বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত কৃষি। অন্যান্য খাতের তুলনায় জিডিপিতে কৃষি খাতের ক্রমহ্রাসমান অবদান সত্ত্বেও বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে কৃষির অবদান এখনও সর্বাধিক। বিশ্বব্যাংকের হিসাবমতে, এখনও বাংলাদেশের প্রায় ৬২ শতাংশ মানুষের জীবন-জীবিকা কোনো না কোনোভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। করোনাজনিত ব্যাপক অভিঘাতের মধ্যে বিগত ২০২০-২১ এবং ২০২১-২২ এ দুই অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করা হলেও এবারের বাজেট ঘোষণা করোনামুক্ত পরিবেশেই হবে। কিন্তু করোনার অভিঘাত এখনও ব্যাপকভাবে বিরাজমান। তদুপরি, মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা রূপে আবির্ভূত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, যার নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বেই ব্যাপকতর হচ্ছে। সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রভাব দেখা দিচ্ছে বিশ্ব খাদ্যবাজারে।

দেশের ১৭ কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নে কৃষির গুরুত্ব কম করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। অথচ বিগত বছরগুলোর বাজেট পর্যালোচনা করলে এক হতাশাজনক চিত্রই ফুটে ওঠে। সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত থেকেছে ক্ষুদ্র চাষির (ভূমিহীন, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক একসঙ্গে) স্বার্থ, যাঁরা কৃষক জনগোষ্ঠীর প্রায় ৯০ শতাংশ। তাঁদের অধিকার নিয়ে দরকষাকষি করার মতো কোনো সংগঠন নেই, নেতৃত্ব নেই। লকডাউনকালে ব্যবসায়ীদের জন্য সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করলেও প্রথমদিকে কৃষকরা ছিলেন সম্পূর্ণ উপেক্ষিত। অথচ এর অভিঘাত কৃষকদের ওপর যথেষ্টই পড়েছিল। কৃষক সবজি বিক্রি করতে না পারায় ক্ষেতেই নষ্ট হতে দেখা গেছে। বিপুল সংখ্যক পোলট্রি ও লেয়ার খামারি খামার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন। পরপর দুটি কোরবানির ঈদে গরুর দাম না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন লাখো কৃষক। অতঃপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক লেখালেখির ফলে সরকার শেষ পর্যন্ত ৫০০০ কোটি টাকার ঋণ প্রণোদনা ঘোষণা করলেও তার তেমন কোনো সুফল ক্ষুদ্র কৃষকের ঘরে যায়নি।

কেবল খাদ্য উৎপাদন বাড়ালেই যেমন খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না; তেমনি কৃষকের আর্থসামাজিক উন্নয়নও নিশ্চিত হয় না, যদি কৃষক তাঁর উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পান। কিন্তু বিগত বাজেটগুলোতে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পদক্ষেপ হিসেবে 'কৃষক বিপণন দল' ও 'কৃষক ক্লাব' গঠন এবং গ্রোয়ার্স মার্কেট স্থাপনের যে সাফল্যের কথা তুলে ধরা হয়েছে তা প্রকৃত প্রস্তাবে কতটা সফল তা নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। কৃষির ঢালাও বাণিজ্যিকীকরণের ফলে এবং ত্রুটিপূর্ণ বর্তমান মুক্তবাজার ব্যবস্থায় মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কৃষক যা উৎপাদন করেন তার লভ্যাংশটুকু লুটেপুটে নেয় মধ্যস্বত্বভোগীরা, যেখানে কৃষক তাঁর উৎপাদন ব্যয়ও তুলতে পারেন না। অন্যদিকে, ভর্তুকি বা ঋণ হিসেবে যা বরাদ্দ দেওয়া হয় তাও লুটেপুটে নেয় এক শ্রেণির সুবিধাভোগী। কাজেই, শুধু কিছু গ্রোয়ার্স মার্কেট নির্মাণ করে কিংবা রাসায়নিক সারে কিছু ভর্তুকি দিয়েই এই জটিল সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন বর্তমান বাজার ব্যবস্থার আমূল সংস্কার, যার কোনো দিকনির্দেশনা বিগত বাজেটগুলোতে পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, দানাদার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূূর্ণতা অর্জিত হলেও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্যের নিশ্চয়তা আজও সুদূর পরাহত।

জাতীয় কৃষি বাজেটে ক্ষুদ্র কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে যে বিষয়গুলো ভাবতে হবে তা হলো:জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে স্থায়িত্বশীল খাদ্য উৎপাদনের স্বার্থে মাটির স্থায়িত্বশীল উৎপাদনশীলতা বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য জৈব সার ব্যবহার বৃদ্ধিসহ জলবায়ুসহিষুষ্ণ স্থায়িত্বশীল কৃষিচর্চাকে উৎসাহিত করার জন্য সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে জলবায়ুসহিষুষ্ণ স্থায়িত্বশীল কৃষিচর্চার কৌশল ও দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ ও গবেষণা খাতে বরাদ্দ রাখা। কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে চলমান উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থার সংস্কার সাধনে উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। এ জন্য 'দাউদকান্দি মডেল'-এ কৃষকদের 'উৎপাদন ও বিপণন উদ্যোগ' গড়ে তোলা। কৃষকের শিক্ষিত বেকার সন্তানদের কাজে লাগিয়ে এসএমই আকারে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এ ক্ষেত্রে 'শস্য গুদাম ঋণ প্রকল্প'কে পুনরুজ্জীবিত করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য 'শস্য সংরক্ষণ ঋণ' চালু করা। কৃষিপণ্যের আগাম দাম নির্ধারণে সরকার-উৎপাদক-ভোক্তা সমন্বয়ে দাম কমিশন গঠন করা।

ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকদের জন্য সুদবিহীন বা স্বল্প সুদে মৌসুমভিত্তিক কৃষিঋণ সহজলভ্য করা এবং নারী কৃষকদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে ঋণসহ সব সরকারি সেবা ও প্রণোদনায় নারী কৃষকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত 'লাঙল যাঁর জমি তাঁর' নীতির ভিত্তিতে দেশের ভূমি মালিকানা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করা। এ জন্য 'ল্যান্ড ব্যাংকিং' ব্যবস্থা চালু করে অনুপস্থিত ভূমি মালিকদের কাছ থেকে জমি 'ল্যান্ড ব্যাংক'-এ জমা নিয়ে তা প্রকৃত ক্ষুদ্র কৃষক বা কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজলভ্য করা। দেশের মৃতপ্রায় নদীগুলোকে বাঁচাতে এবং নদীর পানিভিত্তিক সেচ ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা। পাশাপাশি, নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়সহ সব জলাশয়ে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত 'জাল যাঁর জলা তাঁর' নীতির আশু বাস্তবায়ন করা। সার, বীজ, সেচ কাজে ভর্তুকি দেওয়ার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি জলবায়ু-সহনশীল স্থায়িত্বশীল কৃষিপ্রযুক্তি তথা জৈব সার, বালাইনাশক, আইপিএমের মতো জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশবান্ধব কৃষিপ্রযুক্তি সম্প্রসারণে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা ও ভর্তুকি প্রদান এবং এই ভর্তুকির সুবিধা যাতে সরাসরি নারী কৃষকসহ প্রকৃত কৃষকরা পান তার বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ নিতে হবে। নারী কৃষি শ্রমিকদের জন্য রাষ্ট্রীয় সেবা ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাও জরুরি। স্বাধীন ও শক্তিশালী কৃষক সংগঠন তৈরির মাধ্যমে কৃষিসংশ্নিষ্ট নীতি ও পরিকল্পনা প্রণয়নে প্রকৃত কৃষকদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। কৃষি বাজারের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বাজারে প্রকৃত কৃষকদের অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করাও জরুরি।

দেশীয় গরু-ছাগল-মহিষ-ভেড়া এবং হাঁস-মুরগির বাণিজ্যিক উৎপাদন-বিপণনে সরকারি সেবা ও প্রণোদনা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি, বিদ্যমান পোলট্রিশিল্প ও প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়নে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা বৃদ্ধি করা। জাটকা মাছ নিধন রোধসহ সমুদ্রগামী মৎস্যজীবীদের দুর্যোগজনিত পুনর্বাসন কর্মসূচিতে বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা। দাউদকান্দি মডেলে হাওর-বাঁওড়, বিলাঞ্চলে পরিকল্পিত মৎস্য চাষে উৎসাহিত করতে মৎস্যজীবীদের প্রণোদনা ও সক্ষমতা বাড়ানো। বীজসহ সব রকম কৃষি উপকরণের বাণিজ্য একচেটিয়াভাবে কোম্পানির হাতে ছেড়ে না দিয়ে বৃহদংশ বিএডিসির হাতে রাখার জন্য সংস্থাটিকে আরও শক্তিশালী করা। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে ইকোসিস্টেমভিত্তিক অভিযোজনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বীজ ও কৌলিক সম্পদ সংরক্ষণে কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ও উদ্যোগ বৃদ্ধি করা। মেধা পাচার রোধ করে গবেষণা কার্যক্রম আরও জোরদার করার জন্য কৃষি গবেষণা ও কৃষি শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধি করা। যে কোনো ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রোগব্যাধি ও পোকামাকড়ের মাধ্যমে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষায় শক্তিশালী, দক্ষ ও কার্যকর 'স্যাটেলাইট-বেজড ডিজিটাল সার্ভিলেন্স ও ফোরকাস্টিং ব্যবস্থা' গড়ে তোলা এবং ক্ষুদ্র কৃষকদের শস্য বীমার আওতায় আনা।

শহীদুল ইসলাম: গবেষক ও উন্নয়ন কর্মী