নিত্যপণ্যের বাজারে যে আগুন জ্বলছে, তা-ই উঠে এলো বিবিএস তথা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মূল্যস্ম্ফীতি সম্পর্কিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে। রোববার প্রকাশিত বিবিএসের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মে মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ম্ফীতি ৭ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে। বিবিএসের ওই প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে সোমবার সমকাল লিখেছে, সর্বশেষ ২০১৪ সালের মে মাসের পর যখন মূল্যস্ম্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ; এই প্রথম দেশ নিত্যপণ্যের বাজার এত উত্তপ্ত হতে দেখল। এটি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। তবে এ উদ্বেগ আরও বেড়ে যায় যখন দেখা যায়, ওই আগুনটা সবচেয়ে বেশি লেগেছে খাদ্যপণ্যের দামে। সেখানে মূল্যস্ম্ফীতির হার ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের জন্য এখন জীবনধারণই কঠিন হয়ে পড়েছে। এদিকে গ্রাম-শহরের চিরাচরিত বৈষম্যের প্রতিফলন ঘটিয়ে বিবিএসের প্রতিবেদনটি তুলে ধরেছে- খাদপণ্যে মূল্যস্ম্ফীতির হার গ্রামে আরও বেশি; প্রায় ৯ শতাংশ। অথচ বিগত বছরগুলোতে এ বিপদ থেকে শহরের তুলনায় গ্রামের মানুষ একটু হলেও নিরাপদ ছিল। এতে একটা বিষয় স্পষ্ট, দেশের অর্থনীতি যত আমদানিনির্ভর হচ্ছে তত শহরের তুলনায় গ্রামের মানুষের জীবনসংগ্রাম কঠিন হচ্ছে। বলা বাহুল্য, এবারের মূল্যস্ম্ফীতিকে বলা হচ্ছে আমদানিকৃত মূল্যস্ম্ফীতি। করোনা মহামারি ও চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমাদেরও তার অভিঘাত সইতে হচ্ছে। এক সময় অন্তত বিভিন্ন খাদ্যপণ্য উৎপাদনের দিক থেকে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল যে গ্রামীণ অর্থনীতি; নানা কারণে ক্রমবর্ধমান হারে আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় তারও গায়ে লাগছে বিশ্ববাজারের আগুনের আঁচ। এ ধাক্কা শহরের তুলনায় গ্রামের মানুষের গায়ে বেশি লাগার কারণ হলো, আমদানিকৃত খাদ্যপণ্য শহর হয়ে গ্রামে যায়। শহরের চেয়ে গ্রামে আয়-উপার্জনের সুযোগও কম।
মূল্যস্ম্ফীতির আঘাত গ্রামের মানুষদের জন্য তীব্রতর হলো এমন এক সময়ে যখন, গত এক যুগের দ্রুত নগরায়ণের পরও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ গ্রামে থাকে। পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রেও গ্রামের মানুষ শহরের মানুষের চেয়ে পিছিয়ে আছে। ২০১৬ সালে দেওয়া বিবিএসের এক তথ্য অনুসারে, গ্রামের দরিদ্রতম মানুষদের আয়ের প্রায় ৬২ শতাংশ খাদ্য কিনতে ব্যয় করতে হয়। তার মানে, এবারের মূল্যস্ম্ফীতি গ্রামীণ দরিদ্রদের জীবনকে আক্ষরিক অর্থেই দুর্বিষহ করে দিচ্ছে। আসলে শুধু গ্রামীণ নয়, শহরের দরিদ্ররাও এ মূল্যস্ম্ফীতির কারণে ভীষণ বেকায়দায় পড়েছে। ২০২০ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ঢাকা শহরের দরিদ্রদের আয়ের অন্তত অর্ধেক খাদ্যের জন্য ব্যয় করতে হয়। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা বোধ হয় একেই বলে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, সরকার এ বিষয়ে সচেতন আছে বলে মনে হয় না। সম্প্রতি সংসদে আগামী অর্থবছরের জন্য যে বাজেট পেশ হলো; অন্তত তা দেখে ভিন্ন কিছু বলা যায় না। বাজেটে মূল্যস্ম্ফীতির চ্যালেঞ্জের কথা বলা হলেও তা মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। শুধু তাই নয়; গ্রাম ও শহরের নিম্নআয়ের মানুষকে এ চ্যালেঞ্জের মুখে টিকে থাকার জন্য যে ধরনের সহায়তামূলক কর্মসূচি নেওয়া যেত, তার ধারে-কাছেও সরকার যায়নি। বরং সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচিতে এবার সরকারি বরাদ্দ বিশেষ করে জাতীয় আয়ের নিরিখে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়; সেই মার্চ মাসে বাণিজ্যমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন, জুনের ১ তারিখ থেকে সরকার এক কোটি দরিদ্র পরিবারকে স্বল্পমূল্যে নিত্যপণ্য সরবরাহ করবে, যা আজও স্রেফ ঘোষণাই রয়ে গেছে। এমনকি অদূর ভবিষ্যতে তা বাস্তবায়িত হবে কিনা সেটা কেউ বলতে পারছে না।
মূল্যস্ম্ফীতির অভিঘাত থেকে নিম্নআয়ের মানুষদের রক্ষায় সরকারের এমন উদাসীনতাকে রাষ্ট্রের চিরাচরিত গরিববৈরী অর্থনৈতিক নীতির প্রতিফলন বললে খুব একটা ভুল বলা হবে না। তবে নীতিনির্ধারকদের এটা মনে রাখতে হবে যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে বঞ্চিত করে কোনো উন্নয়ন টেকসই হয় না। তা ছাড়া রাজনৈতিকভাবেও তা সরকারের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের কথা মাথায় রাখলে।