দলবদল নিয়ে এক বছরের একটা ধারাবাহিক নাটক। মূল চরিত্র কিলিয়ান এমবাপ্পে। প্রতিদিন নতুন পর্ব এবং নতুন মোড়। শেষ পর্যন্ত ওই নাটকে যবনিকা পড়েছে। এমবাপ্পে রিয়াল মাদ্রিদের সঙ্গে ‌'ছলনা' করে পিএসজি থেকে গেছেন। চুক্তি নবায়নের পরে স্প্যানিশ প্রচার মাধ্যম মার্কাকে এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন ফ্রান্সম্যান। তার সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো:

প্রশ্ন: পাঁচ বছর আগে বলেছিলেন, আপনি একটা ধারাবাহিক নাটকের অংশ। নাটকটা এখন কেমন চলছে, যা নিয়ে ফ্রান্স প্রেসিডেন্টও আপনার সঙ্গে কথা বললেন? 

এমবাপ্পে: এটা সত্যিই বিশেষ কিছু। আমি কখনও ভাবিনি, আমার নতুন চুক্তি নিয়ে তার মতো কারো সঙ্গে কথা হবে। তার সঙ্গে কথা বলা আমার জন্য খুবই উল্লেখযোগ্য ঘটনা এবং চুক্তি নিয়ে অন্য যাদের সঙ্গে কথা হয়েছে সেটাও। তবে দিন শেষে এটা আমারই সিদ্ধান্ত। অন্যরা কেবল ভালো কিছু পরামর্শ দিয়েছেন।

আমি কেবল ভালো দিকগুলোই বলতে পারি...তবে এটা আমার নিজস্ব সিদ্ধান্ত। আমি পূর্বে কী করেছি এবং কী হতে চাই, এটা নিয়ে অনেক ভেবেছি। শেষ পর্যন্ত আমি দেশে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কারণ আমি ফ্রান্সের একজন। সেজন্য পিএসজিতে নতুন যুগ, নতুন প্রজেক্টের অংশ হতে চেয়েছি। আমি মনে করি, এটা ভালো একটা সিদ্ধান্ত হয়েছে, কারণ সিদ্ধান্তটা আমিই নিয়েছি।

প্রশ্ন: চুক্তির মেয়াদ নিয়ে অনেক কথা শোনা যাচ্ছে, আপনি নাকি দুই বছরের জন্য চুক্তি করেছেন বা এক বছরের চুক্তির সঙ্গে এক বছর ঐচ্ছিক (অপশনাল) চুক্তির শর্ত আছে। বিশ্বকাপের পরে পিএসজি ছাড়বেন এমন কোন শর্ত আছে নাকি? 

এমবাপ্পে: স্পেনে চুক্তিপত্রে এসব শর্ত থাকে, ফ্রান্সে থাকে না। এই মুহূর্তে আমার ভাবনা নতুন চুক্তি এবং আগামী মৌসুমে। অন্য কিছু নিয়ে আমি ভাবতে চাই না, কারণ বড় খেলোয়াড় হতে হলে সকলকে আপনার সম্মান করতে হবে এবং আমি আমার ক্লাব পিএসজিকে সম্মান করি। এখন আমি পুরোপুরি পিএসজির। 

হ্যা, আমি লিভারপুলের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। কারণ আমার মায়ের লাল খুব পছন্দ। তিনি লিভারপুলের ভক্ত। কেন? সেটা আমার মাকে জিজ্ঞেস করতে হবে। মোনাকে থাকতে তাদের সঙ্গে দেখা করেছিলাম। অসাধারণ এক ক্লাব। শেষে তাদের সঙ্গে সামান্য, খুব সামন্যই কথা হয়েছে। সিদ্ধান্তটা দাঁড়িয়েছিল রিয়াল মাদ্রিদ ও পিএসজি'র মধ্যে।

সকলেই জানে যে, গত বছর আমি রিয়ালে যেতে চেয়েছিলাম। আমার গত বছর মনে হয়েছিল, পিএসজি ছাড়ার জন্য ভালো সিদ্ধান্ত হবে। তবে এখন বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারণ আমি ফ্রান্সের লোক এবং দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যখন আপনি দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তখন শুধু নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে নয় জীবন নিয়েও ভাবতে হবে। 

ক্যারিয়ার শেষে আমি ফ্রান্সে থাকবো, আমার পরিবার, বন্ধুদের সঙ্গেই থাকতে হবে। আমি এখন যেটা করতে পারি, রিয়াল ভক্তদের ধন্যবাদ দিতে পারি। তাদের হয়ে আমি কখনও খেলেনি। ১৪ বছর বয়সে এক সপ্তাহের একটা ক্যাম্প করেছিলাম, তারপরও তারা যে ভালোবাসা আমার প্রতি দেখিয়েছে, তা অসাধারণ। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে আমার পক্ষ থেকে রিয়ালের জন্য শুভ কামনা।

প্রশ্ন: একদিন রিয়ালে খেলার ওই স্বপ্ন এখনও কি দেখেন? 

এমবাপ্পে: দু'দিন আগে নতুন চুক্তি করার পরে যদি বলি আমার রিয়ালে খেলা এখনও স্বপ্ন তাহলে ক্লাবকে অসম্মান করা হয়। 

প্রশ্ন: খেলবেন নাকি খেলবেন না সেটা আমার প্রশ্ন নয়, আমি জানতে চেয়েছি স্বপ্নটা এখনও আছে কিনা?

এমবাপ্পে: স্বপ্নটা আগের জায়গাতে আছে। তবে এখন আমার মনোযোগ নতুন চুক্তিতে এবং বর্তমানে। ভবিষ্যতে কী ঘটতে যাচ্ছে আপনি বলতে পারবেন না। আমি এখানে তিন বছরের জন্য চুক্তি করেছি এবং আমার মনোযোগ নতুন মৌসুমে। 

প্রশ্ন: আপনার বাবা নাকি আপনাকে বলতেন, সবসময় নিজের মধ্যে থাকো। সুপারস্টার হওয়ার পরে বিষয়টি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন?

এমবাপ্পে: এর মধ্যে বিভিন্ন বিষয় আছে। সুপারস্টার হয়েও আপনি নিজেতে থাকতে পারেন। এটাই আমি। আমি মানুষটা আমার জন্য এবং রিলাক্সড। আমি জানি, বিখ্যাত হওয়ার পরে মাঝে মধ্যে আমাকে ফুটবল, ব্যবসার খাতিরে অনেক কিছু করতে হয়। কিন্তু বাড়ি ফিরলে আমি সাধারণ একটা মানুষ, আমি কিলিয়ান। পরিবার নিয়ে আমি ঘুরতে বের হই, অবসর উপভোগ করি, পরিবারের যত্ন নিই, আপনাদের মতোই। বাইরে বের হলে হয়তো ওই সাধারণ লোকটা আমি আর থাকি না। 

প্রশ্ন: ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ (রিয়াল প্রেসিডেন্ট) আপনার জন্য নাকি একটা রিয়াল মাদ্রিদের জার্সি পাঠিয়েছিলেন। ওটার এখন কী হবে? 

এমবাপ্পে: কিছুই হবে না। কারণ উনি আমাকে কোন জার্সি দেননি। 

প্রশ্ন: সম্প্রতি আপনি মাদ্রিদে গিয়েছিলেন, ওই ভ্রমণে যাওয়া ভুল হয়েছে বলে মনে করেন কি? 

এমবাপ্পে: ওটা কোন ভুল নয়। আমি মাদ্রিদে গিয়েছিলাম কারণ বন্ধু আশরাফ (হাকিমি) তার সঙ্গী হওয়ার অনুরোধ করেছিল। সামনে হয়তো আবার যাবো।আমাকে নিয়ে গুঞ্জন বাড়ুক, সকলে কথা বলুক সেজন্য আমি যাইনি। প্রাইভেট জেটে আশরাফের সঙ্গে গিয়েছিলাম, ভাড়াও সেই দিয়েছিল। যাতে আমার পরিচয় গোপন থাকে। কিন্তু রেস্টুরেন্টে যাওয়ার পর কেউ দেখে ফেলে এবং ফাঁস করে দেয়। এমনটা হোক আমরা চাইনি।

প্রশ্ন: টাকার জন্য প্যারিসে থেকে গেছেন, এই অভিযোগ নিয়ে কী বলবেন?

এমবাপ্পে: আমি কিছুটা হতাশ, যখন ফুটবল খেলা শুরু করি, তখনই আমি দেখিয়েছি যে, আমি শুধু খেলতে চাই। আমি সবসময় ফুটবল, শিরোপা, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ নিয়ে কথা বলেছি। অর্থ নিয়ে কখনও কোন কথা বলিনি। মানুষ যা খুশি ভাবতে পারে, বলতে পারে। তবে সকলেই তো আমাকে চেনে-জানে। 

আমি রিয়াল বোর্ডের অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি। পিএসজির সঙ্গেও কথা বলেছি। আমার পেরেজের সঙ্গে যেমন কথা হয়েছে, নাসের আল খেলাইফর সঙ্গেও কথা হয়েছে এবং তারা জানে যে, অর্থ-কড়ির কথা আমি মুখেও আনিনি। হ্যা, আমার আইনজীবী, আমার মা টাকা-পয়সা নিয়ে টুকটাক কথা-বার্তা বলেছেন, কিন্তু আমি কিছুই বলিনি। 

অর্থ আমার একাউন্টে যাবে, কতো ঢুকলো তা আমি দেখবো, খরচ করবো। কিন্তু এসব নিয়ে সত্যিই আমি কিছু ভাবি না। আমি এখানে আছি শিরোপা জিততে, বিশ্ব সেরা হতে ও খুশি থাকতে। এখন আমি অনেক আনন্দেই আছি।  

প্রশ্ন: চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতা কি আপনার অবসেশন, নাকি শুধুই গোল করতে চান?

এমবাপ্পে: এটা সবসময় আমার একটা অবসেশন। এমন নয় যে জিততে পারিনি বলে এমন আবেশিত। এখানে আপনাকে হারের ভয় করলে হবে না এবং আমি ভীত না। হয়তো সামনের মৌসুমেও আমি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতবো না, তারপরও এটার প্রতি অবসেশন থাকবে। 

আমি বিশ্বকাপ জিতেছি, এই বছর দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জিততে চাইবো। তারপরও আমি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিততে চাইবো। আমি প্রতিবছরই চেষ্টা করবো। আগামী মৌসুমেও চেষ্টা করবো। এটাই আমি। 

প্রশ্ন: করিম বেনজেমা ইনস্টাগ্রামে (বিশ্বাসঘাতক অ্যাখ্যা দিয়ে) পোস্ট দিলেন। তাকে নিয়ে কি বলবেন?

এমবাপ্পে: ইয়াহ, ইয়াহ, দেখলাম রিয়াল মাদ্রিদের অনেকই অনেক কিছু পোস্ট করেছেন। আমার আসলে কিছু বলার নেই, এমন অনেক কিছুই আসলে ঘটে যায়। হ্যা, ফ্রান্স জাতীয় দলে যখন যাবো করিমের সঙ্গে কথা বলবো, তাকে বোঝাবো কেন আমি পিএসজি থেকে গেলাম। তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক খুবই ভালো। 

প্রশ্ন: আপনি বলেছেন, সেরা হতে চান। সেরা হতে আসলে কী লাগে? 

এমবাপ্পে: সেরা হতে আপনাকে ইতিহাস লিখতে হবে। স্বতন্ত্র পুরস্কার জিততে হবে, অনেকগুলো শিরোপা জিততে হবে। শুধু শিরোপা নয় মানুষের মন ও আবেগ জিততে হবে, উপভোগ্য ফুটবল খেলতে হবে। কারণ ফুটবল মানে শুধু গোল করা, ব্যালন ডি' অর কিংবা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতা নয়। মাঠ এবং মাঠের বাইরে অনেক কিছু থাকে। যেমন, শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং সেটা বৈশ্বিক পর্যায়ে।