জলাবদ্ধতার কারণে চট্টগ্রাম নগরী আবারও খবরের শিরোনাম হলো। মঙ্গলবার সমকালের এক প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, ভারি বর্ষণ আর জোয়ারের পানিতে চট্টগ্রাম এখন পানিতে থৈ থৈ করছে। বাণিজ্যিক নগরী বলে পরিচিত এ শহরের রাস্তা তো ডুবেছেই; অনেক এলাকার শপিংমল ও দোকানপাটও তলিয়ে গেছে। বহদ্দারহাট, বাদুরতলার মতো কোনো কোনো এলাকার বাসা-বাড়িতেও হাঁটুসমান পানি অবস্থান করছে। যে কারণে এমনকি বহদ্দারহাট এলাকার বাসিন্দা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়রও সোমবার তাঁর কার্যালয়ে যেতে পারেননি। মোট কথা, জলাবদ্ধতার কারণে চট্টগ্রাম নগরীর মানুষদের ভোগান্তি এখন চরমে। বন্দরনগরীর এ সমস্যা যে বহু পুরোনো, তা নতুন করে বলার কিছু নেই। কয়েক বছর ধরে শুধু বর্ষা মৌসুমে নয়; সামান্য বৃষ্টি হলেই নগরীর রাস্তাঘাট হাঁটুপানির নিচে চলে যায়। এ নিয়ে নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভের অন্ত নেই। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও এটি বারবার ইস্যু হয়েছে। এ পর্যন্ত অনেক মেয়র এ ইস্যু সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। দুঃখজনকভাবে, মেয়রের চেয়ারে বসেই তাঁরা ওই প্রতিশ্রুতির কথা ভুলে যান। কেউ কেউ যে সমস্যাটা সমাধানে কিছু চেষ্টা করেননি; তা নয়। তাঁদের সে চেষ্টা কার্যক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, কিছু অপরিকল্পিত ও উচ্চাভিলাষী প্রকল্প গ্রহণ বা সে-প্রকল্পের পেছনে বরাদ্দকৃত অর্থ যেনতেনভাবে খরচের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ফলে দীর্ঘজীবী এ সমস্যার সমাধান অধরাই থেকে যায়।
আরও দুঃখজনক বিষয় হলো, সমস্যাটি সমাধানের দায়িত্ব যেসব সরকারি কর্তৃপক্ষের, তারা একদিকে যেমন এর উৎস সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত নয় বলে অভিযোগ; আরেকদিকে তারা প্রত্যেকে নিজের মতো করে এর সমাধান খোঁজে। শুধু তাই নয়, সুযোগ পেলেই তারা একে অপরকে এর জন্য দায়ী করে। যেমন, সমকালের ওই প্রতিবেদনে নগরীর চলমান জলাবদ্ধতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী বলেছেন, সমস্যাটির সমাধানে তাঁরা যেসব খাল ও নালা নিয়ে কাজ করছেন তা ঠিকভাবেই চলছে। গোল বেধেছে সিটি করপোরেশন যেসব খাল ও নালায় কাজ করছে সেখানে। আবার সিটি করপোরেশন মেয়র সমস্যাটি এখনও রয়ে যাওয়ার জন্য সিডিএকে দুষছেন। তাঁর অভিযোগ, সিডিএ যেসব খাল সংস্কার করেছে, সেগুলোতে 'মাটি থেকে' যাওয়ায় 'পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে'। জলমগ্ন চট্টগ্রাম নগরী নিয়ে এই 'ভেজা' রশি টানাটানি বন্ধ হোক। উল্লেখ্য, নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএ বর্তমানে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। সেগুলোর অধীনে তারা ৫৭টি খালের মধ্যে ৩৬টি এবং ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার নালার মধ্যে ৩০২ কিলোমিটার নালা নিয়ে কাজ করছে। একই সঙ্গে সিটি করপোরেশনও হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে নগরীর বাকি খাল ও নালা নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীন এসব প্রকল্প চললেও কোনো সুফল যে মিলছে না- চট্টগ্রামের চলমান জলাবদ্ধতা তারই প্রমাণ।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বারবার বলে আসছেন, বাংলাদেশের আর সব নগরের মতো চট্টগ্রাম নগরীও অপরিকল্পিত উন্নয়নের শিকার। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে নগরীর পার্শ্ববর্তী সমুদ্রের জোয়ারভাটা। দুয়ে মিলে সমস্যাটিকে একদিকে জটিল করেছে, আরেকদিকে অন্যসব শহরের জলাবদ্ধতার চেয়ে স্বতন্ত্রও করেছে। অর্থাৎ নিছক খাল ও নালা সংস্কার করে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ নগরীকে জলজট থেকে মুক্ত করা যাবে না। এ সমস্যার কার্যকর সমাধানের জন্য প্রয়োজন সবদিক বিবেচনা করে প্রণীত একটি মহাপরিকল্পনা এবং তার কার্যকর বাস্তবায়ন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এসব কথা আমাদের নীতিনির্ধারকদের কানে ঢুকেছে বলে মনে হয় না। তাই বিভিন্ন সরকারি সংস্থার পেশকৃত হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থহীন প্রকল্প পাস করতে তাদের কোনো দ্বিধা হয় না। যা-ই হোক, যে নগরী তার বন্দরের মাধ্যমে দেশের আমদানি-রপ্তানির ৮০ শতাংশেরও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে, সে নগরী এভাবে জলাবদ্ধতার কারণে দিনের পর দিন অচল থাকতে পারে না। শুধু চট্টগ্রাম নগরীর কোটি বাসিন্দাকে স্বস্তি দিতে নয়; জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থেও এর আশু সমাধান প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে অবিলম্বে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে আমরা প্রত্যাশা করি।

বিষয় : 'ভেজা' রশি টানাটানি

মন্তব্য করুন