বরুণ চন্দ ভারতীয় বাঙালি অভিনেতা ও লেখক। পেশাগত জীবনে বিজ্ঞাপন জগতের কিংবদন্তি। সত্যজিৎ রায়ের 'সীমাবদ্ধ' ছবির শ্যামলেন্দু চরিত্রে অভিনয়ের কারণে সুপরিচিত। পরবর্তীকালে অভিনয় করেছেন 'হীরের আংটি', 'ল্যাপটপ', 'চতুস্কোণ', 'লুটেরা' এবং 'বব বিশ্বাস' ছবিতে। 'মার্ডার ইন দ্য মোনাস্টেরি' তাঁর লেখা জনপ্রিয় রহস্য-রোমাঞ্চ উপন্যাস। এ পর্যন্ত প্রায় ২২টি চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন এবং এখনও অভিনয় করছেন। সম্প্রতি কলকাতায় এক অনুষ্ঠানে সমকালের পক্ষে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতার শিক্ষক রাজীব নন্দী

সমকাল: সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে এপার বাংলা ওপার বাংলায় জনপ্রিয়তার কমতি নেই। সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে আপনার লেখা বই 'সত্যজিৎ রায় :দ্য ম্যান হু নিউ টু মাচ'-এর পাঠ উন্মোচন হচ্ছে। কেমন অনুভূতি আপনার?

বরুণ চন্দ: এক শব্দে বলব, গুরুদক্ষিণা।

সমকাল: কীভাবে এলেন অভিনয়ে। সেই ১৯৭১ সালে তো আমাদের এদিকে ভয়াবহ মুক্তিযুদ্ধ আর ওদিকে নকশাল আন্দোলন। তখনই তো সত্যজিৎ রায়ের 'সীমাবদ্ধ' ছবির ডাক এলো?

বরুণ চন্দ: অভিনয় করব বলে ইচ্ছা ছিল। শখও ছিল। মানিকদার ছবিতে অভিনয় মানে তো একটা ইমোশন। আ ওয়ান টাইম লাইফ এক্সপেরিয়েন্স। লাইফ টাইম এক্সপেরিয়েন্স। ওটাই শুরু, ওটাই শেষ। মানিকদা আর ডাকলেন না।

সমকাল: বাংলাদেশে আপনার প্রচুর ভক্ত আছেন জানেন নিশ্চয়ই?

বরুণ চন্দ: সবাইকে নমস্কার। আমি শুধুই বই নিয়ে নয়, বরং আমার খুব ইচ্ছা হয়েছে এমনিতেই একবার বাংলাদেশে যাওয়ার। কেননা, আমি তো বাংলাদেশেরই মানুষ, জন্ম ঢাকায়। যদি সম্ভব হয় তাহলে দেখা হতে পারে।

সমকাল: সত্যজিৎ জন্মশতবার্ষিকী হয়ে গেল। এপার-ওপার দুই বাংলা কেমন করল আয়োজন?

বরুণ চন্দ: আমরা তো এখানে যথাসম্ভব চেষ্টা করেছি। নন্দনে উৎসব হয়েছে। সত্যজিৎ তো আমাদের ইমোশন। অনেক বই বের হয়েছে। আমি সবটার খোঁজ রাখতে পারিনি। এটা আমার ব্যর্থতা। কিন্তু প্রকাশনা হয়েছে। এটি একটি ভালো লক্ষণ। তবে কি জানেন, দুই বাংলার কমন কোনো সত্যজিৎ চর্চার প্ল্যাটফর্ম নেই। এমন থাকলে একসঙ্গে এই উৎসবটি দুই বাংলার মানুষ একসঙ্গে করতে পারতেন। আমাদের সরকার এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকার যথেষ্ট আন্তরিকতা দেখিয়েছে। এখন ওপার বাংলার উদ্যোগটা তো দরকার।

সমকাল: বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের কাছে আপনার কোনো প্রত্যাশা আছে?

বরুণ চন্দ: দেখুন, সরকার বা বড় বড় কর্তৃপক্ষকে ডেকে এসব করার চেয়ে ব্যক্তি বা সাংগঠনিক পর্যায়েও তো হতে পারে। আপনি ডাকুন না আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমি তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে চাই। ঢাকা আমার আবেগ। বাংলাদেশ তো আমার বাড়ি। আমাকে যাতায়াত খরচটি দিন না, আমি কিছুদিনের জন্য আপনার ছাত্রছাত্রীদের ওয়ার্কশপ করিয়ে আসব। বিজ্ঞাপন, মানিকদা, দুই বাংলার কত কিছু বলার আছে, করার আছে আমাদের।

সমকাল: নিউ মিডিয়া টেকনোলজি, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, মোবাইল ফোনে অ্যান্ড্রয়েড ফিচার যুক্ত হওয়ার পর পাঠকরা বইবিমুখ হচ্ছে- এমন একটা প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এই বিষয়ে আপনি কী বলবেন?

বরুণ চন্দ: অনেকেই বই কিনে পড়ছেন, আবার অনেকেই আইপ্যাড অথবা মোবাইল ফোনে পড়ছেন। যতদিন তাঁরা পড়ছেন, ততদিন তাঁরা মানুষ। আর যখন তাঁরা পড়া বন্ধ করে দিয়েছেন, তখন তাঁরা মানুষকে দেখছেন স্ট্ক্রিনে। এটাই আমার উপলব্ধি। এখন সময়টা স্ট্ক্রিন জেনারেশনের। ইনস্টাগ্রামে ইনস্ট্যান্ট ফিডব্যাক চান সবাই। এই তরুণদের ধৈর্য থাকা দরকার। তাঁরা যেন সবকিছুতেই মন বসাতে গিয়ে কোনো কিছুতেই মন বসাতে পারছেন না।

সমকাল: আপনার বইটি কী নিয়ে?

বরুণ চন্দ: সত্যজিৎকে বুঝতে হলে নগরকেন্দ্রিক ছবিগুলো 'প্রতিদ্বন্দ্বী', 'সীমাবদ্ধ' ও 'জন অরণ্য' আপনাকে অবশ্যই দেখতে হবে। বিশেষ করে আপনাদের শিক্ষার্থীদের। 'প্রতিদ্বন্দ্বী'র পরপরই যখন 'সীমাবদ্ধ' বিদেশে দেখানো হয়, তখন তো বাংলা সিনেমার ইন্টেলেকচুয়াল হাইট নিয়ে ঝড় ওঠে। বইয়ের প্রথম অংশে রায়ের সঙ্গে আমার স্মৃতিচারণা আছে। এর নাম 'রায় অন মাই মাইন্ড'। দ্বিতীয় অংশে আছে 'দি ম্যান হু নো টু মাচ'। এর ১৮টি অধ্যায়। 'সীমাবদ্ধ' সিনেমা কীভাবে আমার জীবন বদলে দিল তা থেকে শুরু করে সত্যজিত রায়কে খুব কাছ থেকে দেখার স্মৃতি আছে সেখানে। অনেকটা আত্মজৈবনিক বইও বলা যেতে পারে।

সমকাল: সত্যজিৎ রায়কে মিস করেন না? এই মহামারি, এই পরিবর্তিত পৃথিবী, বদলে যাওয়া রাজনীতি এত কিছুর মধ্যে মানিকদাকে কীভাবে ভাবেন?

বরুণ চন্দ: না, মিস করব কেন? তিনি তো মারা যাননি। তিনি আমার অন্তরে রয়েছেন। তাঁর তো মৃত্যু হয়নি। হি ইজ ইনসাইড মি। এত বিপুল কাজ তিনি করে গেছেন, তাঁর মারা যাওয়ার মতো সময় কোথায়?

সমকাল: বাংলাদেশের মানুষ আপনার কণ্ঠের ভীষণ ভক্ত। আমরা যখন 'সীমাবদ্ধ' সিনেমাতে দেখি যে আপনি কথা বলছেন, অনুপ্রেরণা দিচ্ছেন তখন শিহরণ জাগে। এখনও ফেসবুকে সেই ভিডিও ভাইরাল। আপনি কি কণ্ঠের কোনো যত্ন নেন?

বরুণ চন্দ: না আমি কোনো যত্ন নিই না। একজন আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আচ্ছা আপনি কি কণ্ঠের জন্য কোনো রেওয়াজ করেন? আমি তাঁকে বলেছিলাম, হ্যাঁ, আমি প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলায় বরফ দিয়ে একটু মদ খাই। মজা করলাম। কিছু করি না আমি কণ্ঠের জন্য।

সমকাল: আমার শিক্ষার্থীরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ে। এ ছাড়া বাংলাদেশের মিডিয়া স্টাডিজ শিক্ষার্থীদের জন্য কণ্ঠের চর্চাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের যদি আপনি কিছু বলতেন। তাঁরা কীভাবে কণ্ঠের যত্ন নেবে?

বরুণ চন্দ: আমি জানি না। আমার আসলেই ধারণা নেই। সবাই নিজ নিজ কাজ ঠিকঠাক রাখলেই হয়। আমার অভিনয়, কণ্ঠ এগুলো নিয়ে হয়তো বাড়তি আবেগ কাজ করে। আমি অতটা দক্ষ কি?

সমকাল: কিন্তু বলা হয় আপনার কণ্ঠে সরস্বতী অধিষ্ঠিত।

বরুণ চন্দ: আমার কণ্ঠে সরস্বতী? ধন্যবাদ, অনেক অনেক ধন্যবাদ।

সমকাল: তাহলে এটা আপনার জন্মগত গুণ ধরে নেওয়া যায়?

বরুণ চন্দ: যদি ভাবেন, তাই।

সমকাল: এই মুহূর্তে সত্যজিৎ রায় যদি বেঁচে থাকতেন তাহলে আপনার কী মনে হয়, কী করতেন তিনি আপনাকে নিয়ে? কোনো সিনেমা?

বরুণ চন্দ: আমি জানি না তিনি কী করতেন। যদি সিনেমা করতে চাইতেন অনেক আগেই করতে পারতেন। করেননি। কিন্তু যা করেছেন তাই জীবনভর থেকে যাবে। আমাকে ওই একটা সিনেমাতেই ডেকেছেন। আমি ওতেই সন্তুষ্ট।

সমকাল: আপনার জন্মস্থান ঢাকা। বাংলাদেশ বা ঢাকা বলতে আপনার কোন স্মৃতিটা সবচেয়ে বেশি ভেসে ওঠে?

বরুণ চন্দ: ঢাকার বাড়ি খুব ভালো করে মনে আছে। সেই বাড়ির এখন আর কিচ্ছু নেই। সেখানে এখন বইপাড়া হয়ে গেছে জয়চন্দ্র ঘোষ লেন। ৬ নম্বর বাংলাবাজার।

সমকাল: চট্টগ্রাম কখনও গিয়েছেন?

বরুণ চন্দ: না, যাওয়া হয়নি।

সমকাল: চট্টগ্রাম তো বিপ্লব তীর্থ। আপনাকে চট্টগ্রামে স্বাগত জানাচ্ছি। আমার শিক্ষার্থীদের জন্য যদি কিছু বলতেন?

বরুণ চন্দ: ধন্যবাদ। আপনারা সুস্থ থাকুন। ভালো থাকুন। ভবিষ্যতে যেন দেখা হয়। ফোনালাপ না হয়ে চাক্ষুষ যেন কথাবার্তা বলতে পারি।

সমকাল: আপনার সুস্থতা কামনা করি এবং অবশ্যই অবশ্যই শতায়ু কামনা করি।

বরুণ চন্দ: বাংলাদেশ ও চট্টগ্রামের সবাইকে আমার নমস্কার, ভালোবাসা। দেখা হবে সবার সঙ্গে।

সমকাল: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

বরুণ চন্দ: আপনাকেও। সমকালের জন্য শুভকামনা।