মে মাসের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সপ্তাহজুড়ে সিলেট অঞ্চলে যে বন্যা দেখা দিয়েছিল, সেটা দৃশ্যত অনেকের কাছে নিছক 'পাহাড়ি ঢল' বিবেচিত হয়েছে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, বন্যার তোড় ও দীর্ঘকালীন জলাবদ্ধতায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দেশের প্রধান ফসলের মৌসুম বোরো ধানের বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের উৎপাদন ভয়াবহ ধাক্কার মুখে পড়েছে। দীর্ঘদিন পানির নিচে থাকায় পাকা ও আধা-পাকা ধান পচে দুর্গন্ধযুক্ত খড়ে পরিণত হয়েছে। ২৯ মে সমকালে এক হৃদয়বিদারক আলোকচিত্র ছাপা হয়েছে। সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের এক কৃষক কোমরপানিতে নেমে পচে যাওয়া ধান ছুঁয়ে দেখছেন। তাঁর চোখে রাজ্যের অবিশ্বাস ও অসহায়ত্ব।
এ তো গেল মাঠের চিত্র। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর দেখা যাচ্ছে মুখ ব্যাদান করে তাকিয়ে রয়েছে ক্ষত-বিক্ষত সড়ক, সেতু, বাঁধ ও অন্যান্য স্থাপনা। বন্যার আচ্ছাদনে সংঘটিত নদী ভাঙনেও ভিটেমাটিহারা মানুষের সংখ্যা কম নয়। ওই অঞ্চলের সংসদ সদস্য ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বুধবার তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলেছেন- 'স্মরণকালের অকল্পনীয় প্রাকৃতিক বিপর্যয়। বন্যায় পূর্ব সিলেট বিশেষ করে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে যে মারাত্মক ক্ষতিসাধন হয়েছে, তার তুলনা সাম্প্রতিককালে দেখা যায়নি। এর ফলে মানুষের ঘরবাড়ি, ফসলের ব্যাপক ধ্বংস ও ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট।'
প্রকৃতির আশীর্বাদ বন্যা বাংলাদেশের জন্য অভিশাপ হয়ে আসে কেন- এ প্রসঙ্গে প্রায়ই আমি মার্কিন লেখক টনি মরিসনের একটি আপ্তবাক্য ধার করে থাকি। বছর দুয়েক আগে প্রয়াত কৃষ্ণাঙ্গ এই লেখক মনে করতেন- নদীরও স্মৃতিশক্তি আছে। বন্যা আর কিছু নয়, নদীর সেই স্মৃতিকাতরতা মাত্র। তাঁর মতে- আমরা যখন নদীর স্বাভাবিক প্রবাহপথ কেড়ে নিই, তখন নদী দূরে সরে যায় বটে; ফেলে আসা দিনগুলোর মায়ায় বারবার ফিরে আসে বন্যা হয়ে। নিজের ভূমিতে ফেরার পথে যখন বাধা পায়, তখনই প্রলয়ঙ্করী হয়ে ওঠে। বন্যা হয়ে ওঠে সমাজ ও সভ্যতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশেষত সিলেটসহ দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা বা পাহাড়ি ঢল অস্বাভাবিক নয়। প্রাকৃতিক চক্রের কারণেই বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসে উজানে বৃষ্টির পানি গড়িয়ে ভাটিতে আসে। একই সময়ে ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা অববাহিকাতেও একই ধরনের বন্যা দেখা দিতে পারে। কিন্তু সেই বন্যা সবসময়ই সাময়িক; নদীপথ বেয়ে এসে দুই পাড়ের নিম্নাঞ্চলে তিন-চার দিন অবস্থান করে নদীতেই নেমে যায়। তাতে ফসল, ঘরবাড়ি ও স্থাপনার খুব একটা ক্ষতি হয় না। আরও আগে বৈশাখের শুরুতে বা মাঝামাঝিতে আগাম বন্যা আসতে পারে হাওরাঞ্চলে। হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের সংস্কার ও মেরামত চৈত্রের মাঝামাঝি সম্পন্ন করা যায়, যদি বৈশাখের মাঝামাঝি ধান কেটে ঘরে তুলে ফেলা যায়। ওই বন্যাতেও বিশেষ অসুবিধা নেই।
মৌসুমের প্রধান বন্যার আগে আগাম বন্যাগুলোর ক্ষেত্রে স্বাভাবিক সেই প্রাকৃতিক চক্র এবার কাজ করেনি। হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধগুলোর মেরামত ও সংস্কার যেহেতু সময়মতো সম্পন্ন হয়নি; বেশ কিছু হাওরের প্রায় পাকা ফসল একবেলার ঢলে কৃষকের চোখের সামনেই তলিয়ে গেছে। আবার জ্যৈষ্ঠের সূচনায় যে পাহাড়ি ঢল সুরমা ও কুশিয়ারা বেয়ে নেমে এলো, সেটাও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় রূপ নিল। বড় বন্যাতেও যেটা দেখা যায় না, এবার সেটাও ঘটেছে। খোদ সিলেট শহর বন্যার পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল। অথচ এই নগরী চট্টগ্রাম ছাড়া দেশের অন্যান্য নগরীর তুলনায় বেশি উচ্চতায় অবস্থিত। রয়েছে বেশ কিছু টিলা ও ছড়া। বন্যার পানিতে জলাবদ্ধতার প্রশ্নই আসে না। কিন্তু একদিকে সুরমা নদী ভরাট হয়ে যাওয়া, অন্যদিকে নগরীর মধ্যকার প্রাকৃতিক খাল বা ছড়াগুলো বেদখল, ভরাট ও সংকুচিত করে ফেলার কারণে জলাবদ্ধতাই অনিবার্য হয়ে পড়েছিল। আরও দুর্ভাগ্যের বিষয়, সিলেটের ছড়াগুলো সংস্কার কিংবা সুরমা খনন নিয়ে আক্ষরিক অর্থেই শত শত কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। কিন্তু কিছু মানুষের অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে নিতান্ত প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া কীভাবে বিপুল মানুষের জন্য দুর্যোগ ও দুর্ভোগ বয়ে আনতে পারে; সিলেট অঞ্চলে তার সর্বশেষ প্রমাণ আমরা পেলাম।
বস্তুত হিমালয়ের পাদদেশে হাজার নদীর আঁকিবুঁকি সমৃদ্ধ বঙ্গীয় ব-দ্বীপে বন্যা একটি অনিবার্য প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া মাত্র। প্রতিবছরই গ্রীষ্ফ্মের শেষার্ধ থেকে শরতের প্রথমার্ধে এক বা একাধিকবার বন্যা দেখা দেবেই। বিশ্বের অন্যতম প্রধান বৃষ্টিবহুল অঞ্চল উত্তর-পূর্ব ভারতে বর্ষাকালে যে বৃষ্টিপাত হয়, তা নদীপথে গড়িয়ে এসে সমতলের বাংলাদেশে বন্যা ঘটায়। বার্ষিক এই প্লাবন বঙ্গীয় ব-দ্বীপের ফসলি জমির উর্বরতা যেমন রক্ষা করে, তেমনই অভ্যন্তরীণ ভূমির উচ্চতা বাড়ায় ও উপকূলীয় ভূমির সম্প্রসারণ ঘটায়। নদীর সঙ্গে জলাভূমির সম্পর্ক রক্ষা করে; মৎস্যসম্পদের আবাসন ও প্রজনন প্রক্রিয়াও সুরক্ষিত রাখে। কিন্তু এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় মনুষ্যসৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা কীভাবে জীবন ও সম্পদবিনাশী হয়ে উঠতে পারে; প্রায় প্রতিবছরই কমবেশি সে চিত্র দেখা যায়।
দেশে বন্যার ঝুঁকি আপাতত অবশ্য কেটে গেছে। বিভিন্ন নদী অববাহিকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের যে ১১২টি পানিস্তর পরিমাপক স্টেশন রয়েছে; বৃহস্পতিবার এই নিবন্ধ লেখার সময় তার সব সূচকই সবুজ দেখাচ্ছে। পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের ওয়েবসাইটের বন্যা মানচিত্রে চার রঙের সূচক থাকে। সূচকের রং 'সবুজ' মানে নদীপ্রবাহ স্বাভাবিক; বন্যার ঝুঁকি নেই। নদীর প্রবাহ যদি বাড়তে শুরু করে এবং বিপৎসীমার নিচেই থাকে, তাহলে সূচকের রং হবে 'হলুদ'। বিপৎসীমায় পৌঁছলে বা বন্যা দেখা দিলে সূচকগুলো 'কমলা' রং ধারণ করবে এবং প্রবল বন্যা দেখা দিলে 'লাল' হয়ে যাবে। মাত্র সপ্তাহখানেক আগেও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মেঘনা অববাহিকা এবং উত্তরাঞ্চলের ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় পানিস্তর পরিমাপক স্টেশনগুলোর সূচক ছিল লাল ও কমলা। মধ্যাঞ্চলের সূচকগুলো ছিল হলুদ। এখন যখন সব সূচকই সবুজ, তখন কি আমরা আশ্বস্ত হবো?
মনে রাখা জরুরি, মৌসুমের প্রধান বন্যা এখনও বাকি। বর্ষাকাল আসন্ন, তখন একযোগে যখন গঙ্গা, যমুনা ও মেঘনা অববাহিকায় বর্ষণ বেড়ে যাবে, তখন সেই বন্যা আসবে। কখনও কখনও সেই বন্যা প্রাকৃতিকভাবেই প্রলয়ঙ্করী হয়ে ওঠে। অনেকে বলেন, সেই বড় বন্যারও একটি প্রাকৃতিক চক্র রয়েছে- প্রতি পাঁচ বছরে একবার আসে। সাম্প্রতিক অতীতে ১৯৮৮, ১৯৯৪, ১৯৯৮, ২০০৪, ২০০৭, ২০১৪, ২০১৭ সালে আমরা একটি করে বড় বন্যা দেখেছি। পাশাপাশি লক্ষণীয়, প্রতিবছর দেশজুড়ে বড় বন্যার আগে দফায় দফায় 'ছোট' বা আঞ্চলিক বন্যা হয়। সর্বশেষ বড় বন্যা ২০১৭ সালের পর ইতোমধ্যে পাঁচ বছর কেটে গেছে। আরেকটি বড় বন্যা আসন্ন কেবল এই কারণে নয়; অতীতের মতো এবার সিলেট ছাড়াও উত্তরবঙ্গে একাধিকবার স্থানীয়ভাবে বন্যা দেখা দিয়েছে। সিলেটের মতো রংপুর অঞ্চলেও কৃষকের ধান খেয়ে গেছে। এখন থেকে প্রস্তুতি নিলে পরিস্থিতি সামলানো সহজ হবে; বলা বাহুল্য।
মিথ্যাবাদী রাখালের গল্প আমরা জানি। বন্যাবাহিত দুর্যোগ মোকাবিলায় কিছু সত্যবাদী রাখাল প্রতিবছর সতর্কতা ও প্রস্তুতির কথা বলেন। নদী দখল, ভরাট বন্ধ করতে বলেন; বন্যার প্রাকৃতিক পথ মুক্ত রাখতে বলেন। কিন্তু দেশের দায়িত্বশীল পদে থাকা আধুনিক গ্রামবাসী সতর্ক হন না। দুর্ভাগ্যবশত এবারও একই চিত্র স্পষ্ট। বরং ছোট বন্যায় বড় ক্ষতি ইতোমধ্যে হয়ে গেছে। এখনও সতর্ক না হলে বড় বন্যায় বৃহত্তর বিপর্যয় অনিবার্যভাবেই অপেক্ষা করে থাকবে।
শেখ রোকন: লেখক ও গবেষক; মহাসচিব, রিভারাইন পিপল
skrokon@gmail.com