গত কয়েক দিন ধরে ফেসবুকসহ বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যম ভেসে যাচ্ছে সিলেটবাসীর অমানবিকতার গল্পে। সেই গল্পের খলনায়ক নৌকার মাঝিরা। আমরা অসম্ভব রেগে আছি। দরিদ্র মানুষরাও কেমন করে এবং কতটা অমানবিক হতে পারে, তা নিয়ে আমরা অনেকেই আলোচনায় বসেছি। এই সময় তার আসলে কী করা উচিত এবং এর বিপরীতে গিয়ে কেন সে লাভের চিন্তা করছে, সেটি নিয়েই মূল আলোচনা। এরই সঙ্গে অনেকে সিলেট অঞ্চলে বিশেষ করে আমাদের এই আহাজারি আর হাহাকারের কারণ আমরা আসলে দরিদ্র।
গত এক সপ্তাহে পুরো সিলেট অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। সরকারিভাবে মাঠ প্রশাসন ছাড়াও সোনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি সেখানে কাজ করছে। অনেককেই নেওয়া হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্রে। কিন্তু এই কেন্দ্রগুলোর একতলাও পানির নিচে চলে গেছে। এ অবস্থাতেই মানুষ বাঁচার চেষ্টা করছে। এই বন্যার সবচেয়ে হৃদয় বিদীর্ণ করা ছবিগুলো বারবার ঘুরে বেড়াচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। পানিতে ভাসছে অসংখ্য স্যান্ডেল-জুতা। বন্যার পানিতে বিদ্যুতের তার জড়িয়ে পড়ায় বিভিন্ন জায়গা বিদ্যুতায়িত হয়ে গেছে। এ রকম অবস্থায় বিদ্যুৎস্পর্শে মানুষ মারা গেছে। প্রায় ঘণ্টায় ঘণ্টায় নিজের ফেসবুকের মাধ্যমে বন্যার অবস্থা এবং বন্যার্ত মানুষকে সহযোগিতার আহ্বান জানান টিটু চৌধুরী। বিদ্যুৎ নেই বেশিরভাগ জায়গায়। তাই মোবাইল বন্ধ থাকার কারণে অনেকেই স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। ত্রাণও পৌঁছানো যাচ্ছে না। এসব তথ্য আমরা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে প্রতিনিয়ত পাচ্ছি।
গত তিন-চার দিন থেকে আরও কিছু তথ্য ভাইরাল হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এর মধ্য সবচেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে নৌকার ভাড়া এবং মাঝিদের আচরণ। জানা যায়, সেখানকার মাঝিরা ২ হাজার টাকার নৌকা ভাড়া ৫০, ৬০, ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত হাঁকিয়েছেন। দরাদরি করেও অনেকে সেই নৌকা ভাড়া করতে পারেননি।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে মন আরও কিছু বিষয়ে বিষিয়ে উঠেছে, যখন অনেকেই একজন অন্তঃসত্ত্বার পানিবন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত করার চিন্তা করছিলেন। সামাজিক মাধ্যম এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তাঁর স্বামীর জবানবন্দি এভাবে এসেছে- 'তাঁকে আনার জন্য একটি নৌকা ভাড়া করতে এসেছিলাম, কিন্তু ৫০ হাজার টাকার নিচে কোনো নৌকা যেতে চাচ্ছে না। আমি ৪০ হাজার পর্যন্ত বলেছি। কেউ যায়নি।' শুধু তাই নয়; পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য থেকে জেনেছি, সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার সালুটিকর থেকে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার তেলিখালের দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার। এই অল্প দূরত্বে যাওয়ার জন্য নৌকা ভাড়া ৫০ হাজার টাকা দাবি করছে নৌকার মালিকরা। আমি এখানে ইচ্ছে করেই মালিক শব্দটা ব্যবহার করছি। কারণ আমাদের মনে রাখতে হবে, সব মাঝিই কিন্তু নৌকার মালিক নয়। অন্য আট দশটি ক্ষেত্রের মতো এ ক্ষেত্রেও মালিকদের বেশিরভাগ মানুষই হয়তো দেখে না। দৃশ্যমান থাকে মাঝিরা। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই নৌকার মালিক নিজে নৌকা চালায় না। তাই আমাদের ক্ষোভ যাদের দেখা যায় তাদের প্রতিই।
এ অভিজ্ঞতা হয়তো অনেকেরই হয়েছে। কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তির অভিজ্ঞতাও শুনেছি। অনেক জায়গায় টাকা দিতেও রাজি জনগণ। কিন্তু নৌকা পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের ক্ষোভ সেই নৌকার মাঝির প্রতি। মানুষের বিপদে মানুষ দাঁড়াবে, সেটাই কাঙ্ক্ষিত। সবাই বলছেন, ভাড়া কিছু বেশি চাইলে ক্ষতি নেই। তাই বলে এত হাজার টাকা! এ দেশে মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে সব ধরনের বিপদ-আপদে সহযোগিতা কিংবা মানুষকে রক্ষা করার ইতিহাস যদি আমরা বিশ্নেষণ করি, তাহলে দেখব সেটি সাধারণ মানুষেরই লড়াইয়ের ইতিহাস। অজানা-অচেনা মানুষই এগিয়ে যায় আরেকজনকে রক্ষা করতে। মানুষই ঝাঁপিয়ে পড়ে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। মানুষ ব্যক্তিগতভাবে সহযোগিতা করেছে। অনেক সংগঠন গণচাঁদা তুলছে; প্রবাসীদেরও সহযোগিতার হাত বাড়াতে দেখা গেছে। কিন্তু এ নৌকার জায়গায় এসেই আমাদের ক্ষোভ।
আমরা ভুলে যাই, দুর্যোগ থেকে মানুষকে বাঁচানোর প্রধান দায়িত্ব রাষ্ট্রের। যখন গণমাধ্যমে খবর আসছে, নৌকা ভাড়া বহু গুণ, তখন সরকার কী কী করতে পারত? সরকারের সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় সেই নৌকার মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের নির্দেশ দিতে পারত মানুষকে উদ্ধার করতে। সেই ভাড়া সরকার দেবে। কারণ সরকারের প্রথম দায়িত্বই হলো মানুষকে বাঁচানো। কিন্তু আমরা সেই চেষ্টা দেখিনি। এর আগেও দেখেছি, বিভিন্ন সময় সরকার হেলিকপ্টার পাঠিয়েও মানুষকে উদ্ধার করেছে। বিভিন্ন লোকবল, সরঞ্জাম পাঠিয়ে মানুষকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে এসেছে। এ ক্ষেত্রে যদিও সেনাবাহিনী কাজ করছে, কিন্তু সব এলাকা থেকে পানিবন্দি মানুষকে উদ্ধার করা যায়নি। গত কয়েক দিন ধরেই সেনাবাহিনী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে সেখানে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছেন এবং সেগুলো যে যথেষ্ট হচ্ছে না, তা দেখতেই পাচ্ছি। তারাও জলাবদ্ধ এলাকার মানুষ; তাদের উদ্ধারের জন্য নৌকার ব্যবস্থা করতে বারবার আহ্বান জানানো হয়েছিল।
এ বন্যার সঙ্গে আরও অনেক কিছু যোগ হয়ে পড়ে। চুরি-ডাকাতি থেকে মানুষের নিরাপত্তা। অনেকেই এসবের ভয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে চায় না। অনেকেই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে পরিবারের নারী সদস্যদের নিয়ে। এর পাশাপাশি পরিবারে বয়স্ক এবং 'বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন' কেউ থাকলে তাদের জন্য যে কোনো দুর্যোগ মোকাবিলা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। সে সময় মানুষ নানা ধরনের নিরাপত্তাও আশা করে।
এ সবকিছুই করার কথা সরকারের। সরকার করছে না, এমন নয়। তবে পর্যাপ্ত যে হচ্ছে না, তা তো বোঝাই যায়। আশার কথা, পানি কিছুটা কমতে শুরু করেছে। তবে মানুষ এখনও ঘরবন্দি। তাই এই মুহূর্তে করণীয়- যেভাবেই হোক মানুষকে উদ্ধার এবং পর্যাপ্ত ত্রাণ নিশ্চিত করা। সেগুলো কীভাবে নিশ্চিত হবে, সেটি নিয়েই কথা বলা জরুরি।
জোবাইদা নাসরীন :শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
zobaidanasreen@gmail.com