গত মাসে আমরা উদযাপন করেছি বৈশাখীর সব অনুষ্ঠান। খুব বেশিদিন আগে না হলেও আজ যেন বৈশাখের আমেজ আর বার্তা অনেকটাই ম্রিয়মাণ। পুরো বছর তো পড়েই আছে!
এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই- আমাদের ইতিহাসবোধ, সমকালবোধ আজ আন্তর্জাতিক খ্রিষ্টীয় কালপঞ্জির দ্বারা এতটাই নিয়ন্ত্রিত যে, বাংলা সন-তারিখ দেখলে কেমন যেন একটু বিহ্বল হই। রবীন্দ্রনাথ তো বটেই, অন্য বহু লেখকের বইপত্র বা রচনার তারিখ বাংলা সনে উল্লিখিত হলে আমরা সমস্যায় পড়ি। কোন মাস- প্রশ্ন জাগে। ঠিকঠাক কীভাবে বুঝব ইংরেজি সালটা কী? বিষয়টি হয়তো চমৎকারভাবেই বুঝেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। শান্তিনিকেতন শিক্ষাঙ্গনে তাই মাথা তুলে দাঁড়িয়ে ছিল একের পর এক নিজস্ব বাঙালি দিকচিহ্ন। ৭ পৌষ বর্ষামঙ্গল, এমনকি বুধবার সাপ্তাহিক ছুটি। কিন্তু এতকিছুর পরও দ্বন্দ্বটা থেকেই যায়, যখন বহু মেধাবী-শিক্ষিত মানুষও বলেন- রবীন্দ্রনাথের জন্ম ২৫ বৈশাখ ১৮৬১ আর প্রয়াণ ২২ শ্রাবণ ১৯৪১। শুধু কি আন্তর্জাতিক খ্রিষ্টীয় কালপঞ্জির প্রভাব? তার সঙ্গে তো সমানতালে চলছে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের কর্ণবিদারী নিনাদ- নিজস্ব আত্মপরিচয়ে বলীয়ান হয়ে ভাষা আর দিনবহরেও নিজস্ব ধরন, ধর্মের সঙ্গে সেতুবন্ধ। দ্বন্দ্ব সেখানেও। কেননা, বাঙালি সংস্কৃতি এবং আত্মপরিচয় নির্মাণ একদিকে সীমান্তহীন ও ধর্মনির্দিষ্টতাহীন; অন্যদিকে বহুস্বরিক। কোনো সন্দেহ নেই, আগ্রাসন একটা আছে। খুবই বলশালী, ধূর্ত ও কৌশলী সেই আগ্রাসন। সেই আগ্রাসনের মূল উদ্দেশ্যই থাকে সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু নির্দিষ্ট করে দেওয়া। খুঁজে বের করে আলাদা করে দেখায় অস্ত্রশালী আর নিরস্ত্রকে; প্রতাপান্বিত আর দুর্বলকে।
শহুরে শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের মুখের বাংলা বাক্যে আজকাল মিশে থাকে ইংরেজি শব্দ। গুরুজন তাতে বিরক্তি আর আপত্তি প্রকাশ করলেও তা নিরাময়ের কোনো উপায় তাঁদের কাছে নেই। মানতেই হবে, বাংলা ভাষায় ইংরেজি শব্দের প্রবেশ অনিবার্য এবং এ প্রভাবকে কোনোকালেও অস্বীকার করা যায়নি। তবে এ প্রভাব একালে একটু বেশিই। একালের সঙ্গে সেকালের পার্থক্য এই যে, সে সময়ের কথা রবীন্দ্রনাথসহ অন্যান্য সাহিত্যিক স্বীকার করেছিলেন। কিন্তু শব্দের সেই দারিদ্র্যকে মেনে নিয়ে চুপচাপ বসে থাকেননি। ফলে সে সময়ে রবীন্দ্রনাথ ও সমকালীন চিন্তকদের চেষ্টায় বাংলা ভাষার মূলধন বেড়ে উঠেছিল। বাংলা ভাষার গ্রাম্য হাটেই বিশ্বসম্পদের কারবার খোলা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু এখন তেমনটি অনুপস্থিত। বাংলা ভাষার যে মূলধন তখন ছিল, তাতে আবার টান পড়েছে। সে কাজে একালের চিন্তকেরা তেমন মন দিচ্ছেন না বলেই আজকের বাংলা ভাষার গ্রাম্য হাটে বিশ্বসম্পদের কারবারে এ ভাষা ব্যবহারযোগ্যতা হারাচ্ছে। বাংলা বাক্যের যে স্বাভাবিক সিনট্যাক্স বা অন্বয়, তা-ও আমরা নষ্ট করেছি। ইংরেজি অথবা হিন্দি বাক্যের সমন্বয় বাঙালির মুখে ধরা দিচ্ছে। সেই অস্বাভাবিক অনুকৃত বাংলা বাক্যে 'ইংরেজি' আর 'হিন্দি' শব্দ বসে ভাষার যে রূপটি তৈরি করছে, তাতে বাংলা ভাষার ভিখিরিপনাই প্রকাশ পাচ্ছে।
এসব থেকে কি আমরা মুক্ত হতে পারব? বাংলা ভাষা আর পহেলা বৈশাখের মর্যাদা কি আমাদের জীবনব্যবস্থায় সসম্মানে নতুন করে স্থান দিতে পারব? জানি না, তা হবে কিনা! তবে আশা রাখি- বিশ্বমন অটুট রেখেই আমরা চৈত্র পার্বণে মেতে উঠতে পারব; শ্রাবণ-রজনীতে হঠাৎ খুশি ঘনিয়ে আসবে চিত্তে; হেমন্তে শুনব বসন্তের কোনো বাণী; বুঝতে চেষ্টা করব- কোনটা লালনের গানে বলা ঈশান কোণ, কোনটা সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের অগ্নি কোণ। ফাল্কগ্দুনের বিকেলে বৃষ্টি এসে আলাদা অনুভূতিতে ভরিয়ে দিক বাঙালির দেহ-মন। দুই-ই না হয় থাকুক- খ্রিষ্টাব্দ আর বাংলা সন-তারিখ; বছরভর দুটিকেই মনে রাখি। তবে দুটিকেই যেন আলাদাভাবে চিনি। বাংলার সঙ্গে ইংরেজিটা গুলিয়ে ফেলে বাংলাটাই যেন হারিয়ে না ফেলি। পহেলা বৈশাখের দিনটিই শুধু নয়; মনে রাখি যেন পুরো বাংলা বর্ষপঞ্জি।
সুধীর সাহা :কলাম লেখক
ceo@ilcb.net