গত ৯ মে সমকালের প্রধান শিরোনাম ছিল 'রাজনীতি হঠাৎ সরব'। মূলত ৭ মে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় প্রধানমন্ত্রী ও দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা আগামী নির্বাচনে বিএনপিকে আনতে প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে মন্তব্য করার পরই বিষয়টি নিয়ে চারদিকে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এ ঘোষণাকে অনেকেই ইতিবাচক এবং বিদ্যমান গুমট রাজনৈতিক পরিবেশে সুবাতাসের ইঙ্গিত বলে মনে করছেন। তবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব আসনে ইভিএমে ভোট গ্রহণ করা হবে বলে প্রধানমন্ত্রী যে উক্তি করেছেন, তার সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন অনেকেই।
আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপিকে আগামী সংসদ নির্বাচনে আনতে সংবিধানের ভেতর থেকেই প্রয়োজনীয় ছাড় দেওয়া হবে। এজন্য প্রথমেই নির্বিঘ্নে বিএনপির সভা-সমাবেশ করার পরিবেশ তৈরি করা হবে। পরে দরকার হলে বিএনপির সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সঙ্গে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টির জন্য নির্বাচন কমিশনকে সর্বাত্মক সহযোগিতার পাশাপাশি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও নিরপেক্ষ অবস্থানে দেখতে চায় তাদের দল।
প্রধানমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের পর দেশের রাজনীতিতে পরিবর্তনের একটি আভাস যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, তা সচেতন ব্যক্তিদের নজর এড়াতে পারেনি। বিএনপিকে নির্বিঘ্নে সভা-সমাবেশ করতে দেওয়া হবে- আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের এ কথার প্রতিফলন ইতোমধ্যে ঘটেছে। গত দুই সপ্তাহে বিএনপি দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় যেসব সভা-সমাবেশ করেছে, তাতে সরকারি প্রশাসন, পুলিশ বা ক্ষমতাসীন দল কোনো বাধা সৃষ্টি করেনি। এর ফলে বিভিন্ন স্থানে দলটি বেশ বড় বড় সমাবেশ করতে সক্ষম হয়েছে। এতে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের উদ্দীপনা যেমন সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি দেশে সহাবস্থানের রাজনীতির সুবাতাস প্রবাহিত হওয়ার সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে। অবশ্য সরকারের এ সহিষ্ণুতা এবং বিএনপির রাজপথে নামার এ 'সাহস' কতদিন স্থায়ী হবে তা নিয়ে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের সংশয় এখনও দূর হয়নি।
যা হোক, উভয় শিবিরে নির্বাচনী দামামা বেজে উঠতে শুরু করেছে। বিএনপি যদিও মুখে বলছে, তারা নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার প্রতিষ্ঠা না হলে নির্বাচনে যাবে না। ভেতরে ভেতরে তারা নির্বাচনী প্রস্তুতি নিতে শুরু করে দিয়েছে। এ লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন সংসদীয় আসনে প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবছে তারা। পত্রিকার খবর অনুযায়ী, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তাঁর পছন্দের ব্যক্তিদের আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে আগাম সংকেত দিয়ে রাখছেন। কোথাও আবার তাঁদের দায়িত্ব দিচ্ছেন সংশ্নিষ্ট আসনে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের কমিটি নিজের ছক অনুযায়ী সাজিয়ে নিতে। তবে এর ফলে দলটিতে বেজে উঠেছে অনৈক্যের সুর; যার প্রভাব আগামী সংসদ নির্বাচনে পড়বে বলে মনে করছেন সচেতন ব্যক্তিরা।
নির্বাচন ও আন্দোলন প্রশ্নে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের কথা প্রচার করলেও ঘরের আগুনে পুড়ছে বিএনপি। কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন জেলায় দ্বন্দ্ব-কোন্দলে জড়িয়ে পড়ছেন কেন্দ্র থেকে শুরু করে তৃণমূল নেতাকর্মীরা। ফলে জাতীয় ঐক্য দূরে থাকুক, ঘরের ঐক্য রক্ষা করতেই তাঁদের গলদঘর্ম হতে হচ্ছে। এরই মধ্যে গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো সাতটি দলের 'গণতন্ত্র মঞ্চ' নামে নতুন জোট গঠনের খবর বিএনপিকে বিচলিত করে তুলেছে। এই নতুন রাজনৈতিক জোটের শরিকদের কোনোটি বিএনপি ঘরানার, কোনোটি মাঠে বিএনপির অনুগামী। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, আগামী সংসদ নির্বাচনে আসন ভাগাভাগিতে সুবিধা আদায়ের জন্য ওই দলগুলো বিএনপিকে চাপে রাখার কৌশল হিসেবে এ পথ গ্রহণ করেছে।
অন্যদিকে, আওয়ামী লীগও বসে নেই। তারাও নির্বাচনী প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় সভাপতি শেখ হাসিনা স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছেন, এবার প্রার্থীদের যার যার যোগ্যতায় জিতে আসতে হবে। দলের এই চিন্তাভাবনার প্রতিফলন ঘটেছে তাঁদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে। সম্প্রতি একটি দৈনিকের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী নির্বাচনে দলের জয় নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ৩০০ আসনে যোগ্য প্রার্থীর সন্ধানে নেমেছে আওয়ামী লীগ। তারা জরিপ চালাচ্ছে সংশ্নিষ্ট আসনগুলোতে। ইতোমধ্যে ১০০ আসনে জরিপ শেষ হয়েছে। শিগগিরই সম্পন্ন হবে সব আসনের জরিপ। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এ জরিপের ভিত্তিতে মনোনয়ন দেওয়া হলে বর্তমান এমপিদের অনেকেরই কপাল পুড়তে পারে। কারণ অদক্ষ, কর্মীবিরোধী এবং বিতর্কিত এমপিদের এবার বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগ।
নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনীতির এই হঠাৎ সরব হয়ে ওঠা নিয়ে জনসাধারণ কী ভাবছে, তা নিয়ে কেউ ভাবছেন বলে মনে হচ্ছে না। রাজনৈতিক দলগুলো নিজ নিজ প্রার্থীর ব্যাপারে মাঠ জরিপ করলেও রাজনীতি নিয়ে জনগণের ভাবনা-চিন্তা কী, সে জরিপ তারা করছে না। তবে রাস্তাঘাটে কান পাতলেই এ বিষয়ে জনমতের আওয়াজটা কানে আসে। বাসে-টেম্পোতে কিংবা ফুটপাতের চায়ের আড্ডায় মানুষ যে অভিব্যক্তি প্রকাশ করে, তাতে রাজনীতির প্রতি তাঁদের অনীহা বা বীতস্পৃহার বিষয়টি সহজেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ব্যবসায়ী-শিল্পপতি, কৃষক-মজুর, ছাত্র-যুবক কেউই এখন রাজনীতি, নির্বাচন নিয়ে ভাবছেন না। তাঁরা শঙ্কিত ও উদ্বিগ্ন দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে। প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং তারই প্রতিক্রিয়ায় রাজনৈতিক নৈরাজ্য তাঁদের ভাবিয়ে তুলেছে। রাজধানী ঢাকা শুধু নয়, দেশের গ্রামাঞ্চলের মানুষও এখন এসব বিষয় নিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন। এসব মানুষের কথায় রাজনীতি ও নির্বাচন নিয়ে যে নিষ্পৃহতার আভাস ফুটে উঠেছে, তা যে ভালো লক্ষণ নয়, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। যে জনগণের জন্য রাজনীতি, সে জনগণই যদি নীরব হয়ে যায়, তাহলে রাজনীতি হঠাৎ সরব হয়ে উঠলেও তা থেকে ইতিবাচক কোনো ফল বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা একবারেই কম।
মহিউদ্দিন খান মোহন: সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্নেষক