ভারতবর্ষে উনিশ শতকের গোটা সময়টিকেই নবজাগৃতির অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যদিও প্রথমত কলকাতা শহরকেন্দ্রিক এবং পরবর্তী সময়ে উপশহরগুলোতে ইংরেজি শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে সামাজিক কুসংস্কার, ধর্মীয় কিছু বিধিনিষেধ, প্রচলিত সামাজিক প্রথার সংস্কার সাধনের মাধ্যমে লোকমানসে জ্ঞানের আলো পৌঁছে দেওয়া ছিল ব্রত। ইউরোপীয় জ্ঞানালোকের প্রক্রিয়ায় চিত্তালোকিত করার উদ্দেশ্য ছিল সেই জাগরণের মর্মে। বলা বাহুল্য, এ ছিল নিছকই হিন্দু সম্প্রদায়ের শিক্ষিত অংশের নবজাগৃতি, তাই তার ফল সর্বত্রগামী হয় নাই। নিম্নবর্ণের হিন্দু এবং অনগ্রসর মুসলমান সম্প্রদায় সেই আলোকিত জীবনের প্রভা, প্রভাব সমাজে প্রত্যক্ষ করেছে কিন্তু সেগুলোকে তারা উচ্চবিত্তের বিলাসী জীবনের অনুষঙ্গ মনে করেছে, উচ্চবিত্ত শিক্ষিত সমাজ।

নিম্নবিত্ত সাধারণ মানুষকে সেই জাগৃতির নবালোকে আলোকিত করেছে, এমন দৃষ্টান্ত বিরল। নিম্নবিত্ত অর্থাৎ শূদ্রশ্রেণি (হালের নিম্নবর্গ) উনিশ শতকেও সমাজে অচ্ছুত- তার ছায়া মাড়ালে, তাকে স্পর্শমাত্রে ব্রাহ্মণ ও উচ্চবর্ণের ভদ্রলোকদের গঙ্গাজলে পবিত্র হবার রীতি তারা বজায় রেখেছিল। এই নবজাগৃতির নেতৃবৃন্দ হিন্দু শিক্ষিত নগরবাসী বাঙালি- সমাজপতি তৎকালীন ভারতবর্ষের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও সূর্যাস্ত আইনের সুফল ভোগকারী জমিদারগণ। এই জাগরণের কালেও জমিদারতন্ত্র প্রজাপীড়নে অত্যুৎসাহী এবং দুর্ধর্ষ। সুতরাং তাদের সমাজ সংস্কার, নবজাগরণ গরিব প্রজাসাধারণ ও উৎপাদকশ্রেণির জীবনে কোনো আলোড়ন সৃষ্টি করে নাই। মুসলমান দরিদ্র ও হতদরিদ্রশ্রেণি যাপনের দুর্বিষহ যাতনা নিয়ে জীবনপাত করেছে, বাইরের এই আলোড়ন-বিলোড়ন স্পর্শ করে নাই তাদের অভাবগ্রস্ত জীবনকে। অতএব, যেহেতু সমাজ সম্প্রদায়গত বিবেচনায় দ্বিধাবিভক্ত, সেহেতু- হিন্দু সমাজের নবজাগৃতির পর মুসলমান সম্প্রদায়ের একটি নবজাগরণ অপেক্ষমাণ তো ছিলই। এক শতাব্দী পর বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে তা অনিবার্যভাবে আত্মপ্রকাশ করে।
বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫) এবং বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলন ধর্মনির্বিশেষে বাঙালিকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। ১৯০৬ সালে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার পর ভারতীয় তথা বঙ্গীয় মুসলমান সমাজের নিজস্ব দাবি উপস্থাপন করবার ও দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলন সংগ্রাম করবার উপযোগী একক একটি প্রতিষ্ঠান আত্মপ্রকাশ করে। ভারতবর্ষের মুসলমানগণ এই দলের ছত্রছায়ায় প্রথমবারের মতো উপস্থিত ও একত্র হবার সুযোগ লাভ করে। পলাশীর পরাজয়ের ক্ষমতার পটপরিবর্তনকালে মুসলমানগণ ছিলেন বিচ্ছিন্ন ক্ষমতাচ্যুত, অসহায়। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফল খুব কম সংখ্যক মুসলমানই ভোগ করতে সক্ষম হয়। সেই সৌভাগ্যবানদের অধিকাংশই ভূমিজ মুসলমান নয়ন, তাঁরা মধ্য এশিয়া হতে আগত। সেই মুসলমানদের পরিচয় প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞের বক্তব্য উপস্থাপন করাই বিধেয়- উনিশ শতকের অন্যতম মুসলমান নেতা নওয়াব আবদুল লতিফের সাক্ষ্যমতে -
'মধ্য ও উচ্চশ্রেণীর মুসলমানগণ আগত ধার্মিক, পণ্ডিত ও যোদ্ধাদের বংশধর, অথবা বাংলা দিল্লীর শাসনাধীনে আসার পর বাদশাহের দরবার থেকে বাংলায় প্রেরিত উচ্চপদস্থ কর্মচারীেেদর বংশধর। এদের অনেকেই এ অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে এবং উর্দুকে তাদের মাতৃভাষা হিসেবে বজায় রাখে।'
বলা বাহুল্য, উপর্যুক্ত মুসলমানগণ কিন্তু বাঙালি নন। বাঙালি মুসলমানদের জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁদের সংস্রব খুব অল্পই ছিল। ঐতিহাসিকভাবে এ কথা সত্য যে, গোটা ভারতবর্ষের তৎকালীন মুসলমান নেতৃবৃন্দ উল্লিখিত মধ্য এশিয়া থেকে আগত মুসলমানদেরই উত্তর-পুরুষ। শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্ত যখন নবজাগৃতির আলোক প্রভায় সমাজকে তথা স্বধর্মের অনুসারীদের আলোকিত করছেন, সমাজ সংস্কার ব্রত গ্রহণ করেন, তখন বঙ্গীয় এবং বাঙালি মুসলমানদের কোনো সামাজিক অবস্থানই নাই। দারিদ্র্য, অশিক্ষা এবং নানাবিধ ধর্মীয় কুসংস্কার তাঁদের অক্টোপাসের মতো আঁকড়ে ধরে আছে। ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত সর্বভারতীয় এই রাজনৈতিক দলটি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই নানাবিধ কর্মসূচি পরিচালনা করতে থাকে- তন্মধ্যে খেলাফত আন্দোলন প্রসঙ্গ উল্লেখ্য। কথা মুসলিম জাগরণ এবং প্রসঙ্গ নজরুল ইসলাম সেখানে এতসব লম্বা কথামালার যোজনা এই জন্য যে, মুসলিম লীগের খেলাফত আন্দোলন (১৯২০) পরিচালনার বৎসরেই কাজী নজরুল ইসলামের 'বিদ্রোহী' কবিতা প্রকাশিত হয়। এই একটা মাত্র কবিতা আঘাতে নজরুল যুগজন্মের বাঙালি সমাজের গোঁড়ামি, কুসংস্কার, সংস্কারকে গুঁড়িয়ে দিলেন। তাঁর আঘাতের প্রচণ্ডতায় 'খোদার আসন 'আরশ ছেদিয়া' উঠবার মতো অকল্পনীয় অবিশ্বাস্য ঘটনা যখন ঘটে গেল তখন অপর প্রান্তে 'ভগবান বুকে পদচিহ্ন' এঁকে দেবার ঘটনাও ঘটে গেছে। চমকে ক্রোধক্ষিপ্ত দৃষ্টি মেলে তাকিয়েছেন বাংলার হিন্দু, খÿহস্তে দাঁড়িয়েছেন মুসলমান ভাই। দু'পক্ষ অর্থাৎ কলকাতায় অনুষ্ঠিত হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার বছরেই কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার ওই বক্তব্য বিবদমান দুটি সম্প্রদায়ের কারও কাছেই যে, তাঁর গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির সহায়ক নয় তা বলাই বাহুল্য। তিনি হতে পারতেন দুই সম্প্রদায়ের সমঝোতার সেতু, কিন্তু তাঁর জাগ্রত চেতনায় সকল ধর্ম প্রতিষ্ঠার অভিন্ন অবস্থা। মানুষের জন্য ধর্ম, ধর্মের জন্য মানুষ নয়- নজরুল এই দর্শন আত্মস্থ করেছিলেন। এটাই ছিল তাঁর জীবন দর্শন। অতএব, হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান-ইহুদি এবং অপরাপর যেসব ধর্ম পৃথিবীতে বিদ্যমান এবং সেসব ধর্মের অনুসারীগণের প্রতি নজরুল ইসলাম সমানানুভূতি পোষণ করেছেন। হিন্দুর 'শ্যামা সংগীত' রচনা এবং মুসলমানের 'গজলগীত' রচনা কবির বিবেচনায় দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টির প্রচেষ্টা কিন্তু উভয় সম্প্রদায় তখন অন্ধ আক্রোশে ফুঁসছে, কেউই নজরুলকে যথার্থ মূল্যায়ন করে নাই। সাড়া দেন নাই তাঁর আন্তরিক আহ্বানে। কাজী নজরুল ইসলামের জাগ্রত চৈতন্য তাঁকে পথভ্রষ্ট হতে দেয় নাই- তিনি 'নিখিল ভারত জাতীয় কংগ্রেসে'ও নাম লেখালেন না, 'নিখিল ভারত মুসলিম লীগে'ও নয়। এই বিচক্ষণতার জন্যই তিনি অমর হয়ে রইলেন। মস্তিস্ক অকেজো হবার আগ পর্যন্ত সচেতন জীবনের সবটুকু সময় যে কবি শোষিত, নিপীড়িত, বঞ্চিত, প্রতারিত, সর্বহারা গণমানুষের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করেছেন, জেল খেটেছেন, শাসকগোষ্ঠীর চক্ষুশূল হয়ে রইলেন তিনি শেষাবধি হিন্দুর নন, মুসলমানেরও নন- তিনি মানুষের কবি, বাংলার কবি, বাঙালির কবি। সাম্প্রদায়িক রাজনীতি তাঁর টিকিটা পর্যন্ত স্পর্শ করতে পারে নাই। তাঁর দুর্ভাগ্য (তাঁর আমাদের?) কাজী নজরুলকে তাঁর স্বকাল এবং পরবর্তীকাল কেউই যথার্থ মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাঁর কবিসত্তার জাগরণের কালে তিনি মুসলমানদের জন্য অন্তরে যে দরদ অনুভব করেছেন, তার প্রকাশ ঘটেছে- 'মোর্হ‌রম, শাত-ইল-আরব, কামাল পাশা, আনোয়ার, 'কোরবানি, ইত্যাদি কবিতায়। আধুনিক তুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা 'কামাল পাশা'র মধ্যে মুসলিম জাগরণের তেজ প্রত্যক্ষ করেছিলেন। জীবনের যে জাগরণ কাজী নজরুলের চেতনায় ছিল তা ধর্ম-সংস্কার সকল কূপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে এক উদার মানবিক বোধে, বিশুদ্ধ ধর্মবোধে উচ্চকিত। মুসলমান সম্প্রদায় তাঁকে পথপ্রদর্শক হিসেবে গ্রহণ করে নাই, অভিষিক্ত করে নাই।
মুসলমান পিউরিটান মহল কাজী নজরুল ইসলামকে মুসলমান বলে স্বীকার করেন নাই। পারতেন তাঁকে নিজেদের আন্দোলন-সংগ্রামের সহযোগী করতে কিন্তু তাঁরা তা করেন নাই। না করে, উপর্যুপরি তাঁরা নজরুলকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন। নেতৃবৃন্দ এবং কবির মানসরূপে দুস্তর ব্যবধান ছিল। নেতৃবৃন্দ ধর্মকে ক্ষমতায় আহরণের একটা উপায় বলে সাব্যস্ত করেছিলেন, পক্ষান্তরে কবি নজরুল ধর্মবুদ্ধির ঊর্ধ্বে ওঠে মানুষের মুক্তিপ্রত্যাশী ছিলেন। মানবতার মুক্তির মধ্যেই তিনি ধর্মের প্রতিষ্ঠা দেখতে পান। প্রকৃত ইসলামের আদর্শে তিনি ছিলেন উজ্জীবিত- তাই মুসলিম জাগরণ ছিল কবির বহু কাঙ্ক্ষিত সত্য। মুসলমানদের অবহেলা তাঁর চিত্তকে খানখান করে দিয়েছিল। তার দৃষ্টান্ত 'আমার লীগ, আমার কংগ্রেস' নামক রচনার নিচের বক্তব্যে অত্যন্ত স্পষ্ট। 'আমার লীগ কংগ্রেস' শীর্ষক রচনায় কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর সমালোচনার জবাবে বলেন-
[...] [...] আমার স্বধর্মী কোনো কোনো ভাই বা তাঁদের কাগজ প্রচার করছেন- আমি নাকি মুসলিম লীগ বিদ্বেষী। বিদ্বেষ আমার ধর্ম-বিরুদ্ধ। আমার আল্লাহ নিত্য-পূর্ণ-পরম-অভেদ, নিত্য-পরম-প্রেমময়, নিত্য সর্বদ্বন্দ্বাতীত। কোনো ধর্ম, কোনো জাতি বা মানবের প্রতি বিদ্বেষ আমার ধর্মে নাই, কর্মে নই, মর্মে নাই।
এরূপ মানবতাবাদী ব্যক্তিত্ব এ যুগেও বিরল। যে উচ্চাঙ্গের বোধ কাজী নজরুলকে বিদ্রোহী সত্তার অধিকারী করেছিল সে উপলব্ধি করবার ক্ষমতা সেকালের মুসলমান নেতৃবৃন্দের ছিল না। তাঁরা তখন ক্ষমতার নেশায় উন্মত্ত। স্বধর্মের অনুসারীদের দ্বারা অপমানিত ক্ষুব্ধ কবি আত্মপক্ষ সমর্থন করবার পর নিজের প্রতি তাঁর সম্প্রদায় যে অবিচার করেছে সেই প্রসঙ্গে উল্লিখিত প্রবন্ধেরই শেষাংশে কবি বলেন-
মুসলমানের জন্য আমার দান কোনো নেতার চেয়ে কম নয়; যে-সব মুসলমান যুবক আজ নবজীবনের সাড়া পেয়ে দেশের জাতির কল্যাণের সাহায্য করছে তাদের প্রায় সকলেই অনুপ্রেরণা পেয়েছে এই ভিক্ষুকের ভিক্ষা-ঝুলি থেকে।
নজরুল কথিত সেই জ্ঞানালোকের ছোঁয়ায় প্রদীপ্ত যুব সমাজই ঢাকায় মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রতিষ্ঠাতা, মুসলমান নবজাগরণের পথিকৃত বাঙালি মুসলমান তরুণবৃন্দ। তাঁরা অনুপ্রাণিত হয়েও পিউরিটান মহলের ভয়ে কবি নজরুলকে সম্মুখে নিয়ে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারেন নাই। কিন্তু অনস্বীকার্য যে, মধুসূদন দত্তের পর কাজী নজরুল ইসলামই প্রথম বিদ্রোহী কবি যিনি প্রচল সকল প্রতিষ্ঠানকে আঘাতে আঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ করেছেন। সেই কারণেই আজও যখন অন্যায় মাথা উঁচিয়ে দাঁড়ায় নজরুলকে প্রয়োজন হয় তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সৃষ্টির জন্য; যখন সাম্প্রদায়িক অপশক্তি মানবতার গতিরোধ করে, তাকে প্রতিহত করতে চাই নজরুল ইসলামের অসাম্প্রদায়িক চেতনার খÿ। সেই খÿাঘাতে তাকে ধূলিসাৎ করবার জন্য প্রস্তুত হই আমরা। বাঙালির জাতীয় জীবনে নজরুল অকাল বৈশাখী, যুগে যুেেগ সকল কালে তিনি সর্বকালের হয়ে থাকবেন এটাই স্বাভাবিক- প্রেম ও দ্রোহে তিনি আমাদের শক্তি, বীর্যবত্তা।