২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে কোর্সমেট জানাল, এলআরএসের (লজিস্টিক রেকি অ্যান্ড সার্ভে) জন্য মালিতে যেতে হবে। পরদিন অফিসে গিয়ে দাপ্তরিক পত্রটি হাতে নিতেই দেখলাম ১৫ জনের একটি দল মালির কয়েকটি জায়গায় যাবে। আমার গন্তব্য সাহারা মরুভূমি-সংলগ্ন কিদাল নামের একটা জায়গা। তুরস্কে ট্রানজিট নেওয়ায় ইস্তাম্বুল শহরটাও একনজর দেখা হয়ে গেল। মনোমুগ্ধকর এক অভিজ্ঞতা। অবশেষে মালির রাজধানী বামাকোতে নামলাম। দু-এক দিনের মধ্যেই আমরা যাত্রা শুরু করলাম কিদাল সুপারক্যাম্পের উদ্দেশে। এতদিন কেবল বইপুস্তকেই পড়ে এসেছি সাহারা মরুভূমির কথা। কিদালের বুকে প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে পা রাখতে পেরে নিজের মধ্যে অন্যরকম এক আনন্দ অনুভব করছিলাম। শান্তিরক্ষার এক মহান ব্রত নিয়ে আমরা আজ নিজেদের প্রস্তুত করেছি। শক্তি আর সাহস জোগাল আমার সহযাত্রীরা।

মে ২০১৭। রাজধানী বামাকো থেকে ১২০০ কিলোমিটার দূরে গাও নামের প্রসিদ্ধ শহরের এয়ারপোর্টে এসে নামলাম আমরা। নিজেকে ঠিক বিশ্বাস করে উঠতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছে, অজস্র আগুনের ফুলকি এসে আমাকে চপেটাঘাত করে যাচ্ছে অনবরত। যেসব উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আমাদের অভিনন্দন জানাতে এয়ারপোর্টে এসেছেন, প্রখর রোদের মাঝে সবাইকে ঝাপসা দেখছিলাম। রোদের তাপ এতটাই তীব্র ছিল, চোখে অ্যাভিয়েটর সানগ্লাস (পাইলটদের সানগ্লাস) থাকা সত্ত্বেও এই ধুধু মরুভূমিতেও সরিষা ফুল দেখছিলাম। কিদাল সুপারক্যাম্পে এসে দায়িত্ব বুঝে নিতে না নিতেই রমজান মাস শুরু হয়ে গেল। সেই সঙ্গে শুরু হলো পুরোদমে কনস্ট্রাকশনের কাজ। মাথার ওপর উত্তপ্ত সূর্য আর মক ক্যাম্প প্রতিষ্ঠার কাজ জীবনকে ওষ্ঠাগত করে ফেলেছে। তার ওপর তীব্র পানির সংকট। সৈনিকরা এক দিন গোসলের পানি পায় তো অন্যদিন পায় না। আমরা কিদাল সুপারক্যাম্পে আছি, তা মোটামুটি মাসখানেক তো হয়ে গেল। দেখতে দেখতে গোটা ১৫ রোজা পার করে ফেলেছি। ক্যালেন্ডারের পাতায় তখন ৮ জুন ২০১৭। ঘড়ির কাঁটায় সন্ধ্যা ৬টা বেজে ১০ মিনিট। ফিল্ড মেসে বসে আছি। ইফতারের জন্য অপেক্ষা করছি। ১৫ মিনিট পরই আজান পড়বে। হঠাৎ একটি গোলা পড়ার শব্দ এলো কানে। বুঝলাম ক্যাম্পে আক্রমণ করা হয়েছে। মুহূর্তেই ওয়াকিটকি সেটে সতর্কবার্তা এলো ব্যাক স্টর্ম (হাইয়েস্ট লেভেল অ্যালার্ট টেস্ট)। প্রতিটি বিস্ফোরণ যেন নিজের অস্তিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছিল।

ইফতারের সময় পার হয়ে গেছে বেশ কিছুক্ষণ আগেই। প্রায় ১৫ ঘণ্টা রোজা রেখে তখনও ইফতার করতে না পারলেও নামাজ পড়ে নিলাম। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ৮টা বেজে ২০ মিনিট। পেরিমিটার ডিফেন্স থেকে ফিরে এলাম। বিপি হেলমেট খুলে অস্ত্রটা রাখলাম ডাইনিং টেবিলের পাশেই। ইফতারসামগ্রী সারি সারি সাজানো টেবিলে। অফিসাররা এক এক করে ঢুকছেন ফিল্ড মেসে। কেউই সেদিন ইফতারি করতে পারেননি। এখন আর ক্ষুধাও নেই কারও। জি-ফোর লজিস্টিক চিফ লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী এলেন। তাঁর সেক্টরের অফিসে ততক্ষণে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। এর পরও বহুবার ক্যাম্পে আক্রমণ হয়েছে। কিন্তু সেই দিনের সেই দুঃসহ স্মৃতি আজও আমাকে তাড়া করে ফেরে। মর্টার শেলিং আর কমপ্লেক্স অ্যাটাকের মধ্য দিয়ে মিশনের ১০ মাস শেষ করে ফেলেছি। রাজধানী থেকে প্রায় ১৬০০ কিলোমিটার দূরে আমাদের ব্যান ইঞ্জিনিয়ারের (কনস্ট্রাকশন) প্রধান ক্যাম্প। আমাদের একটি ক্যাম্প আগুলহক নামক স্থানে, যা কিদাল থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে। কিদাল ও আগুলহক ক্যাম্পে রসদ সরবরাহ হয়ে থাকে ৪৫০ কিলোমিটার দূরের গাও সুপারক্যাম্প থেকে। প্রতিবার আমরা একসঙ্গে দুই সপ্তাহের রসদ সংগ্রহ করি। রসদ আসে সড়কপথে। চার থেকে পাঁচ দিন লেগে যায় এই ৪৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে; তাও যদি কনভয় কোনো হামলার সম্মুখীন না হয়। বৈরী আবহাওয়া, অত্যন্ত নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং বিপদসংকুল পরিবেশে থেকেও ব্যান ইঞ্জিনিয়ারের সৈনিকরা একটু তাজা খাবারের আশা করতে পারে না। তবে আমাদের সৈনিকরাও অপ্রতিরোধ্য। মরুভূমির বুক চিরে তারা ফলিয়েছে সোনার ফসল- লাউ, কুমড়া, পুঁইশাক, লালশাক, বেগুন, কাঁচামরিচ, লেটুসসহ আরও অনেক বাহারি সবজির জোগান দিয়ে আসছে কন্টিনজেন্টের নিজ উদ্যোগে তৈরি এই সবজির বাগানগুলো।

রয়েছে পানির তীব্র সংকট। পানির অন্য কোনো উৎস না থাকায় জাতিসংঘের সরবরাহ করা পানি দিয়ে আমাদের জীবনযাপন করতে হয়। জাতিসংঘ প্রতিদিন আমাদের ৪ হাজার লিটার পানির জোগান দেয়। এই পানি দিয়েই পুরো ক্যাম্পের খাওয়া-দাওয়া, ধোয়া-মোছা, অজু, গোসলসহ দৈনন্দিন সব কাজ করতে হয়। খাওয়ার জন্য আলাদা করে কোনো বোতলজাত পানি আমরা পাই না। পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কতই না কৃচ্ছ্র সাধন করে সৈনিকরা! অজুর পানি নষ্ট হতে দেয় না। মার্চ ২০১৭ থেকে মার্চ ২০১৮ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে সর্বমোট ৮০ দিনের মতো রসদ সরবরাহ স্থগিত ছিল কিদাল সুপারক্যাম্পে। এর মধ্যে ২০১৭ সালে একনাগাড়ে ২ থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত এবং ২০১৮ সালে ৮ থেকে ২৩ জানুয়ারি পর্যন্ত দীর্ঘদিনের জন্য রসদ সরবরাহ বন্ধ ছিল। অতিরিক্ত রসদ সংরক্ষণের কোনো উপায় না থাকায় রসদহীন দিনগুলো হয়ে ওঠে অসহনীয়। অবর্ণনীয় সেই দুর্ভোগের কথা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে স্থানীয় বাজার থেকে কেনাকাটা করার সুযোগও ছিল খুবই সীমিত। বিরানভূমিতে লোকালয় সেভাবে নেই। স্থানীয় বাজার বলতেও তেমন কিছুই নেই। তার পরও কমপক্ষে দুই মাস চালানোর মতো চাল আর শুকনো খাবার সব সময় গুদামজাত করে রাখি। বিপত্তিটা বাধে তাজা রসদ নিয়ে।

২০১৭ সালের ১৭ আগস্ট। রেশনের গাড়ি এসেছে ক্যাম্পে। সৈনিকদের মধ্যে যেন ঈদ লেগেছে। প্রতিটি রেশন সরবরাহের দিনই সৈনিকদের কাছে যেন ঈদের দিন। সিএসএম (কোম্পানি সার্জেন্ট মেজর) নিজেই নেমে পড়েছেন রেশন আনলোডিংয়ের কাজে। লজিস্টিক ক্লার্ক খুব তৎপর; পুঙ্খানুপুঙ্খ মিলিয়ে নিচ্ছেন রেশন ডেলিভারির নোট। মাথার ওপর প্রচণ্ড রোদ। তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি তো হবেই। আরও বেশি হতে পারে। ক্যাম্পের জায়গার স্বল্পতার কারণে কনটেইনারগুলো একটির ওপর আরেকটি রাখা হয়েছে। ধূলিঝড়ের প্রকোপে ওপরের কয়েকটা কনটেইনার ভূপতিত হয়েছে। ততক্ষণে আমরা নিরাপদে বাঙ্কারে গিয়ে অবস্থান নিয়েছি। বলে রাখা ভালো, নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে মিশনের অন্যান্য কন্টিনজেন্টের মতো আমরা কোরিমেক স্থাপন করতে পারিনি। বাসস্থান আমাদের সুরক্ষিত বাঙ্কার। এই প্রচণ্ড ধূলিঝড়ের মধ্যেও ডিউটি পোস্টগুলোতে অতন্দ্র প্রহরীর মতো ডিউটি চালিয়ে যাচ্ছে আমাদের সেনাসদস্যরা।

মরুর বুকে ঝড় যে কত তীব্র ভয়ংকর আর বিধ্বংসী হতে পারে, তা সাহারা মরুভূমিতে না এলে কখনোই জানা যেত না। শুধু পুঁতে রাখা মাইন কিংবা অতর্কিত ক্যাম্প হামলাই নয়, প্রকৃতির বৈরিতার সঙ্গে যুদ্ধ করেও এখানে বাঁচতে হয় আমাদের। পরের দিন সকালে সিকিউএমএস (কোম্পানি কোয়ার্টার মাস্টার সার্জেন্ট) এসে রিপোর্ট দিলেন, 'স্যার, গতকাল যে রসদ সরবরাহ করা হয়েছে, তার মধ্যে পেঁয়াজ থেকে পানি ঝরছে। পেঁয়াজ অল্পদিনেই নষ্ট হয়ে যায়।' বললাম, বেটে সংরক্ষণ করতে। যদি সবকিছু ঠিকঠাক থাকে পরবর্তী রসদ সরবরাহ আসতে ১৫-২০ দিনের মতো লেগে যাবে। রসদ আসে গাও-আনফিস হয়ে কিদাল লজিস্টিক কনভয়ের সঙ্গে। সাধারণত ব্যানব্যাটের শান্তিরক্ষীরা এই কনভয় পাহারা দিয়ে নিয়ে আসে। এই বিপদসংকুল আর বন্ধুর পথে ছড়ানো-ছিটানো থাকে বিভিন্ন রকম আইইডি আর মাইন। পথে অতর্কিত আক্রমণের আশঙ্কা তো থাকেই। গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে এ রকমই একটা লজিস্টিক কনভয় (রসদের বহর) আনতে গিয়ে গাও-আনফিস-কিদাল পথে আগে থেকে পুঁতে রাখা আইডিডি বিস্ম্ফোরিত হয়ে প্রাণ দিয়েছেন ব্যানব্যাটের চার শান্তিরক্ষী। গুরুতর আহত অবস্থায় আমারই কোর্সমেট মেজর জাদিদ এখন সিঙ্গাপুর হাসপাতালের বিছানায় শয্যাশয়ী।

মার্চ ২০১৮। মিশনের প্রায় শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছি আমরা। বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের সময়ের ব্যবধান ছয় ঘণ্টা। তাই চাইলেও সব সময় দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয় না। এই তো কয়েক মাস আগে কার্পেন্টার জুনায়েদের বউ মারা গেল। মৃত স্ত্রীর শেষ সময়ে মুখে পানিও দিতে পারেনি জুনায়েদ। সৈনিক হারুনের সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুটির মুখ আর দেখা হলো না তার। জন্মের দুই দিন পরেই চলে গেল চির না ফেরার দেশে। বাবার সঙ্গে দেখা হলো না। প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার দূরে প্রিয়জনের মৃত্যুর সংবাদ শোকের ছায়া নামিয়ে আনে রুক্ষ মরুভূমির বুকে। তবু বুকে পাথর বেঁধে শান্তিরক্ষায় আমাদের ওপর ন্যস্ত সব দায়িত্ব অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে আমরা পালন করে যাচ্ছি।

মেজর শাহ্‌রীনা বিন্‌তে আনোয়ার, এসপিপি: জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে কর্মরত বাংলাদেশি সেনা কর্মকর্তা