পদ্মা সেতু চালু হলে পর্যটন নগরী কুয়াকাটায় দেশি-বিদেশি পর্যটকের ঢল নামবে। এজন্য কুয়াকাটাকে শতভাগ পর্যটকবান্ধব করে গড়ে তোলার এখনই উপযুক্ত সময়। সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা হবে উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা (মাস্টারপ্ল্যান)। বাড়াতে হবে ট্যুরিস্ট স্পট। স্থানীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে আরও বিকশিত করা হবে।

'কুয়াকাটা ট্যুরিজম সেন্টার মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন সমস্যা ও সম্ভবনা' শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় এবং বরিশাল নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে মঙ্গলবার বিকেলে বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় মিলনায়তনে এই সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার মো. আমিন উল আহসান।

কর্মশালায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি এস.এম আক্তারুজ্জামান, পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ কামাল হোসেন, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিকল্পনাবিদ মো. আসাদুজ্জামান, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়কারী মো. রফিকুল ইসলাম, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের বরিশাল বিভাগীয় সদস্যসচিব কাজী এনায়েত হোসেন, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়কারী লিংকন বায়েন, কুয়াকাটা ট্যুরিস্ট গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবু কালাম মো. বাচ্চু প্রমুখ। এতে সভাপতিত্ব করেন বরিশালের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) খন্দকার আনোয়ার হোসেন।

সেমিনারে বরিশাল নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর সূত্র থেকে বলা হয়, ২০১৪ সালে কুয়াকাটা উন্নয়নের মাস্টারপ্ল্যান করা হয়। পর্যটকদের কাছে কুয়াকাটাকে আরও আকর্ষণীয় করতে ভাঙনের কবল থেকে সৈকত রক্ষায় বেড়িবাঁধ নির্মাণ, ট্যুরিস্ট স্পট বাড়ানো, মানসম্মত হোটেল-মোটেল ও খাবারসেবা নিশ্চিত করা, নিরাপত্তা ও বিনোদনের জন্য রাখাইন সংস্কৃতিকে পর্যটকদের কাছে তুলে ধরার উদ্যেগ গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়াও কুয়াকাটায় একটি স্টেডিয়াম, মেরিন পার্ক, এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন, ওয়াচ টাওয়ার, ফরেস্ট পিকনিক স্পট এবং রাখাইন মার্কেট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

বাপার বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়কারী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, কুয়াকাটায় সমীক্ষা চালিয়ে পরিবেশগত সংবেদনশীল এলাকা চিহ্নিত করা প্রয়োজন। নানাভাবে পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটার পরিবেশ বিপর্যস্ত। খাল ও বন সংরক্ষণ করা জরুরি। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে সব ধরনের উন্নয়নপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা উচিত।

সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের বিভাগীয় সদস্যসচিব কাজী এনায়েত হোসেন বলেন, প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্যে কুয়াকাটা সৈকত ও আশপাশের এলাকা বিপন্ন হয়ে পড়েছে। প্লাস্টিক বর্জ্য সাগরে পতিত হয়ে জলজ প্রাণীর মৃত্যু হচ্ছে। গত ৪-৫ মাসে একাধিক কচ্ছপ ও তিমিসহ জলজ প্রাণী মরে সৈকতে ভেসে এসেছে। তাই কুয়াকাটার উন্নয়নমহাপরিকল্পনার আওতায় সৈকতে এবং কুয়াকাটা পৌর শহরে পলিথিন ও প্লাস্টিক ব্যবহার নিষিদ্ধ অথবা প্লাস্টিক বর্জ্যের রিসাইক্লিনের ব্যবস্থা করা হোক।

বেলার বিভাগীয় সমন্বয়কারী লিংকন বায়েন বলেন, কুয়াকাটায় অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠছে নানা স্থাপনা। এজন্য সৌন্দর্য্য হারাচ্ছে দক্ষিণের অন্যতম এই পর্যটনকেন্দ্র। উন্নয়নে একটি বিভাগীয় কমিটি থাকলেও সেই কমিটির কোনো কার্যকারিতা নেই। সৈকত থেকে যথেচ্ছভাবে বালু উত্তোলনের ফলে ভাঙনের তীব্রতা বাড়ছে। বেড়িবাঁধের বাইরে গড়ে উঠছে অবৈধ স্থাপনা। গঙ্গমতি এলাকার খাসজমি বন্দোবস্ত দেওয়া বন্ধ করা না হলে মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে পড়বে।

বরিশাল নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিকল্পনাবিদ মো. আসাদুজ্জামান বলেন, পরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে কঠোর তদারকি প্রয়োজন। এজন্য পর্যটন সংশ্লিষ্টদের আরও সচেতন ও আন্তরিক হতে হবে। সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই কুয়াকাটায় উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, সুর্যোদয় এবং সুর্যাস্ত দেখার একমাত্র পর্যটন কেন্দ্র হচ্ছে কুয়াকাটা। পদ্মা সেতু চালু হলে রাজধানী ঢাকাসহ দেশী-বিদেশী পর্যটকের চাপ বাড়বে এখানে। তাই স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে কুয়াকাটাকে আরও পর্যটকমুখী করার উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে।

বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার মো. আমিন উল আহসান বলেন, পর্যটকদের চাপ বাড়ার পাশাপাশি ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হবে কুয়াকাটায়। সেজন্য কুয়াকাটাকে পর্যটকবান্ধব করতে মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। তাহলেই কুয়াকাটা হবে দেশের অন্যতম সেরা পর্যটন কেন্দ্র।