ভা রতের রাঁচি, হাওড়া ও কয়েকটি স্থানে গত শুক্রবার জুমার নামাজের পর প্রতিবাদ যেভাবে সহিংসতায় রূপান্তরিত হয়েছে, তা কমবেশি নিয়ন্ত্রণে এসেছে। যদিও এর ফলে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে পুলিশ আহত হয়েছেন; অন্তত তিনজনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং অনেকেই আহত হয়েছেন। এখনও গ্রেপ্তার না হওয়া বিজেপির সাবেক মুখপাত্রদের বিরুদ্ধেই এ প্রতিবাদ। তাঁরা যেভাবে মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক ও আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেছেন, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ যথার্থ এবং এ প্রতিবাদের কারণে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে যে ক্রোধ সৃষ্টি হয়েছে, তাও বোধগম্য। সহিংসতার ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন হলেও তা সংখ্যাগরিষ্ঠ সাম্প্রদায়িক শক্তি দ্বারা পরিচালিত, যারা অন্যদের অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার বিষয়টি চিন্তা না করে বরং আরও মেরূকরণ ও বিভাজনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সমাজের যৌক্তিক কণ্ঠস্বরগুলো এখনও সক্রিয় রয়েছে এবং গোঁড়া মৌলবাদীদের প্রতিহত করছে।
এটা সত্যি লজ্জাজনক, এমনকি দুই সপ্তাহ পার হওয়ার পরও বিজেপির সাবেক দুই মুখপাত্রকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা দিল্লি পুলিশ সাংবাদিক সাবা নাকবিসহ ৩২ জনের নাম উল্লেখ করে দুটি এফআইআর দাখিল করেছে। অথচ এ বিষয়ে তাদের হাতে কিছুই নেই। পুলিশ কর্তৃক এই নিন্দনীয় পক্ষপাতের মাধ্যমে এটা স্পষ্ট- বিজেপির মুখপাত্রদের এই গুরুতর অপরাধকে তারা তুচ্ছ হিসেবে দেখছে এবং শান্ত করতে সংঘের প্রচেষ্টা তাদের সমর্থন দিচ্ছে। আর দেরি না করে আইন অনুযায়ী তাঁদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে নাকবি ও অন্যদের বিরুদ্ধে দাখিল করা অসত্য এফআইআর প্রত্যাহার করা উচিত।
বিজেপি নেতারা আপত্তিজনক ও উত্তেজনাকর বক্তব্যের পরও যে দায়মুক্তির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন; তাতেই প্রমাণ- ভারতের মুসলমানরা ভারতের বর্তমান নেতৃত্ব ও সরকারের আমলে কতটা সমান নাগরিক স্বাধীনতা ভোগ করছে। বিজেপির এমপি প্রজ্ঞা ঠাকুরের সাম্প্রতিক মন্তব্য বিস্ময়কর, যিনি মালেগোয়া সন্ত্রাসী হামলায় অভিযুক্ত। তিনি অদ্ভুত অভিযোগ করেছেন- 'কম্যুনিস্ট' ও 'ধর্মে অবিশ্বাসীরা' নাকি হিন্দু দেব-দেবীদের অপমান করছে। তাঁর ভাষায়, 'এই অবিশ্বাসীরা সব সময়ই এমনটি করেছে। তাদের একটি কম্যুনিস্ট ইতিহাস রয়েছে। ... এটা হলো ভারত হিন্দুদের। সনাতন ধর্ম এখানে থাকবে। আমাদের দায়িত্ব হলো একে ধরে রাখা এবং আমরা এটাই করব।'
না, নির্দিষ্ট কোনো ধর্মের দেশ নয়। ভারত দেশটিতে বসবাসকারী সব নাগরিকের। 'আমরা, ভারতের মানুষ' এবং আমাদের সংবিধানে এমনটিই বলা আছে। তা ছাড়া সনাতন ধর্ম এখানে অবরুদ্ধ নয় যে, তাকে বাঁচিয়ে রাখতে সবাইকে সমগোত্রীয় হতে হবে। এটি বরং অধিকাংশের বিশ্বাস, অনুশীলন ও সংস্কৃতিতে বেঁচে আছে। কোটি কোটি শান্তিকামী হিন্দু, যারা তাদের পছন্দের দেব-দেবীর পূজা করছে, তারাই বাঁচিয়ে রাখছে। যারা জোরপূর্বক গোটা ভারতে তা সবার ওপর চাপিয়ে দিতে চায়, তারা নয়। 'হিন্দু সামরিকীকরণ' কিংবা 'হিন্দুত্ববাদই সব রাজনীতি'- এমন ধারণাই দেব-দেবীর অপমান। যখন কোনো গরিব মুসলমানের ওপর কাপুরুষোচিতভাবে হামলা করা হয়; রাস্তার কোনো দোকানদার, ফকির, বস্তিবাসীর ওপর হামলা করলে; তাদের জন্য খারাপ ভাষা ব্যবহার করলে তখন বরং দেবতা অপমানিত হয়। 'জয় শ্রী রাম' বলে যুদ্ধে জয়ীরা যেভাবে বন্দিদের সঙ্গে আচরণ করে; এমন আচরণ করলে দেবতাই লজ্জিত হয়।
একটি ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়ে অসাংবিধানিক লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যম বানিয়ে বরং তারাই ধর্মকে প্রতিদিন অপমান করছে। ভারতীয় মুসলিমদের পাকিস্তান যাওয়া উচিত- তাদের এমন বিদ্বেষপ্রসূত স্লোগান দিয়ে তারা এমন সমাজ করতে চায়, যেটি ধর্ম দ্বারা শাসিত। যারা ভারতের স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছে; তাদের প্রত্যাশা তারা অস্বীকার করতে চায়। একটি ধর্মের বিরুদ্ধে না লেগে তাদের ইতিহাস পর্যালোচনা করে বোঝা উচিত কীভাবে সতী, শিশুবিয়ে, বিধবাদের প্রতি নিষ্ঠুরতা, তাদেরকে সমাজচ্যুত করাসহ এমন অসামাজিক কাজের মূলোৎপাটন অনেক নেতা করেছিলেন।
কম্যুনিস্টরা ধর্মবিশ্বাসের স্বাধীনতায় সাংবিধানিক নিশ্চয়তায় বিশ্বাসী, যা প্রজ্ঞা ঠাকুরদের কাছে বেমানান মনে হবে। আইনের চারদিকের মধ্যে এবং সাংবিধানিক মতপ্রকাশের অধিকারে কম্যুনিস্টরা বিশ্বাসী। কম্যুনিস্টরা বর্ণপ্রথার মতো সামাজিক বিষয়গুলোতে সমালোচনাপ্রবণ। তারা ধর্ম থেকে রাজনীতি পৃথক্‌করণে বিশ্বাসী। এটা অন্যতম কারণ, যে কারণে পিএফআই বা পপুলার ফ্রন্ট অব ইন্ডিয়া এবং এসডিপিআই বা সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি অব ইন্ডিয়ার মতো মৌলবাদী সংগঠন কেরালায় কম্যুনিস্টদের বিরুদ্ধে বিষ ছড়াচ্ছে। তারা জানে, তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে কোনো আপস হবে না। যে মতাদর্শ কেবল সংঘ পরিবার কর্তৃক সংখ্যাগরিষ্ঠ সাম্প্রদায়িক অনুশীলনকে সহায়তা করে। কম্যুনিস্টদের ধর্মনিরপেক্ষ নীতি ও আদর্শ রয়েছে।
ভারতের স্বাধীনতার ৭৫ বছরে দেশটি ধর্মনিরপেক্ষতার শক্তি প্রদর্শনের পরিবর্তে ভিন্নদিকে যাচ্ছে। অথচ ধর্মনিরপেক্ষতা বিচিত্র মানুষের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মাধ্যম। ফলে ভারত জীবনের সর্বস্তরে ইসলামবিদ্বেষী সংস্কৃতি ও ধর্মান্ধতাকে প্রশ্রয় দেওয়াসহ ক্ষমতাসীনরা আগের সঠিক ইতিহাস মুছে নতুন ইতিহাস বিনির্মাণের জন্য উচ্চমূল্য দিচ্ছে। নূপুর শর্মাকে দাপ্তরিকভাবে 'বিচ্ছিন্ন উপাদান' হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। কাল হয়তো প্রজ্ঞা ঠাকুরও একই উপাধিতে ভূষিত হবেন।
কিন্তু এর মাধ্যমে ভারতের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি উদ্ধার করা কঠিন। অন্তত দুই সপ্তাহ ধরে আমরা তাই দেখছি। শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার এসব 'বিচ্ছিন্ন উপাদান'কে আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে গেছে।
বৃন্দা কারাট: ভারতের কম্যুনিস্ট পার্টির (মার্কসবাদী) পলিটব্যুরো সদস্য এবং সাবেক রাজ্যসভার সদস্য; এনডিটিভি থেকে ভাষান্তর