জানতুম না তাঁর নাম। জ্ঞাত ছিল না, তিনি লেখক। অজ্ঞতা স্বীকার্য। ১৯৭৫ সালের পরে বাংলাদেশের বহু কবি-গল্পকার-ঔপন্যাসিকের লেখাটেখা পড়া হয়নি। দোষ নিশ্চয়। হালের লেখককুলের গদ্য-পদ্য কোন কিসিমের; অজানা। বিশ্বসাহিত্য পড়ার দোষ। শুনেছি, একুশের বইমেলায় ছয় বা সাত হাজার বই প্রকাশিত হয়। তার মানে, বিস্তর প্রকাশক গজিয়েছে।
এও শুনেছি, কিছু প্রকাশক নব্য লেখকদের কাছ থেকে টাকা নেন। অনেক লেখক গরু-ছাগল, ধান, জমি বিক্রি করে প্রকাশকের দ্বারস্থ হন। প্রকাশকও সুযোগের অপেক্ষায়। রিস্ক নিতে নারাজ। অনামি লেখকের বই ছেপে কেন ট্যাঁকের কড়ি গচ্চা দেবেন? এও এক ব্যবসা। বাংলাদেশে নানা ব্যবসায় নানা ফন্দিফিকির। বাদ কেন প্রকাশক? এও শুনেছি, ধনী ব্যবসায়ীর স্ত্রী বা সখীরা লেখক, বইমেলায় স্টল নিয়ে এক অর্থে 'ফ্যাশন শো' করেন। মন্দ কী? সবই দ্রষ্টব্য। লোকরঞ্জন। কালচারের অঙ্গ। মৌলবাদীদের চক্ষুশূল। ভালো লক্ষণ।
পৃথিবীর কোনো দেশেই বইমেলা উপলক্ষে ছয় বা সাত হাজার বই প্রকাশিত হয় না। এমনকি, গোটা বিশ্বে এক মাসেও নয়। কভিডের দাপটে গত তিন বছরে ইউরোপে ৯৬টি বই প্রকাশের খবর সংবাদপত্রে। তাও ডিসেম্বর মাসে। যিশু মাস (ক্রিসমাস) উপলক্ষে। বইগুলো কচিদের জন্য। কচিদের উপহার দেওয়া হয়। এটা রেওয়াজ।
বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক এন্টারটেইনমেন্ট বলতে কিছু নেই। পহেলা বৈশাখ এক দিনের। মৌলবাদীর দাপটে ভবিষ্যতে তাও থাকবে কিনা সন্দেহ। গোপনে-গভীরে আশকারাদাতা সরকার। ক্ষমতার লোভে। বাংলার আদি সংস্কৃতির বলয়ে ভাটিয়ালি, জারি-সারি, পালাগান উধাও। বদলে কী? না বললেও পাঠকের জানা। পালা, যাত্রা নিয়ে বঙ্গবন্ধু সরকারের পরে এত গা-জ্বলা কেন? নিষেধ কেন? সব সরকার ক্ষমতায় এসে বড় বড় বুলি আওড়াবে- 'দেশের আদি-ঐতিহ্যের সংস্কৃতি বহাল, আমাদের নিজস্ব।' অতঃপর? লজ্জা করে না বলতে? মূল কথা, লজ্জা নেই। লজ্জাহীন। লজ্জাহীনতায় মৌলবাদীদের পদতলে।
মৃত্যুর মাস পাঁচেক আগে আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী ফোনে (প্রতি মাসে যেমন বার তিনেক কথা হতো নানা বিষয়ে) কথা প্রসঙ্গে বলেন, 'আ'লীগ (আওয়ামী লীগ) এক যুগের বেশি ক্ষমতায়; বাংলাদেশের মাটি-মানুষের আদি সংস্কৃতি কেন ফিরিয়ে আনছে না, এই নিয়ে লিখতে হবে।' লেখেননি। মারা গেছেন। এও বলেছিলেন, 'সাংবাদিক, সাংস্কৃতিককর্মীর দায় আরও বেশি। আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ূক। সর্বস্তর থেকে সংস্কৃতির মানুষ একাত্ম হবে।'
বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় 'সাংস্কৃতিক মেলা' বইমেলা। এক মাস। 'সাংস্কৃতিক' বললাম বটে, আদতে বইকেন্দ্রিক। নানা হুল্লোড়ে ভরপুর। বছর কয়েক আগে ফ্রাঙ্কফুর্ট আন্তর্জাতিক বইমেলায় বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানের সঙ্গে দেখা। ঘণ্টা দেড়েক একান্ত সান্নিধ্য। প্রস্তাব দিই, বইমেলা গোটা দেশে ছড়িয়ে দিন। কীভাবে- জানতে চান।
বলি, জেলায়-মহকুমায় অন্তত সাত দিন বইমেলা হবে (ফেব্রুয়ারি মাসে)। উদ্যোগী বাংলা একাডেমি। প্রকাশকরা সহযোগী। প্রকাশনা সংস্থার তালেবররাও সহায়ক। প্রয়োজনে আর্থিক সাহায্য। সরকারও। বলেন, 'না রে ভাই, সরকার আকাশ লাথথানো গল্প করবে, আদতে মিথ্যে। আমরা নিরুপায়।'
সরকারের এ বছর/আগামী বছরের বাজেট দেখলুম। হায়! শিক্ষা, শিল্প-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বাজেট।
বিজ্ঞান শিক্ষায় এত কম? আলামত কী? কোথায় যাচ্ছে দেশ? কোন দিকে? সরকারের দুরভিসন্ধি, মতিগতি কী? মতলব পরিস্কার। এই নিয়ে লিখলে 'সরকারবিরোধী'। ঘাড়ে দুটি মাথা নেই। চুপ থাকব? না। দায় সাংবাদিক, লেখক, বুদ্ধিজীবী, সমাজকথকের। বাধা এলে বাধবে লড়াই।
বলছিলুম একজন লেখকের কথা। নাম :মোশাররাফ হোসেইন ভূঞা। লিখেছেন :পদ্মা সেতু/সততা ও আত্মবিশ্বাসের বিজয়। বইটি উপহার দিয়ে সবিনয় অনুরোধ :'পড়বেন।'
পড়াটড়ার কিঞ্চিৎ অভ্যেস। পড়ি।
বইয়ের প্রথম ফ্ল্যাপে লেখা :জনাব মোশাররাফ হোসেইন ভূঞা সরকারের একজন সফল আমলা হিসেবে সম্প্রতি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। সরকারি দায়িত্ব পালনে ব্যস্ততা সত্ত্বেও তার দুটি ভ্রমণ কাহিনিমূলক বই 'দেশ-বিদেশের ভ্রমণ কথা' ও 'মার্কিন মুলুকে মনোভ্রমণ' যথাক্রমে ২০১৩ ও ২০১৪ সালে প্রকাশিত হয়েছে। 'পদ্মা সেতু :সততা ও আত্মবিশ্বাসের বিজয়'।
আরও আছে। 'এ গ্রন্থের লেখক দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়ের করা মামলায় প্রায় দু'বছর কষ্টভোগ করেছেন, এমনকি জেলেও গিয়েছেন। অবশেষে সব দুর্নীতির অভিযোগ দেশ-বিদেশে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে।' ... 'পদ্মা সেতু নির্মাণের শুরু থেকে একটি স্বার্থান্বেষী ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠী, বিশ্বব্যাংক এবং দেশের একশ্রেণির সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যম ভিত্তিহীন রটনা ও প্রচার, প্রচারণার মাধ্যমে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্বিষহ কষ্ট দিয়েছে। এই বইয়ের লেখক তাঁর কার্যকালীন বাস্তব অভিজ্ঞতা, দুঃখ-কষ্ট ও দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র, মিডিয়ার প্রচারণা ইত্যাদি তাঁর নিজস্ব সত্যভাষণের মাধ্যমে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।' বইয়ের মুখবন্ধকার ড. মসিউর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা।
মসিউর ওঁর মুখবন্ধে পদ্মা সেতু নির্মাণের ১৩টি পয়েন্ট উল্লেখ করেছেন। ঘটনার পরম্পরা সাজিয়েছেন। পদ্মা সেতু নির্মাণ কীভাবে নস্যাৎ করা যায়, গোড়া থেকে কী কী ষড়যন্ত্র, বিশ্বব্যাংকের বদমাইশি, মূলে ইন্ধনদাতার আভাসও দিয়েছেন।
পদ্মা সেতু নির্মাণে শেখ হাসিনার দৃঢ়তায় কিছু তথাকথিত সুশীল সামাজিকের উবাচ ইউটিউবে পাঠ্য। সংবাদপত্রে প্রকাশিত (২০১২)। ৩০ জুন ২০১২।
জানে না শেখের বেটির জেদ। রাজনীতি। পিতার নাম শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশের জাতির পিতা। তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা।
পদ্মা সেতু নিয়ে মোশাররাফ হোসেইন ভূঞার বই পড়লুম। বহু অজানা তথ্য প্রকাশিত। বহু ঘটনার উল্লেখ। সংবাদপত্রের খবর উদ্ৃব্দত। পরিস্কার করেছেন তথ্যবহুলতায়।
পদ্মা সেতু নিয়ে মানুষের আবেগ, প্রেম, আদিখ্যেতা কতটা- প্রমাণ মজিবর রহমান খোকার বিদ্যাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত প্রথম সংস্করণ ফেব্রুয়ারি ২০২০ সালে। অষ্টম সংস্করণ জানুয়ারি ২০২২ সালে। একুশে বইমেলায় অধিক বিক্রয়। বইমেলার গুণ-অগুণ দুই-ই আছে। প্রকাশক, লেখক ধন্য। পাবনার হরিতলার একজন জেলে পদ্মার আর্তনাদমাখা কণ্ঠে বলেছেন, 'পদ্মা সেতুর জন্য ইলিশের মরণ। আজ নয়, কাল বুঝবেন। আমাদেরও মরণ।'
দাউদ হায়দার :কবি