মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা বুদ্ধিজীবী নোয়াম চমস্কি সম্প্রতি দেশটির অনলাইন সংবাদমাধ্যম ট্রুথআউটের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সেখানে তিনি চলমান ইউক্রেন সংকটসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন। ইংরেজিতে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, লেখক ও সাংবাদিক সি জে পলিক্রনিও। নির্বাচিত অংশের ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক
সি জে পলিক্রনিও: যুদ্ধকালীন প্রোপাগান্ডা আধুনিক বিশ্বে একটি শক্তিশালী অস্ত্র। শত্রুকে 'ইভিল' বা খারাপ হিসেবে চিহ্নিত করে যুদ্ধের ন্যায্যতা দিয়ে মানুষের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করা হয়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রেও কি তা দৃশ্যমান?
নেয়াম চমস্কি: যুদ্ধকালীন প্রোপাগান্ডা অনেক দিন ধরেই একটি শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহূত হয়ে আসছে। ইতিহাসের দিকে তাকালে অন্তত তারই প্রমাণ পাই। ১৯১৬ সালে উড্রো উইলসন 'জয় ছাড়া শান্তি' স্লোগান নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। সে স্লোগানই পরে উল্টে গেল 'শান্তি ছাড়া জয়'। এর ফলে আমরা দেখলাম, জার্মানিদের ঘৃণার প্রচার হলো। প্রোপাগান্ডা মিথের মতোই অনেকটা অর্থহীন। তবে এটি সত্যের খণ্ডিত অংশ এবং মতামত তৈরির ক্ষেত্রে কার্যকর। যেমন ইউক্রেনে পুতিন অকারণে হামলা করেছেন- এটি প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে তাঁকে অপরাধী হিসেবে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ফলে গুগলে 'আনপ্রভোকড ইনভেসন অব ইউক্রেন' বা ইউক্রেনে অপ্ররোচিত বা অনর্থক আক্রমণ লিখে খোঁজ করলে শূন্য দশমিক ৪২ সেকেন্ডে প্রায় ২৪ লাখ ৩০ হাজার ফল চলে আসে। অথচ কৌতূহলবশত আমরা যদি 'আনপ্রভোকড ইনভেসন অব ইরাক' লিখে খোঁজ করি তাতে শূন্য দশমিক ৩৫ সেকেন্ডে মাত্র ১১ হাজার ৭০০ ফল আসে। এই চিত্র বোঝাতে চায়, ইরাকে হামলার ন্যায্যতা থাকলেও ইউক্রেন হামলা অনর্থক। এর মাধ্যমেই প্রোপাগান্ডার চিত্র স্পষ্ট।
বাস্তবতা আমরা জানি, কোনো ধরনের প্ররোচনা ছাড়াই ইরাকে হামলা করা হয়। অন্যদিকে, ইউক্রেনে হামলা চালাতে রাশিয়াকে প্ররোচিত করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উঁচু স্তরের কূটনৈতিক ও নীতি-বিশ্নেষকরা ৩০ বছর ধরে ওয়াশিংটনকে সতর্ক করে বলেছেন, রাশিয়ার নিরাপত্তার বিষয় উপেক্ষা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বেপরোয়া হয়ে অপ্রয়োজনীয় প্ররোচনা দিয়ে আসছে। এটাই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ। বিশেষ করে ভূকৌশলগত দিক থেকে জর্জিয়া ও ইউক্রেনের অবস্থান রাশিয়ার কাছে হলেও তাদের ন্যাটোর সদস্য বানাতে প্ররোচিত করা হচ্ছে। যুদ্ধকালীন প্রোপাগান্ডার অংশ হিসেবেই অথচ আমরা তার বিপরীত ধরনের মতামত ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন দেখে থাকি।
পলিক্রনিও: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসার সঠিক চিত্র কিংবা রাজনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরার ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি করছে, না সহায়ক ভূমিকা পালন করছে?
চমস্কি: আমার জন্য এটা বলা কঠিন, যেহেতু আমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিহার করি এবং এ ব্যাপারে আমার কাছে তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। তবে আমার মত মিশ্র। অস্বীকার করার উপায় নেই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সুবিধা হলো, বহুবিধ মত ও বিশ্নেষণ দেখা যায়, যেটা মূলধারার সংবাদমাধ্যমে অনুপস্থিত। অন্যদিকে, এটা স্পষ্ট নয়, কীভাবে এই সুবিধার অপব্যবহার হয়েছে। তবে আমি বলব, এই সুবিধার ব্যবহার খুব কমই হয়েছে। তা ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক প্রসারে মূলধারার সংবাদমাধ্যম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মূল কারণ, সংবাদমাধ্যমগুলোর বিজ্ঞাপননির্ভরতা। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার এটি অন্যতম অভিশাপ। অথচ বড় বড় সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠাতার ভিন্ন লক্ষ্য ছিল।
পলিক্রনিও: প্রায় ৩৫ বছর আগে আপনি এবং এডওয়ার্ড হারম্যান 'ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট :দ্য পলিটিক্যাল ইকোনমি অব দ্য মাস মিডিয়া' শিরোনামে একটি বই প্রকাশ করেছেন। সেখানে আপনারা যে প্রোপাগান্ডা মডেলের কথা বলেছেন; ডিজিটাল যুগে এসেও কি তা কার্যকর?
চমস্কি: দুঃখজনক হলেও সত্য, মূল লেখক এডওয়ার্ড হারম্যান আর আমাদের মাঝে নেই। তাঁকে দারুণভাবে মিস করছি। আমার ধারণা, এডওয়ার্ডও আমার সঙ্গে একমত পোষণ করতেন, ডিজিটাল যুগে এসেও তার তেমন পরিবর্তন হয়নি। এর সঙ্গে আমি যা উল্লেখ করলাম, ব্যবসাভিত্তিক সমাজে মূলধারার সংবাদমাধ্যম আগে যে ধরনের চাপের মধ্যে ছিল, এখনও সেই একই চাপে রয়েছে। এর বাইরে গুরুত্বপূর্ণ যে পরিবর্তন হয়েছে তা হলো, ষাটের দশকের পর জনপ্রিয় আন্দোলনগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে করপোরেট খাতসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সংবাদমাধ্যমের ইতিবাচক ভূমিকা রয়েছে। এটি সত্যি ভালো বিষয় যে, ওই সময়গুলোতে যথাযথ মত ও প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে।

পলিক্রনিও: আপনি 'হোয়াটঅ্যাবাউটিজম' সম্পর্কে কী বলবেন? বর্তমান ইউক্রেন যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। (হোয়াটঅ্যাবাউটিজম মানে কাউকে কোনো বিষয়ে অভিযুক্ত করে প্রশ্ন করলে তিনি উল্টো প্রশ্নকারীকে অভিযুক্ত করেন কিংবা প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে ফেলেন।)
চমস্কি: হোয়াটঅ্যাবাউটিজম নতুন পরিভাষা হলেও এর ধারণা আগেও ছিল। স্বৈরাচারী মানসিকতায় যা হয় আর কি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গ্র্যান্ড ওল্ড পার্টি বা রিপাবলিকান নেতারা বিভক্তির পক্ষে সব করেছেন। আমরা দেখেছি, ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর ১৭৭৬ কমিশনের মাধ্যমে দেশপ্রেমের শিক্ষা প্রচারণা চালু করেছিলেন। মুক্ত সমাজে এ ধরনের বিভাজন মানে বিচ্যুতি। অনেক বছর হয়তো আমরা 'সোশ্যালিস্ট' শব্দের ব্যবহার দেখব। মানে আধুনিক সামাজিক গণতান্ত্রিক। ৬০ বছর যেমন ক্যাপিটালিজম বা পুঁজিবাদ এবং ইমপেরিয়ালিজম বা সাম্রাজ্যবাদ উচ্চারণও ছিল এক ধরনের মৌলবাদ। আমেরিকা যদি রিপাবলিকানদের প্রত্যাশা অনুযায়ী রূপান্তরিত হয়, তবে নৈতিক তুলনা অপ্রয়োজনীয়। হোয়াটঅ্যাবাউটিজম সম্পর্কেও একই কথা।
পলিক্রনিও: শেষ প্রশ্ন, যুক্তরাজ্যের আদালত আনুষ্ঠানিকভাবে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণের অনুমোদন দিয়েছেন। এখন অ্যাসাঞ্জকে প্রত্যর্পণ বিষয়ে যুক্তরাজ্য সরকারের অনুমতি প্রয়োজন। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অনুমতি দিলে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যেতে হবে অ্যাসাঞ্জকে। সেখানে তাঁর ১৭৫ বছর কারাদণ্ড হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধ-সংক্রান্ত ৫ লাখ গোপন নথি ফাঁস করার অভিযোগ উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে। মানবাধিকারের ভয়ানক লঙ্ঘন হিসেবে উদ্বেগ প্রকাশ করার পরও তাঁকে প্রত্যর্পণের বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
চমস্কি: জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে কয়েক বছর ধরে যেভাবে রাখা হয়েছে, তা এক ধরনের নির্যাতন। তাঁর সাক্ষাৎ লাভে যাঁরা সক্ষম হয়েছেন, (আমি তাঁকে একবার দেখেছিলাম) তাঁরাই বিষয়টি বলেছেন। নির্যাতনবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত নিলস মেলজার ২০১৯ সালে তাঁকে দেখার পর বলেছিলেন, অ্যাসাঞ্জের মধ্যে অব্যাহতভাবে যে প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণা দেখা যাচ্ছে তাতে এটি স্পষ্ট, তাঁর ওপর মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতন বা অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক বা মর্যাদাহানিকর আচরণ করা হয়েছে বা সাজা দেওয়া হয়েছে। এর কিছুদিন পর ট্রাম্প প্রশাসন অ্যাসাঞ্জকে ১৯১৭ সালের গুপ্তচরবৃত্তি আইনে অভিযুক্ত করে। অ্যাসাঞ্জের ১৭৫ বছরের কারাদণ্ডের মাধ্যমে আমরা ফ্যাসিস্ট ইতালির চেয়েও আরেক ধাপ এগিয়ে থাকা পদক্ষেপ দেখছি। এই অ্যাসাঞ্জকেই 'অপরাধী' হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সরকার বছরের পর বছর নির্যাতনের মধ্যে রেখেছে, যিনি ক্ষমতাসীনদের থোড়াই কেয়ার করে সত্য উন্মোচন করেছিলেন।