এই ভূখণ্ডে বিদেশি শোষকদের আসার পেছনে উদ্দেশ্য ছিল বহুবিধ। তারা ছক কষেই এসেছিল এবং খালি হাতে আসেনি, সঙ্গে করে নিজেদের মাতৃভাষা নিয়ে এসেছিল এবং যেমনটা করার কথা তা-ই তারা করেছে। নিজেদের ভাষাকে রাজভাষা করেছে। দখলদারিত্বের সেটাও একটা পদ্ধতি বটে। এই কাজে বিশেষ দক্ষতা দেখিয়েছে সর্বশেষ যে শাসক ছিল সেই ইংরেজরা। তারা বিস্তর অভিজ্ঞতা ও প্রচুর বুদ্ধি নিয়ে এসেছিল। দখলদারিত্বকে চিরস্থায়ী করার পরিকল্পনায় তারা আইন-আদালত, সেনাবাহিনী ও পুলিশ, ব্যবসা-বাণিজ্য, আমলাতান্ত্রিক প্রশাসন এসব কিছু চাপিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে আপাতনিরীহ কিন্তু ভেতরে ভয়ংকর যে আধিপত্যটি প্রতিষ্ঠা করেছিল, সেটা ভাষার। ভাষার সাহায্যে মন-মানসিকতায় উপনিবেশ স্থাপন করেছে, যে-ঔপনিবেশিকতা তাদের প্রকাশ্য প্রস্থানের পরেও কায়েম রয়েছে।

তাদের গড়া রাষ্ট্র ভাঙল, নতুন রাষ্ট্রকেও অর্থাৎ পাকিস্তানকেও ভাঙতে হলো, তার পরে সম্পূর্ণ ভিন্ন সম্ভাবনা নিয়ে আমরা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করেছি। এসব পতন-উত্থানে শাসক বদলেছে অবশ্যই, কিন্তু রাষ্ট্রের মূল চরিত্রে পরিবর্তন ঘটেছে বলা যাবে না। আইনকানুন, আমলাতন্ত্র, বিভিন্ন বাহিনীর কার্যকলাপ সবকিছুই চলছে ইংরেজের প্রতিষ্ঠিত সেই জনবিচ্ছিন্ন ও পীড়নমূলক ধারায়। রাষ্ট্রভাষা বদলেছে এটা একটা বড় অর্জন। কিন্তু রাষ্ট্রভাষা বাংলা হলেও রাষ্ট্রের ভাষা বাংলা হয়নি। সমাজেও সেই পুরোনো ইংরেজি ভাষার যতটা মর্যাদা, বাংলার ততটা নয়। অন্য প্রমাণ দরকার হয় না, রাজধানীতে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের সঙ্গে মফস্বলের বাংলা মাধ্যমিক স্কুলের তুলনা করলেই হাঁড়ির খবর জানা হয়ে যায়।

ভাষা তো কোনো যন্ত্র নয়, মন্ত্রও নয়, ভাষা হচ্ছে সংস্কৃতির জীবন্ত উপাদান। ভাষার ভেতর চিন্তা-চেতনা, ইতিহাস-ঐতিহ্য, দৃষ্টিভঙ্গি সবকিছুই সংগোপনে সংরক্ষিত থাকে। ইংরেজ শাসনে বাঙালি ইংরেজি শেখার বাধ্যবাধকতায় দ্বিভাষী হয়েছিল। ঘরে সে মাতৃভাষা ব্যবহার করেছে, বাইরে ইংরেজি এবং ইংরেজিকে সে যে বাইরে রেখে আসতে পেরেছে তা নয়, সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে, ঘরের ভেতরে। আনতে হয়। অর্জিত ভাষা জীর্ণ হয় অনভ্যাসে, কিন্তু যদি তার চর্চা থাকে তবে সে সজীব থাকে, যে কোনো প্রাণীর মতো। শিক্ষিত বাঙালি এখনও দ্বিভাষিকই রয়েছে। তবে একটা তফাত আছে তখনকার দ্বিভাষিকতা ছিল বাধ্যতামূলক, এখনকার দ্বিভাষিকতা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত। অস্বীকার করার কোনো উপায় আছে কি স্বেচ্ছাকৃত পরাধীনতা অনেক বেশি ভয়ংকর, কেননা তাকে ধরে নেওয়া হয় স্বাধীনতা বলে। ভাষা ক্ষমতা রাখে মাথা ঘুলিয়ে দেওয়ার; আমাদের ক্ষেত্রে দিয়েছেও, দেখতে পাচ্ছি।

রাষ্ট্র যে ধরনের প্রতিষ্ঠান তাতে তাকে পিতাই বলতে হয়। পুরোপুরি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ব্যাপারটা ভিন্ন, কিন্তু তেমন রাষ্ট্র বাস্তবে পাওয়া খুবই কঠিন। সমাজতান্ত্রিক বিশ্বেই যথার্থ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলা যায়, কেননা গণতন্ত্রের যে মূল ভিত্তি মানুষে মানুষে অধিকার ও সুযোগের সাম্য, তা সেখানে স্বীকৃতি পেয়েছিল এবং নাগরিকদের মৌলিক মানবাধিকারও অর্জিত হয়েছিল। কিন্তু ওই বিশ্বেও আমলাতন্ত্র ছিল, যে আমলাতন্ত্রই মূল কারণ সোভিয়েট ইউনিয়নের পতনের। রাষ্ট্রকে পিতা ভাবলে সমাজকে মাতা ভাবা যায়। সমাজ নাগরিকদের আশ্রয় ও প্রশ্রয় দেয়। কিন্তু সমাজ তো স্বাধীন নয়। সে তো রাষ্ট্রের অধীনে থাকে। শাসিত অর্থাৎ শোষিত হয় এবং রাষ্ট্র ও তার কর্তাদের যে আদর্শ তা চাপিয়ে দেওয়া হয় সমাজের ওপর। বাংলাদেশের সামাজিক ইতিহাস এর প্রমাণে আকীর্ণ।

সমাজের ভাষা ছিল বাংলা, রাষ্ট্রের ভাষা অন্যকিছু। ব্যবস্থাটা এ রকমের ছিল। সমাজের অভ্যন্তরে যে অসংখ্য পরিবার বিদ্যমান সেই পরিবারগুলোও একেকটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র বটে। সেখানেও পিতার একাধিপত্য, স্বৈরাচার। সেখানেও পিতার ভাষায় সঙ্গে মাতার ভাষার একটা পার্থক্য আছে। পিতা কথা বলেন কর্তার মতো, মাতার কথাবার্তা পালকের। পিতা ধমক দেন, মাতা আদর করেন। পিতা বাইরে থেকে অপমানিত হয়ে এসে শোধ তোলেন ঘরে। পিতা বড় জগৎকে জানেন, ভান করতে পারেন আন্তর্জাতিকতার, জ্ঞান রাখেন নানা বিষয়ে, কিন্তু মাতা থাকেন পাশের ঘরে, বড়জোর উঠানে, তাঁর জগৎটা ক্ষুদ্র, বিচ্ছিন্ন, সংকীর্ণ। মাতা পিতার কর্তৃত্বকে মেনে নেন, কেননা পিতা হচ্ছেন কর্তা, তিনি উপার্জন করেন, তাঁর টাকায় সংসার চলে। মাতাও গোপনে চান পিতার মতো হবেন, কিন্তু সাহস রাখেন না ইচ্ছাটাকে স্পষ্ট করার। সন্তানদের পিতার মতো করে তুলতে চান; যে পিতা আসলে পুরোপুরি পিতা নন, কেননা তিনি পরাজিত বিদেশিদের হাতে, অধীন তিনি রাষ্ট্রের এবং রাষ্ট্র অতীতে ছিল সরাসরি বিদেশিদের হাতের মুঠোয় এবং এখন স্বাধীন হয়েও স্বাধীন হয়নি, নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার।

পিতার মতো নয় কেবল, মাতা নিজের মতো করে গড়ে তুলতে চান সন্তানকে, বিশেষ করে পুত্রকে। পুত্রের মধ্যে মায়ের কাছ থেকে পাওয়া ভয় সন্দেহ বিচ্ছিন্নতা সংকীর্ণ সবকিছু অনুপ্রবিষ্ট নয় শুধু, মির্মমভাবে বিকশিতও হয়। মাতার নিরীহতায় পিতাও কিছু পরিমাণে নেমে আসেন, অংশভাগী হন মাতার রক্ষণশীলতার। কন্যারা মায়ের মতো হয়। পিতার হাতে লাঞ্ছনার বদলা নিতে গিয়ে মা হাতের কাছে তাঁর পুত্রবধূকে খুঁজে পান এবং তাঁর ওপরই সঞ্চিত লাঞ্ছনার কারণে তৈরি হয়েছে যত ঝাল, পারলে তার সবটাই ঝেড়ে ফেলতে চেষ্টা করেন। ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে অন্তঃপুরচারিণী প্রতিহিংসা চরিতার্থকরণের এই প্রক্রিয়া; মাতার হাতে আবদ্ধ হয় সন্তান, অল্প করে হলেও আবদ্ধ হন পিতা। বন্দি পরিণত হন কারারক্ষীতে।


পিতা ব্যর্থ হয়েছেন, কিন্তু মাতা হননি, এটা বলা যাবে। কৃষিনির্ভর সমাজে মাতার প্রধান কর্তব্য সন্তান উৎপাদন ও প্রতিপালন। সে-কাজ বাঙালি মাতা নিষ্ঠার সঙ্গে করেছেন। এ দায়িত্ব পালনকে পিতার জুলুম হিসেবেও দেখা যেতে পারে। দেখাটা মোটেই অন্যায় নয়। মাতৃত্বের ব্যাপারে মায়ের কর্তব্যপরায়ণতা জনসংখ্যা বৃদ্ধি করেছে এবং দেখা গেছে, বাঙালি সংখ্যায় যত বাড়ছে, গুণে তত বাড়ছে না। পরিমাণ যে উৎকর্ষে পরিণত হবে, তাও সম্ভব হচ্ছে না। মাতার এও এক প্রতিশোধ গ্রহণ বটে পিতার ওপর।

ভবিষ্যতে কী ঘটতে যাচ্ছে- বড় প্রশ্ন সেটাই। আশার জায়গাটা পিতা নন, আশার জায়গাটা হচ্ছে সন্তানরা। পিতারা যা করার করে ফেলেছেন, যা দেওয়ার তা দিয়ে দিয়েছেন। বাকি কাজটা সন্তানদেরই করতে হবে। পিতার ব্যর্থতার দায়ভার এবং ক্ষতিপূরণের দায়িত্ব সন্তানকেই গ্রহণ করতে হয়; নিয়ম সেটাই। সেই সন্তানদের মধ্যে ছেলেরা আছে, মেয়েরাও রয়েছে; যেমন তারা উভয়েই ছিল আমাদের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে। বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের। সে আন্দোলন ছিল পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং কর্তৃত্বকামী নেতৃত্ব উভয়ের বিরুদ্ধে। ভাষার মধ্যে যে সমাজতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ও সম্ভাবনা বিদ্যমান, তাকেই বিকশিত করতে চেয়েছিল ওই আন্দোলন। পারেনি নিশ্চয়ই, থেমে গেছে এক জায়গায় এসে, যার পরিচয় দেখি আমরা যেমন নারীর অবরুদ্ধ দশায় এবং অর্থনীতির বন্ধ্যত্বে, তেমনি দেখি বাংলা ভাষার কোণঠাসা অবস্থায়।

মূল সংগ্রামটা পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে। এই সংগ্রাম পৃথিবীর সব দেশে চলেছে। অতীতে সিয়াটলে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার সম্মেলনকালে যে বিক্ষোভ দেখেছি, তেমন বিক্ষোভ এখন সব দেশেই ঘটবে। বিদ্যমান বাস্তবতা এবং মানুষের বিক্ষোভ সে কথাই বলে। গণতন্ত্রের সংগ্রাম কেবল ভোটের জন্য নয়, ভাষার জন্যও। একুশে ফেব্রুয়ারি যে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে তার পেছনে বিশ্ববাসীর বাংলা ভাষাপ্রীতি নেই অবশ্যই, কিন্তু মাতৃভাষাপ্রীতি যে রয়েছে তাতে তো কোনো সন্দেহ নেই। ওই প্রীতি সংকীর্ণতার ছবি নয়, আন্তর্জাতিকতার ছবি বটে। বলা বাহুল্য, আন্তর্জাতিকতা ও বিশ্বায়ন এক নয়, আসলে পরস্পরবিরুদ্ধ। বিশ্বায়নকে প্রত্যাখ্যান না করলে আন্তর্জাতিকতা গড়ে উঠবে না। যেমন নয় মনে, তেমনি নয় অর্থনীতিতেও।

ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়