চেয়ারম্যান আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের সঙ্গে আলাপ করলে তিনি বলেন, পৃথিবীর বহু দেশে বিভিন্ন ইস্যুতে এ ধরনের গণকমিশন গঠন হয়েছে। দেশেও ১৯৯২ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের বিচারে গণকমিশন হয়েছিল, গণ আদালত গঠন করে যুদ্ধাপরাধীদের প্রতীকী ফাঁসির রায় হয়েছিল। তখন এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠেনি। এখন আমরা সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী, জঙ্গি এবং ধর্ম ব্যবসায়ীদের বিষয়ে প্রতিবেদন দিয়েছি, সরকার চাইলে তা গ্রহণ করবে। নয়তো জনগণই তা মূল্যয়ন করবে।

বিচারপতি মানিকের সঙ্গে সমকালের কথোপকথন :

সমকাল :গণকমিশনের ভিত্তি কী?

বিচারপতি মানিক :স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি বক্তব্য পত্রপত্রিকায় দেখেছি। তিনি যদি বলে থাকেন গণকমিশন আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত নয়, তাহলে ঠিক আছে। আমরাও সেটা দাবি করছি না। কিন্তু এই গণকমিশন গঠনে আমাদের ভিত্তি রয়েছে, জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী ধর্মান্ধদের বিষয়ে আমরা তদন্ত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছি। তাই গণকমিশন গঠনের ভিত্তি এবং প্রতিবেদন প্রকাশের অধিকার দুটোই আমাদের রয়েছে।

সমকাল :দেশে-বিদেশে বেসরকারি উদ্যোগে আর কখনও গণকমিশন গঠিত হয়েছে কিনা।

বিচারপতি মানিক :সারা পৃথিবীতে এ ধরনের গণকমিশন অনেক হয়েছে। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানে হিরোশিমা ও নাগাসিকিতে পারমাণবিক বোমা বিস্ম্ফোরণের পর সেখানে গণকমিশন হয়েছিল, সেখানে বার্ট্রান্ড রাসেলের মতো দার্শনিক ও পারমাণবিক বোমা তৈরির স্রষ্টা আইনস্টাইন ছিলেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর লর্ড বার্ট্রান্ড রাসেলের নেতৃত্বে যুক্তরাজ্যে গণকমিশন হয়েছিল। আমাদের দেশেও বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর শোন ব্যাড ব্রাইটেনের নেতৃত্বে গণকমিশন হয়েছিল ইংল্যান্ডে। এগুলোকে কেউ কখনও কোনো দিন ভিত্তিহীন বা বেআইনি বলেনি। যদি বেআইনি হয় তাহলে কেন আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়নি? এগুলো মোটেই বেআইনি নয়। এবার আমরা দেশে যেসব গণকমিশন হয়েছিল, সেগুলোর দিকে তাকাই। আমাদের দেশেও অনেক গণকমিশন বিভিন্ন সময়ে হয়েছে। গোলাম আযমসহ কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ১৯৯২ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গণকমিশন হয়েছিল, গণ আদালতে তাদের প্রতীকী বিচারের রায়ে ফাঁসি হয়েছিল। আমরা মনে করি, তার ফলেই জনমত গঠনের পর ২০০৯ সালে মুক্তিযুদ্ধের সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেছিল, যেটি এখনও অব্যাহত। একইভাবে ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট যখন দেশব্যাপী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ে ওপর অকথ্য নির্যাতন চালিয়েছিল, সেটি নিয়েও কিন্তু পরে গণকমিশন গঠিত হয়েছিল, অনেক বিচারক, সিনিয়র আইনজীবী তাতে ছিলেন। যার চূড়ান্ত ধারাবাহিকতায় সাবেক জেলা জজ শাহাবুদ্দিন চপ্‌পুর নেতৃত্বে সরকারের উদ্যোগে কমিশন হয়েছিল। পরে তিনি তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছিলেন। পরে এর ভিত্তিতে কয়েকটি মামলাও দায়ের করা হয়েছিল। এসব নিয়ে তো কখনও প্রশ্ন ওঠেনি। তাহলে এখন কেন এই প্রশ্ন উঠছে? এখনও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে গণকমিশন হচ্ছে। এসব কমিশনের আইনগত ভিত্তি নেই এটি সত্য, কিন্তু নৈতিক ভিত্তি অবশ্যই রয়েছে। জনগণ গ্রহণ করছে, তাদের সপোর্ট রয়েছে। আমরাও সে কাজটাই করছি, জনগণকে প্রকৃত সত্য জানিয়ে দিচ্ছি। এখন কেউ যদি বলে গণকমিশন বেআইনি তাহলে তাকেই এটা প্রমাণ করতে হবে। গণকমিশন মোটেই অবৈধ নয়।

সমকাল :স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, 'গণকমিশনের নামে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে'- এ বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন? কোনো চাপ অনুভব করেন কিনা?

বিচারপতি মানিক :স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে সাধুবাদ জানাই। কারণ গণকমিশনের প্রতিবেদন নিয়ে একটি মহল বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। আমরা চাই, যারা এগুলো করতে চেষ্টা করছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সরকার তাদের বিরুদ্ধে কঠোরতা অবলম্বন করেনি। এই যে ওয়াজ ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে অপরাধ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আর চাপ সব সময়ই থাকে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময়ও ছিল। এগুলো আমার কাজ বিচ্যুত করতে পারবে না।

সমকাল :গণকমিশন দুটি খণ্ডে প্রায় ২২শ পৃষ্ঠার শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছে।

বিচারপতি মানিক :জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করতে এই গণকমিশন গঠন করা হয়েছে। বিশেষ করে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা নানাভাবে সাম্প্রদায়িকতার শিকার হয়েছেন। এজন্য গণকমিশন গঠন করে সমস্যার মূলে কারা কী জন্য করছে, এটি কীভাবে বিস্তৃত হয়েছে, তা তদন্ত করেছে। আমরা তদন্ত করতে গিয়ে দেখেছি, কিছু ঘটনায় সাবেক ও বর্তমান সরকারি কর্মকর্তা জড়িত রয়েছেন বা তাঁদের ইন্ধন ছিল। একজন বিচারকের নামও আমরা প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছি। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তদন্ত করতে গিয়ে দেখেছি, জামায়াতি ধর্মান্ধরা সেখানে রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী কাজে ব্যবহার করছে, ইন্ধন দিচ্ছে। আমরা সেগুলো প্রতিবেদনে তুলে ধরেছি। আমরা চাই, সরকার আইন দ্বারা এসব বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করুক।
সমকাল :আপনাদের গণকমিশনে বিতর্কিত ব্যক্তি রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিচারপতি মানিক :আমি একটি রায়ে বলেছিলাম, জিয়াউর রহমান ঠান্ডা মাথার খুনি। আমি যুদ্ধাপরাধ মামলায় অনেকের ফাঁসির রায় দিয়েছি। এগুলো কেউ কেউ গ্রহণ করতে পারেননি। তাঁরা আমাকে বিতর্কিত করতে চান। আমার স্পষ্ট বক্তব্য হলো, গণকমিশনে যাঁরা কাজ করেছেন তাঁরা কেউ বিতর্কিত নন। তাঁদের কাজকে দেখতে হবে। আমরা সবাই গণমুখী কাজ করেছি।

সমকাল :কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক মহলও প্রশ্ন তুলেছে।
বিচারপতি মানিক :দেখুন একটি গোষ্ঠীর মূল ব্যবসা অর্থাৎ ওয়াজের নামে টাকা নেওয়ার যে বিষয়টি সেটা নিয়ে আমরা প্রশ্ন তুলেছি, এটি তাদের গাত্রদাহের কারণ। কেউ কেউ হেলিকপ্টারে করে টাকা নিয়ে ওয়াজে যেতেন, এর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। এর চেয়ে সহজ ব্যবসা আর নেই। সেই জন্য তারা জোটবদ্ধ হয়েছে। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতেও তাদের এই ব্যবসা অবৈধ। কারণ ইসলাম ধর্মের মর্মবাণী হচ্ছে- ওয়াজের নামে কারও কাছ থেকে টাকা নেওয়া যাবে না। কেউ যদি দেয় সেটা দিতে পারে। কিন্তু ওয়াজের জন্য এক লাখ টাকা, ৭০ হাজার টাকা, নানা চুক্তি এগুলো অবৈধ। আমাদের আইনেও এভাবে টাকা নেওয়া অবৈধ।

সমকাল :দুর্নীতি দমন কমিশন ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করার উদ্দেশ্য কী? আপনারা তাদের কাছে কী প্রত্যাশা করেন?

বিচারপতি মানিক :দুদকের কাছে যে কেউ প্রতিবেদন দিতে পারে। তারাও এরই মধ্যে ৫০ জন ধর্ম ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে। আমরা এখানে বলতে চাই, ধর্ম ব্যবসায়ীরা অর্থ পাচারে জড়িত। অর্থ পাচার আইনটি দেখতে হবে। ধর্ম ব্যবসায়ীরা যে আয়কর না দিয়ে, কোনো ঘোষণা না দিয়ে ওয়াজের নামে দেশ-বিদেশ থেকে টাকা নিচ্ছে, এটাও কিন্তু অর্থ পাচার আইনের আওতায় পড়ে। এখানেই মূলত ধর্ম ব্যবসায়ীদের আঘাত করেছে। কারণ আমাদের তদন্তের ফলে তাদের এই ব্যবসার মুখোশ উন্মোচন হয়ে গেছে। দুদকের তদন্ত শুরু হয়েছে। এসবের কারণে তারা আস্ম্ফালন দেখাচ্ছে।

সমকাল :আপনাকে ধন্যবাদ।

বিচারপতি মানিক :আপনাকেও অসংখ্য ধন্যবাদ।

বিষয় : সাক্ষাৎকার: শামসুদ্দিন মানিক

মন্তব্য করুন