২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট সংসদে উপস্থাপন করা হবে জুন মাসের কোনো একদিন। বাজেট জাতীয় জীবনের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল। সাধারণত সংসদে এই দলিলটি পেশ করেন অর্থমন্ত্রী। গত কয়েক বছর থেকে দেখছি বাজেট পেশের আগেই বাজেট নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে যায়। এ আলোচনায় অংশীজনরা অংশগ্রহণ করেন। প্রত্যেক অংশীজনের উদ্দেশ্য হলো বাজেটকে নিজ স্বার্থের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করা। বাংলাদেশে অংশীজনদের মধ্যে তৈরি পোশাক খাত বাজেট নিয়ে সরব ভূমিকা রাখে। শুধু তৈরি পোশাক খাত নয়; অন্যান্য শিল্প মালিকগোষ্ঠী তাঁদের স্বার্থের প্রতিফলন দেখতে চান বাজেটে। মোদ্দা কথা, বাজেট সম্পর্কে মতপ্রকাশে পোশাক খাতসহ বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠী তাঁদের স্বার্থসংশ্নিষ্ট বিষয় নানা মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। এই অনুশীলনে পুরোপুরি সফল না হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাজেটকে তাঁদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করতে তাঁরা সফল হন।
বাংলাদেশের কৃষক জনসংখ্যার একটি বড় অংশ। এই কৃষকরা গোটা জাতির জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিদিন উদয়াস্ত পরিশ্রম করেন। বাংলাদেশের কৃষি বর্তমানে বহুমুখী হয়ে উঠেছে। কৃষকরা শুধু খাদ্যশস্য যেমন ধান ও গমই উৎপাদন করেন না; শাক-সবজি, নানা রকমের ফল, মৎস্য এবং গবাদিপশু পালনেও জড়িয়ে আছেন। বাংলাদেশের মতো একটি দেশ যেটি অত্যন্ত জনঘন সে রকম একটি দেশে ভূমি এবং মানুষের অনুপাত অত্যন্ত সুবিধাহীন। এদেশের কৃষকদের একটি বড় অংশ ক্ষুদ্র কৃষক। তাঁরা মাত্র দশমিক ৫ শতাংশ বা তারও কম পরিমাণ জমির ওপর ভিত্তি করে জীবনযাত্রা নির্বাহ করে যাচ্ছেন। হাল আমলে প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাঁরা ক্ষুদ্র ভূমিখণ্ড থেকে অকল্পনীয় উৎপাদনে সফল হচ্ছেন। কৃষককে বৈরী প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করতে হয়। তাঁদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। প্রায়ই পাকা ফসলে কীটপতঙ্গের আক্রমণ ঘটে। প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াইয়ে এই সাহসী কৃষকরা পিছপা হন না।
অতীব দুর্ভাগ্যের বিষয়, এসব কৃষক, যাঁরা আমাদের অন্নের জোগান দেন তাঁদের স্বার্থের কথা আমরা ভাবতে চাই না। কৃষকদের মধ্যে তাঁদের নিজস্ব সংগঠন নেই বললেই চলে। পাকিস্তান আমলে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে কৃষক সমিতি গড়ে উঠেছিল। আজ সেই কৃষক সমিতির তেমন কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় না। কিছু বাম সংগঠন কৃষক সমিতি গড়ে তোলায় ব্রতী হলেও সাফল্য খুবই সামান্য। বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অঙ্গ সংগঠন হিসেবে কৃষক সংগঠনও আমরা দেখতে পাই। কিন্তু এসব সংগঠন কৃষকদের নিয়ে সামান্যই ভাবে। কৃষক সংগঠন রাখার উদ্দেশ্য হলো ভোটের রাজনীতিতে ব্যবহার।
মূল কথা হলো, বাংলাদেশের কৃষকরা এখন মারাত্মকভাবে অসংগতিতে। তাঁরা তাঁদের কণ্ঠস্বর শ্রুত হতে কোনো মাধ্যমে খুঁজে পান না। অথচ এমন বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজন ছিল বিশাল একটি সংগঠন। এ ক্ষেত্রেও সমস্যা আছে। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের পতাকার নিচে পৃথক সংগঠন গড়ে তোলার কথা বলছে। এর ফলে কৃষকদের মধ্যেও বিভক্তির সৃষ্টি হবে। কাজের কাজ কিছু হবে না। কৃষক তাঁর ফসলের ন্যায্যমূল্য পান না। কৃষক উৎপাদন উপকরণ কিনতে গিয়ে নানা ধরনের অপকর্মের শিকার হন। এসব কারণে কৃষকদের কণ্ঠস্বর দেশবাসীর কাছে জোরালোভাবে তুলে ধরতে প্রয়োজন একটি কৃষক সংগঠন এবং কৃষকদের একটি শক্তিশালী লবি। মাত্র কয়েক মাস হলো ভারতের পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও হিমাচল প্রদেশের কৃষকরা মহাসড়ক রুদ্ধ করে দিয়েছিলেন। এক পর্যায়ে কৃষকরা তাঁদের দাবি আদায়ে সক্ষম হন। এই আন্দোলন সূচিত হয়েছিল কৃষি ও কৃষকসংক্রান্ত আইন পাস নিয়ে।
পাকিস্তান আমলে অর্থনীতি শাস্ত্রের ক্লাস করতে গিয়ে ড. আবু মাহমুদের কাছ থেকে শুনেছিলাম, 'বাজেট ইজ অ্যান ইনস্ট্রুমেন্ট অব ক্লাস এক্সপ্লয়টেশন'। তাঁর এ বক্তব্য কোনো ভিত্তিহীন রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর ছিল না। রাষ্ট্রক্ষমতায় যে শ্রেণি থাকে, সেই শ্রেণি তাদের স্বার্থে রাষ্ট্রীয় নীতি ও আইনকানুন রচনা করে। পাকিস্তান আমলে যে বৃহৎ ২২ পরিবার তৈরি হয়েছিল, তাতে ওম দিয়েছিল পাকিস্তান সরকারের বাজেটগুলো। আমদানি-রপ্তানিনীতি এবং দেশে আমদানি করা পণ্যের শুল্ক্কহার নির্ধারণপূর্বক অত্যন্ত কৌশলে ২২ পরিবারের শোষণ এবং পুঁজির কেন্দ্রীভবন সৃষ্টিতে সহায়তা করেছিল তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের বাজেট। এ ব্যাপারে আইয়ুব খানের অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ শোয়েব খুবই সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন।
বাংলাদেশে যে বাজেট পাস করা হয় তা কীভাবে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করে এবং দরিদ্র মানুষের ওপর ধনীদের শোষণ কীভাবে জারি থাকে, তা কোনো অর্থনীতিবিদ তুলে ধরেছেন কিনা আমার জানা নেই। বাংলাদেশে এখন যে ভয়াবহ অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে তার পেছনে বাজেটসহ বিভিন্ন সরকারি নীতি-কৌশল কীভাবে কাজ করছে সে সম্পর্কে কোনো গবেষণা হচ্ছে না। তাহলে কি বলতে হবে, পাশ্চাত্যের উচ্চশিক্ষা অর্জনকারী আমাদের অর্থনীতিবিদরা এই ধনিক গোষ্ঠীর সঙ্গে কি একটা বন্ধনে আটকা পড়েছেন, যে কারণে গরিব মানুষদের স্বার্থসংশ্নিষ্ট বিষয়ে তাঁরা উল্লেখযোগ্য কোনো গবেষণা করেননি। ২০১৬ সালের আয় ও ব্যয় জরিপ থেকে জানা গেছে, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ গৃহস্থালির আয় সর্বনিম্ন ৫ শতাংশের আয়ের ১২৩ গুণ। বৈষম্যটি সামাজিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থি। এমনকি ধনিক শ্রেণিরও স্বার্থের অনুকূল নয়। যখন একটি দেশের আয় একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর আয়ের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয় তখন দেশের বাজারটি অত্যন্ত সংকুচিত হয়ে যায়। এর ফলে দেশীয় বাজারও সংকুচিত হয় এবং দেশীয় উদ্যোক্তাদের তাঁদের উৎপাদিত পণ্যের বাজারে সংকুচিত চাহিদা মোকাবিলা করতে হয়।
বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রধানত ভোগতাড়িত। যে কোনো কারণে ভোগের চাহিদা হ্রাস পেলে অর্থনীতির আকারও ছোট হয়ে যায়। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য সবচাইতে বড় বিপদ হলো মূল্যস্ম্ফীতি। সরকারি হিসাবে বর্তমানে মূল্যস্ম্ফীতির হার ৫ থেকে ৬ শতাংশ। অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ এই হিসাবের সঙ্গে একমত হতে পারেননি। তাঁদের কাছে প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য হলো বাজারদর। একটি জাতীয় দৈনিকের শিরোনাম 'কষ্ট বাড়ছে গরিব ও মধ্যবিত্তের'। এখন শুধু বাংলাদেশেই নয়; মূল্যস্ম্ফীতিতে ভুগছে ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও নেপাল। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য মূল্যস্ম্ফীতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মূল্যস্ম্ফীতির নানা রকম প্রকরণ আছে। বাংলাদেশ রপ্তানির চাইতে বেশি আমদানি করে। ফলে চলতি হিসাবে বাংলাদেশ ঘাটতির মধ্যে রয়েছে। বিদেশে কোনো পণ্যের দাম বাড়লে সেই পণ্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে দেশে প্রবেশ করলে দেশের মূল্যস্তরের ওপর প্রভাব সৃষ্টি করে। এ রকম মূল্যস্ম্ফীতিকে বলা হয় আমদানীকৃত মূল্যস্ম্ফীতি।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, এই মুহূর্তে বাংলাদেশে মূল্যস্ম্ফীতির হার ডাবল ডিজিট। অর্থাৎ ১০-১২% হবে। দেখা যাচ্ছে, সরকারি প্রতিষ্ঠান পরিসংখ্যান ব্যুরোর সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সিপিডির কর্মকর্তাদের হিসাব-নিকাশ এবং অনুমানে পার্থক্য রয়েছে। মূল্যস্ম্ফীতি যে কোনো সরকারের জন্য মাথাব্যথার কারণ। মূল্যস্ম্ফীতির সঠিক হিসাব পাওয়া না গেলে মূল্যস্ম্ফীতি-বিরোধী নীতি-কৌশল প্রণয়ন করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে মূল্যস্ম্ফীতির একটি বড় কারণ, মেগা প্রকল্পে অর্থায়ন। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে কয়েকটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এসব মেগা প্রকল্প অবকাঠামো-নির্মাণকেন্দ্রিক। অবকাঠামোর বৈশিষ্ট্য হলো এগুলো নির্মাণে কয়েক বছর লেগে যায় এবং এগুলো থেকে রিটার্ন আসে ধীর গতিতে। অবকাঠামো নির্মাণকালে বাজারে অতিরিক্ত অর্থ প্রবেশ করে। নির্মাণকালে যেহেতু এগুলো কোনো কাজে ব্যবহার করা যায় না, যে কারণে বাজারে অর্থ প্রবেশ করলেও তার পাশাপাশি নতুন পণ্যসামগ্রী বাজারে প্রবেশ করে না। সেহেতু অর্থের প্রবাহ বাড়লেও পণ্যের প্রবাহ বাড়ে না। পরিস্থিতিটা হয়ে দাঁড়ায়, 'টু মাচ মানি চেজিং টু ফিউ গুডস।' একেই বলা হয় মূল্যস্ম্ফীতি। আসন্ন বাজেটে যেখানে মূল্যস্ম্ফীতির আশঙ্কা দেখা দেবে সেখানেই একে প্রতিরোধ করার জন্য ব্যবস্থা থাকতে হবে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেছেন, 'মূল্যস্ম্ফীতিতে বৈচিত্র্য এসেছে। আগের চেয়ে বেশিসংখ্যক পণ্যের দাম বাড়ছে। তাই জীবনযাত্রায় মূল্যস্ম্ফীতির প্রভাব বেশি টের পাওয়া যাচ্ছে।'
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমানে জার্মানিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোশাররাফ হোসাইন ভুঁইঞা তাঁর একটি নিবন্ধে জানিয়েছেন, '২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটের মোট পরিমাণ ৬ লাখ ৭৭ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা হতে পারে, যা চলতি বাজেটের তুলনায় ৭৪ হাজার ৩ কোটি টাকা বেশি। নতুন বাজেটের আকার হবে জিডিপির ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ। এবারের রাজস্ব আয়ে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআরের আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। মোট ঘাটতি দাঁড়ায় ২ লাখ ৪৪ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৫ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে রাখা হয়েছে। বিভিন্ন খাতে বরাদ্দের কোনো পূর্বাভাস না পেলেও অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বেশি বরাদ্দ থাকবে। এবারের বাজেট এমন এক সময় প্রণীত ও ঘোষিত হতে যাচ্ছে, যখন সারা বিশ্বের অর্থনীতিতে টালমাটাল অবস্থা বিরাজ করছে। রাশিয়া-ইউক্রেন দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফলে জ্বালানি ও খাদ্যসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের দেশগুলোসহ সারাবিশ্বে মূল্যস্ম্ফীতি দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ম্ফীতির হার এখন ৮ দশমিক ৩ শতাংশ; ইউরোপের দেশগুলোর গড় মূল্যস্ম্ফীতি ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। রাশিয়ার মূল্যস্ম্ফীতি আরও অনেক বেশি। মূল্যস্ম্ফীতি ছাড়াও কভিড-১৯ এর প্রভাব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উৎপাদন হ্রাস ও সরবরাহ চেইন বিপর্যস্ত হওয়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে যে সংকট দেখা দিয়েছে, ২০০৭-০৯ সালের অর্থনৈতিক মন্দার পর এমন সংকট আর দেখা যায়নি।'
মোশাররফ হোসাইন ভুঁইঞা দাবি করেছেন, বাজেটের ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশের মধ্যেই থাকবে। এই দাবি তখনই গ্রহণযোগ্য হবে যদি জিডিপি প্রাক্কলনের বিষয়টি নির্ভরযোগ্য হয়। যদি জিডিপির হিসাব অহেতুক বেশি করে দেখানো হয় তাহলে বাজেট ঘাটতির হার কমে যাবে। সে জন্য বাজেটকেদ্রিক সব ধরনের তথ্য-উপাত্ত নির্ভরযোগ্যভাবে এবং যথাযথ সাবধানতা অবলম্বন করে চয়ন করতে হবে।
একইভাবে এই মুহূর্তের একটি বড় রাজনৈতিক বিতর্ক হচ্ছে, বাংলাদেশ কি ঋণের ফাঁদে আটকা পড়বে? ঋণ অবশ্য দু'রকম। যথাক্রমে দেশীয় উৎস থেকে ঋণ এবং বিদেশি উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ। এই ঋণের বিপজ্জনক মাত্রা অনেক সময় জিডিপির ৩০-৪০ শতাংশ বলা হয়ে থাকে। এর কোনো সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো ধনী দেশ জিডিপির চাইতেও বেশি ঋণ গ্রহণে সক্ষম। কিন্তু শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, মধ্যম আয়ের দেশ হওয়া সত্ত্বেও ঋণের দায়ে দেশটি দেউলিয়া হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি এতই সংকটজনক যে, বিদেশ থেকে খাদ্য ও জ্বালানি আমদানি করার মতো প্রয়োজনীয় বিদেশি মুদ্রা শ্রীলঙ্কার নেই। দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশে দেশটি কিছু অনুকরণীয় সাফল্য নিয়ে বিশ্বসভায় দাঁড়িয়েছিল। দেশটি মধ্যম আয়ের দেশে
পরিণত হয়েছিল। কিন্তু আজ আর সেগুলোর চিহ্নমাত্র নেই। সুতরাং বাংলাদেশকেও অত্যন্ত সাবধান হতে হবে।
বিদেশ থেকে বাংলাদেশিরা যে রেমিট্যান্স পাঠান, তার সরকারি হারের সঙ্গে অতিরিক্ত ২ শতাংশ যোগ করার ফলে বিদেশে অবস্থানকারীরা সরকারি চ্যানেলে তাদের অর্থ প্রেরণ করতে প্রণোদিত হয়েছিলেন। এখন প্রতি ডলারের বাংলাদেশি টাকায় মূল্য ১০০ কিংবা তার কিছু বেশি। বাংলাদেশি টাকা দুর্বল হয়ে পড়ার ফলে আশানুরূপ রেমিট্যান্স আসছে না। এটা বাংলাদেশের জন্য সমূহ বিপদের কারণ। বাংলাদেশি টাকার দাম পড়ে যাওয়ার ফলে আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যের ওপর প্রভাব পড়বে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমদানির জন্য বাংলাদেশকে অতিরিক্ত টাকা ব্যয় করতে হবে। এর ফলে আমদানি নিরুৎসাহিত হবে। অন্যদিকে রপ্তানি উৎসাহিত হবে। টাকার বিনিময় হার বিভাগে আমদানি ও রপ্তানিকে প্রভাবিত করবে, তার জন্য সূক্ষ্ণাতিসূক্ষ্ণ বিশ্নেষণ প্রয়োজন। সংবাদপত্র জানাচ্ছে, রেমিট্যান্সের আইনানুগ বাজার হুন্ডির কাছে মার খাচ্ছে। হুন্ডির প্রভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকে ডলারের মজুতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে এবং কভিড সংক্রমণের কারণে বৈশ্বিক খাদ্যশস্য হ্রাস পাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। নানামুখী বিপদের মুখে এবারের বাজেট কথার ফুলঝুরি না হয়ে কঠিন বাস্তবতাবোধে বুদ্ধির প্রয়োগে সময়ের সঠিক পদক্ষেপ হোক- এটাই দেশবাসীর কামনা।
ড. মাহবুব উল্লাহ :অর্থনীতিবিদ; সাবেক অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়