আগামী ১৫ জুন কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে প্রতিদ্বন্দ্বিতার লক্ষ্যে মেয়র পদে ৬ জন ও কাউন্সিলর পদে ১৫৮ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, চিত্র ততই পাল্টাতে থাকবে। আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, বর্জনে কোনো অর্জন না এলেও নির্বাচন বর্জন চলছেই। দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি এ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। তাদের স্থানীয় নেতা মনিরুল হক সাক্কু স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। ১৯ মে তিনি দল থেকে পদত্যাগপত্র জমা দেন। তবে দল তাঁর পদত্যাগের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত না জানিয়ে ওই দিনই সন্ধ্যায় তাঁকে সদস্যপদসহ সব পর্যায়ের পদ থেকে বহিস্কার করে। আওয়ামী লীগ দলীয়ভাবে আরফানুল হক রিফাতকে মনোনয়ন দিলেও মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময়ে একজন বিদ্রোহী প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন।

কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন নতুন নির্বাচন কমিশনের প্রথম নির্বাচন। তাদের সামনে রয়েছে ভোটারের আস্থা ফেরানোর পুরোনো চ্যালেঞ্জ। বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে কিছুদিন আগে। আমরা জানি, রাষ্ট্রপতি বেশকিছু রাজনৈতিক দলের সঙ্গে এ ব্যাপারে সংলাপ করেছিলেন। তবে অনেক আমন্ত্রিত দল রাষ্ট্রপতির ওই সংলাপে অংশ নেয়নি। আমরা দেখলাম, এর পরই নির্বাচন কমিশন গঠন-সংক্রান্ত একটি আইন জাতীয় সংসদে পাস হয়। সেই আইনের আওতায় গঠিত হয় অনুসন্ধান কমিটি। ওই কমিটি ১০ জনের নাম প্রস্তাব করেছিল। সেখান থেকে রাষ্ট্রপতি পাঁচজনকে নিয়োগ দিয়েছেন। সংবিধান অনুসারে এই নিয়োগ রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশেই দিয়েছেন। নতুন কমিশন গঠনের পূর্বাপর এ নিয়ে নানা মহলে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। ফের এ প্রশ্নও উঠেছিল- প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন ব্যবস্থার ব্যাপারে কতটা কী করতে পারবে নতুন কমিশন। তাদের এখন সেই পরীক্ষা দেওয়ার সময় উপস্থিত। আমাদের নির্বাচন ব্যবস্থা কতটা বিপন্ন, এর সর্বশেষ সাক্ষ্য মিলেছে বিদায়ী কমিশনের অধীনে কয়েক দফায় অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকারের নিম্নস্তর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে।

নির্বাচন ব্যবস্থার বিপন্ন দশার বিয়ষটি নতুন না হলেও বিদায়ী কমিশনের অধীনেই অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা গিয়েছিল। ওই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে তেমন নেতিবাচক কথাবার্তা হয়নি। সরকার প্রভাবিত না করলে শান্তিপূর্ণ কিংবা সুষ্ঠু নির্বাচন যে সম্ভব- এর প্রমাণ নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মিলেছে। বিদায়ী কমিশনের দিকে নানা সমালোচনার তীর ছুটে গেলেও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রচারাভিযান থেকে শুরু করে ভোট গ্রহণ ও ফল ঘোষণা পর্যন্ত সব পর্যায়েই ছিল গণতান্ত্রিক আবহ। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নির্বাচনের চিত্র তো এমনই হওয়া উচিত। কিন্তু বিগত খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আমাদের অভিজ্ঞতায় রয়েছে অনেক তিক্ততা। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর আমরা সরকারের দায়িত্বশীলদের মুখে প্রতিশ্রুতি শুনেছিলাম, আগামী সব নির্বাচনই হবে নারায়ণগঞ্জের মতো। যাঁরা শান্তিপ্রিয় এবং সুস্থ রাজনীতি ও নির্বাচনের প্রত্যাশা করেন, তাঁদের কাছে এমন বার্তা নিঃসন্দেহে স্বস্তির। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই স্বস্তি শেষ পর্যন্ত থাকবে কিনা।

কুমিল্লা সিটি নির্বাচনের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী মেয়র প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কু ও আরফানুল হক রিফাতের বিরুদ্ধে বেশকিছু অভিযোগ উঠেছে। সংবাদমাধ্যমে তাঁদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ ইতোমধ্যে উঠেছে, তাতে নির্বাচনের পরিবেশ স্থিতিশীল রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দু'জন প্রার্থীই তাঁদের হলফনামায় সম্পদের সঠিক হিসাব তুলে ধরেননি- এমন খবরও সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। এসবই শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য প্রতিকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। নতুন নির্বাচন কমিশনের যেহেতু কুমিল্লা সিটি নির্বাচন দিয়েই প্রথম পরীক্ষাটা হবে, সেহেতু তাদের এ ব্যাপারে শতভাগ নির্মোহ তো বটেই, একই সঙ্গে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে সর্বক্ষেত্রে তারা কতটা নিষ্ঠার পরিচয় দিতে পারল- এরও পরীক্ষা হয়ে যাবে। আমাদের নির্বাচন ব্যবস্থায় এরই মধ্যে গুরুতর যেসব ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, এর উপশম করতে না পারলে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য এগুলো হয়ে থাকবে অকল্যাণের কারণ। নারায়ণগঞ্জে সুষ্ঠু নির্বাচন হলেও সেখানে ইভিএম ব্যবস্থার ত্রুটির বিষয়গুলো আলোচনায় উঠে এসেছিল।


নিন্দিত-নন্দিত সব বিষয় আমলে রেখেই নির্বাচন কমিশনকে তাদের দায়িত্ব পালনে মনোযোগ বাড়াতে হবে। সত্যিকার অর্থে সুষ্ঠু নির্বাচনের সদিচ্ছা থাকলে ত্রুটিপূর্ণ ইভিএম ব্যবস্থা একেবারে পরিহার করা উচিত। যদি নির্বাচন কমিশন অতীতের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করে তাহলে নিশ্চয় এ ব্যাপারে তাদেরও দ্বিমত করার অবকাশ থাকবে বলে মনে করি না। এই প্রক্রিয়ায় আমাদের সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলরা কতটা দক্ষতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন কিংবা আমাদের সার্বিক প্রস্তুতিই বা এ ব্যাপারে কতটা রয়েছে, এ নিয়ে নতুন করে ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ নিষ্প্রয়োজন। আস্থার সংকট কাটাতে ইসির করণীয় কী- এ নিয়েও ইতোমধ্যে আলোচনা কম হয়নি। প্রশ্নমুক্ত নির্বাচনের জন্য সর্বাগ্রে দরকার নির্বাচন কমিশনের শতভাগ নির্মোহ অবস্থান ও তাদের চাহিদার নিরিখে সরকারের সহযোগিতা দান।

যে কোনো নির্বাচনের ক্ষেত্রে মুখ্য নিয়ামক শক্তি হলো ভোটার। আর নির্বাচন কমিশন ও তাদের সহযোগীদের মুখ্য দায়িত্ব হচ্ছে ভোটারদের ভোটাধিকার সুরক্ষা করা। অতীতে এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ভোটারের ভোটাধিকার প্রয়োগে উৎসাহ হারিয়ে ফেলা মোটেও স্বস্তির বিষয় নয়। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বশীলদের নানা রকম ব্যর্থতা, স্ববিরোধিতা, যথাসময়ে প্রয়োজনীয় কাজটি করতে না পারা, নিজেদের পক্ষপাত দোষে দুষ্ট হওয়ার মতো অনেক কিছুর নজির রয়েছে। আমরা আশা করব, নতুন নির্বাচন কমিশন দুর্নাম ঘোচাতে সচেষ্ট হবে তাদের কাজের মধ্য দিয়ে এবং অবশ্যই উপযুক্ততার প্রমাণ রেখে। পর্যবেক্ষক কিংবা সমালোচকদের সমালোচনা দায়িত্বশীলদের আমলে না নেওয়ার অশুভ প্রবণতা অতীতে লক্ষ্য করা গেছে। কুমিল্লায় এর পুনরাবৃত্তি দেখতে চাই না।

কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন প্রশ্নমুক্ত হোক; নতুন নির্বাচন কমিশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হোক এবং ভোটারসহ রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা ফিরে আসা এসব জনপ্রত্যাশা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বশীলদের অজানা নয়। প্রচারাভিযান থেকে শুরু করে ভোট পর্ব ও ফল প্রকাশ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দায় নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ, প্রশ্নমুক্ত করার জন্য ইসির কাছে সংবিধান প্রদত্ত ক্ষমতা কম নেই। ইসির দায়িত্বশীলদের কাছে সরকারি কর্মকর্তাদের মতো আচরণ কাম্য নয়। সরকারি কর্মকর্তারা সরকারের আদেশ পালন করেন। কিন্তু প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনার সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত বিধায় তাঁদের কার্যক্ষমতা স্বাধীন। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের হাতে যেটুকু ক্ষমতা রয়েছে এর যথাযথ প্রয়োগে প্রশ্নমুক্ত নির্বাচন করা মোটেও কঠিন কিছু নয়- এ দৃষ্টান্ত তো আমাদের দেশেই রয়েছে। প্রতিটি কমিশনের কাছে থাকে আমাদের একই প্রত্যাশা। কিন্তু দুঃখজনক হলো তা পূরণ না হওয়া। নতুন নির্বাচন কমিশন তা পারবে কিনা- ভবিষ্যতের গর্ভেই এর উত্তর নিহিত।

এম হাফিজ উদ্দিন খান: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সভাপতি, সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন