বাংলাদেশে বাংলা ভাষায় যে শব্দগুলো আমরা দৈনন্দিন জীবনে সর্বাধিক ব্যবহার করে থাকি, তার মধ্যে দুর্নীতি মনে হয় অন্যতম। অন্যদিকে, আমার বর্তমান কর্মস্থল ফিনল্যান্ডে দুর্নীতি শব্দটি কালেভদ্রে ব্যবহূত একটি শব্দ। এর কারণ হতে পারে ফিনল্যান্ড বিশ্বের কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে একটি, যা সর্বদা পাঁচটি সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকার শীর্ষে থাকে। বিপরীত দিকে, বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর সম্মুখ সারিতে অবস্থান করে। ব্যাপক অর্থে, নীতিবহির্ভূতভাবে করা কোনো কাজকে দুর্নীতির কাতারে ফেলা হয়। দুর্নীতির ব্যাপকতার দিক দিয়ে বিচার করলে বলা যায়, দুর্নীতি বাংলাদেশকে গ্রাস করে ফেলেছে। কোনোভাবেই বলছি না যে, বাংলাদেশে কোনো সৎ মানুষ নেই। অবশ্যই আছে। পাঠক, আপনি একটু ভেবে দেখুন, আপনি সর্বশেষ কখন কোন দুর্নীতি করেছেন বা কতদিন হলো আপনি কোনো দুর্নীতি করেননি? এটাও একটু ভেবে দেখুন, আপনি কি কখনও কোনো দুর্নীতির প্রতিবাদ করেছেন? সর্বশেষ এটা ভাবুন তো, কারও কোনো দুর্নীতি দেখলে বা শুনলে আপনার মানসিক অবস্থা কেমন হয়?

দুর্নীতির ব্যাপকতার দিক দিয়ে বিচার করলে মনে হয়, দুর্নীতি আমাদের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। জ্ঞানীগুণী অনেকভাবে সংস্কৃতির সংজ্ঞা দিয়েছেন। সেগুলো নাই বা বললাম।

সংস্কৃতি বলতে সাধারণভাবে বোঝায় একটি জাতির আদর্শ এবং মূল্যবোধের সমষ্টি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, দুর্নীতি আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে পরস্পরবিরোধী নয়; আমাদের আদর্শ ও মূল্যবোধের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আমরা দুর্নীতিকে অনেকটাই মেনে নিয়েছি, এর ভয়াবহ পরিণতির কথা জেনেও। দুর্নীতি উন্নয়নকে গ্রাস করে; একটা জাতিকে দরিদ্র থাকতে সহায়তা করে; মানুষকে অধিকারবঞ্চিত করে এবং সমাজে সম্পদের অসম বণ্টন ঘটায়; সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। তাই দুর্নীতির সাংস্কৃতিক শৃঙ্খলকে ভাঙতে হবে। এ জন্য দরকার নিজে দুর্নীতি না করা, অন্যকে দুর্নীতিতে নিরুৎসহিত করা, দুর্নীতির প্রতিবাদ করা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ঐকমত্য সৃষ্টি, দুর্নীতি দমন প্রতিষ্ঠান দুদককে শক্তিশালীকরণ এবং দুর্নীতির নেতিবাচক ফলাফল সম্পর্কে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত আলোচনা করা। সবাইকে বুঝতে হবে উন্নয়ন এবং দুর্নীতি একসঙ্গে চলতে পারে না; চলার কথাও নয়।

দুর্নীতির পেছনে সম্ভাব্য অনেক কারণ থাকতে পারে। তবে এর প্রধান কারণগুলো হতে পারে- ১. প্রয়োজন, ২. লোভ, ৩. সুযোগ, ৪. অভ্যাস, ৫. প্রশাসনিক দুর্বলতা, ৬. রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং ৭. বিচারহীনতার সংস্কৃতি। দুর্নীতির এসব কারণ সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করা কিন্তু লেখার মূল উদ্দেশ্য নয়। এ লেখার আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টিদের দুর্নীতির ওপর আলোকপাত। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি কেনায় ৩০৩ কোটি ৮২ লাখ টাকার দুর্নীতি করায় দুদকের মামলায় বর্তমানে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের চার ট্রাস্টি কারাগারে আছেন। এই চার ট্রাস্টি উচ্চ আদালতে আগাম জামিন নিতে গিয়েছিলেন। উচ্চ আদালত তাঁদের আগাম জামিন না দিয়ে বরং পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন। স্যালুট জানাই উচ্চ আদালতকে।

আমাদের দেশে কামার-কুমার, জেলে-তাঁতি বা কৃষক-শ্রমিক কিন্তু দুর্নীতি করে না। দুর্নীতি করে ওপরতলার মানুষ। কথায় আছে- মাছের পচন ধরে মাথা থেকে। এমনটাই ঘটেছে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে। যে চারজন ট্রাস্টি দুর্নীতির মামলায় কারাগারে আছেন, তাঁরা সবাই ১. সমাজের ওপরতলার মানুষ, ২. প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, ৩. অঢেল অর্থসম্পদের মালিক, ৪. শিক্ষিত, ৫. এক নামে তাঁদের অনেকে চেনেন, ৬. তাঁরা ভালো কাপড়-চোপড় পরেন, ৭. ভালোভাবে কথাবার্তা বলেন, ৮. দামি গাড়িতে চড়েন এবং ৯. নামিদামি মানুষের সঙ্গে ওঠবস করেন। মোদ্দা কথা, তাঁরা সমাজপতি। উল্লিখিত দুর্নীতির কারণগুলো পর্যালোচনা করলে বলা যায়, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টিদের দুর্নীতি আর্থিক প্রয়োজনের তাগিদে হয়নি বরং এ দুর্নীতি হয়েছে লোভ, সুযোগ, অভ্যাস বা নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দুর্বলতা বা এগুলোর একাধিক কারণে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি কেনার ৩০৩ কোটি ৮২ লাখ টাকার দুর্নীতির মামলায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের যে চারজন ট্রাস্টি বর্তমানে কারাগারে আছেন; তাঁরাসহ এ মামলায় অভিযুক্ত সবাই উপযুক্ত শাস্তি পান, এটাই এখন আমাদের প্রত্যাশা। এভাবে বন্ধ হবে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি। আমরা উন্নত জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে পরিচিত হতে চাই। দুর্নীতিকে আমরা দমন করতে চাই। সমাজ থেকে দুর্নীতি দূর করার সংক্ষিপ্ত কোনো পথ নেই। এ জন্য গ্রহণ করতে হবে স্বল্প, মধ্যম এবং দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ। ক্ষমতা এবং দুর্নীতির মধ্যে একটা নিবিড় সম্পর্ক আছে বাংলাদেশে। তাই ক্ষমতাধর ব্যক্তি যাঁরা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত তাঁরা কঠোর শাস্তি পেলে সমাজে দুর্নীতি এমনিতেই কমতে শুরু করবে। গ্রামবাংলায় একটা প্রবাদ প্রচলিত- ঝিকে মেরে বউকে শেখানো। দুর্নীতিবিরোধী কঠোর আইন প্রণয়ন করে কিছু দুর্নীতিবাজকে এমন শাস্তি দিতে হবে, যেন তা দেখে অন্যরা দুর্নীতি করতে আর সাহস না পায়। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের যে চারজন অভিযুক্ত ট্রাস্টি বর্তমানে কারাগারে আছেন; অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁদের দেওয়া হোক কঠোর সাজা। সামাজিকভাবে তাঁদের বর্জন করা হোক। সুদ-আসলে তাঁদের দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ ফেরত এনে শিক্ষার উন্নয়নে ব্যয় করা হোক।

দুর্নীতি, অর্থ পাচার, দুর্নীতির মাধ্যমে কোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিসাধন বা প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকের ক্ষতিসাধনের মতো অপরাধের শাস্তি কঠোর করতে হবে। এসব অপরাধে অভিযুক্তদের জামিনের ব্যাপারেও আদালতকে কঠোর অবস্থানে যেতে হবে। অভিযুক্ত যদি অপরাধী হিসেবে প্রমাণিত হয় এবং তার যদি আর্থিক সামর্থ্য থাকে, তাহলে অপরাধীর কাছ থেকে বিচার এবং তদন্ত প্রক্রিয়ার সমুদয় খরচ আদায় করতে হবে। এভাবে অপরাধীর অপরাধ করার প্রবণতা কমবে। বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা পরিবার, যৌথ পরিবার এবং আত্মীয়তার আবর্তে ঘোরে। এমন সমাজ ব্যবস্থায় একজনের দুর্নীতিতে অতি সহজেই পরিবার বা আত্মীয়স্বজন অংশগ্রহণ করেন। তাই যে কারও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ উদ্ধারে তার পরিবার বা আত্মীয়স্বজনেরও সম্পদ বিবরণী তলব অতি আবশ্যক। এই মুক্ত বিশ্বায়নের যুগে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ অতি সহজেই বিদেশে পাচার করা সম্ভব। তাই আমাদের উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানো উচিত পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার জন্য। শীতপ্রধান, বছরে সাত মাস বরফে ঢেকে থাকা ফিনল্যান্ড আজ যে এত সম্পদশালী দেশে পরিণত হয়েছে, তার অন্যতম কারণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের জিরো টলারেন্স। বাংলাদেশও এগিয়ে যেতে পারবে; পরিণত হতে পারবে একটি সম্পদশালী উন্নত দেশে, তবে দুর্নীতিকে সঙ্গে নিয়ে নয়, দুর্নীতিকে ত্যাগ করে। আসুন আমরা সবাই দুর্নীতিকে 'না' বলি। উপযুক্ত সাজা হোক দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চার ট্রাস্টিসহ এ দুর্নীতিতে জড়িত সবার।

ড. কাজী ছাইদুল হালিম: শিক্ষক ও গবেষক