চাঁদাবাজি ও দখলদারির মতো অপরাধে জড়িত হওয়ার কারণে গত এক যুগে ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ শাসক দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সংগঠনকে আমরা মাঝেমধ্যেই সংবাদের শিরোনাম হতে দেখেছি। এবার ওই একই কারণে সংবাদের শিরোনাম হলো শাসক দলের শ্রমিক সংগঠন জাতীয় শ্রমিক লীগ। শনিবার সমকালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আশপাশ এলাকার প্রতিবন্ধী রিকশাচালকদের সংগঠন 'প্রতিবন্ধী ঐক্য সমাজ'-এর নেতারা অভিযোগ করেছেন, জাতীয় শ্রমিক লীগ ঢাকা জেলার সভাপতি এমএ হামিদ মুন্না তাঁদের সংগঠনটি দখল করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। যদিও মুন্না সমকালের কাছে ওই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। প্রতিবন্ধী ঐক্য সমাজের নেতারা বলেছেন, ওই শ্রমিক লীগ নেতা ইতোমধ্যে তাঁদের প্রস্তাব দিয়েছেন, যদি তাঁকে তাঁর পছন্দমতো কমিটি গঠনের সুযোগ দেওয়া হয় তাহলে সংগঠনের নামে ঢাকায় ২০ একর জমি বরাদ্দ নিয়ে 'বঙ্গবন্ধুপল্লি' গড়ে তোলা হবে এবং একই সঙ্গে নেতাদের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হবে। শুধু তাই নয়, এ প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় মুন্না তাঁদের পেছনে সন্ত্রাসীও লেলিয়ে দিয়েছেন। প্রতিবেদনে প্রতিবন্ধী ঐক্য সমাজের নেতাদের উদ্ৃব্দত করে যেমনটা বলা হয়েছে, মুন্নার ইন্ধনে গত আট মাসে অন্তত চারজন প্রতিবন্ধীর ওপর ১০ বার হামলা চালানো হয়েছে। সেসব হামলায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতে কেউ কেউ গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন।

জানা গেছে, প্রতিবন্ধী ঐক্য সমাজের সদস্যসংখ্যা এখন ১২ শতাধিক। প্রত্যেকের কাছ থেকে মাসে ২০০০ টাকা চাঁদা নিলে মোট চাঁদার পরিমাণ দাঁড়াবে ২৪ লাখ টাকা। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, মুফতে আয়ের এত বড় সুযোগ ওই শ্রমিক লীগ নেতা হারাতে চান না। তাই প্রতিবন্ধী রিকশাচালকদের সংগঠনটি দখলের জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। তবে এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না, যদি সংগঠনটি বেদখল হয়ে যায় তাহলে একদিকে তা ধান্দাবাজদের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে, আরেকদিকে নিরীহ প্রতিবন্ধীদের কপাল পুড়বে। কারণ, তখন প্রতিবন্ধী রিকশাচালকদের শুধু যে কষ্টার্জিত আয়ের একটা অংশ দখলদারদের হাতে তুলে দিতে হবে, তা-ই নয়; ওই দখলদারদের দৌরাত্ম্যে তাঁদের সংগঠনটিই ছেড়ে দিতে হতে পারে। উল্লেখ্য, সরকার বিদ্যুতের অবৈধ ব্যবহার কমাতে এবং ত্রুটিপূর্ণ নকশাসহ বিভিন্ন কারণে সারাদেশে মহাসড়ক তো বটেই, প্রধান প্রধান সড়কেও ইঞ্জিনচালিত রিকশা বা অটোরিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করে রেখেছে। এ অবস্থায় ঢাকা শহরের পশ্চিমাঞ্চলের বিশেষ করে মোহাম্মদপুর, কামরাঙ্গীরচরের শারীরিক প্রতিবন্ধী রিকশাচালকরা উল্লিখিত 'প্রতিবন্ধী ঐক্য সমাজ' নামক সংগঠনটি গড়ে তুলে তার ব্যানারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন। মন্ত্রী তাঁদের বিশেষ বিবেচনায় যান্ত্রিক রিকশা চালানোর অনুমতি দেন। সংগঠনটি প্রতিবন্ধী রিকশাচালকরাই চালান এবং ইতোমধ্যে তাঁদের সদস্যসংখ্যাও অনেক বেড়েছে। অর্থাৎ সংগঠনটি প্রতিবন্ধী রিকশাচালকদের একতার প্রকাশ। কিন্তু মুন্নার মতো শ্রমিক নেতারা এর নেতৃত্বে এলে তাঁদের ওই একতার শক্তি আর থাকবে না। তখন তাঁদের ন্যায্য দাবি-দাওয়ার পক্ষে কথা বলার মতো কেউ থাকবে না।

আমরা মনে করি, শ্রমিক লীগ নেতার খপ্পর থেকে প্রতিবন্ধী রিকশাচালকদের বাঁচাতে পুলিশ প্রশাসনসহ সংশ্নিষ্ট সবার দ্রুত এগিয়ে আসা উচিত। মোহাম্মদপুর থানা পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রতিবন্ধী ঐক্য সমাজের নেতারা তাঁদের কাছে একটা ছাড়া আর কোনো হামলার বিষয়ে অভিযোগ করেননি। চারদিকে শাসক দলের পাতি নেতাদেরও যে দৌরাত্ম্য চলছে, তা দেখে কারও বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়- কেন প্রতিবন্ধী নেতারা শ্রমিক লীগ নেতার অনুসারীদের হামলার শিকার হয়েও থানা-পুলিশ করেননি। তবে যে অভিযোগ তারা পেয়েছে, তার ভিত্তিতেই পুলিশ তদন্ত চালিয়ে ওই অসহায় মানুষদের রক্ষায় এগিয়ে আসতে পারে। আমরা একই সঙ্গে শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবং আওয়ামী লীগ নেতাদেরও বিষয়টি খতিয়ে দেখে মুন্না ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানাই। তাঁদের মনে রাখতে হবে, মুন্নার মতো নেতারা যে অপকর্ম করছেন, তা যদি চলতে থাকে তাহলে শুধু যে আওয়ামী লীগ ও তার নেতৃত্বাধীন সরকারের ভাবমূর্তিই ক্ষুণ্ণ হবে না; এর জন্য আগামী নির্বাচনে তাদের চরম মূল্য দিতে হতে পারে।