প্রয়াত কূটনীতিক মহিউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে পরিচয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করার সময়। তখনও তাঁর কাজের প্রকৃত ধরন আমার জানা নেই। তাঁর সঙ্গে দেখা হয়, কিন্তু পরিচয় জানি না। বিভিন্ন অনুষ্ঠান কভার করতে গেলে দেখা হয়। একদিন শুনি, তিনি রাষ্ট্রদূত। চাকরির সুবাদে তাঁকে সারাবিশ্ব ঘুরে বেড়াতে হয়। মাঝে মাঝে দেশেও আসেন। ফরেন অফিসের কর্মকর্তা বললে যে একটা চেহারা মনের মধ্যে ভেসে ওঠে; ঠিক তেমন ছিলেন না তিনি। তেমন গৌরবর্ণের নন; শ্যামলা। কিন্তু কথা বলেন বুদ্ধিদীপ্ত।
দু'একবার দেখা হওয়া, কথা বলার মাঝেই তিনি আমাকে কেন জানি পছন্দ করে ফেললেন। বলা যায়, আমিই ঝুঁকে পড়লাম তাঁর দিকে। এর কারণ তাঁর কাছ থেকে যতটা না কূটনৈতিক বিষয় জানতে চাইতাম, তার চেয়ে বেশি তিনি বলতেন পত্রিকা নিয়ে, টেলিভিশন নিয়ে; পৃথিবীর সেরা সাংবাদিকদের নিয়ে। বড় বড় পত্রিকার বড় বড় সাংবাদিক নিজেরাই কীভাবে সংবাদ শিরোনাম হয়েছিলেন; বিভিন্ন সময় সেসব কাহিনি তিনি মুখস্থ বলতেন। কূটনীতিক মহিউদ্দিন দীর্ঘদিন দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদপত্র সংগ্রহ করে বাঁধাই করেও রাখতেন।
একটু শুচিবায়ু ছিল তাঁর, কিন্তু সেটা শারীরিক 'শুচিবায়ু' রোগ নয়। বড্ড বেশি পড়তেন তিনি আর মনে রাখতে পারতেন তার চেয়েও বেশি। ভুল বানান, তথ্য আর ভুল রেফারেন্স দেখলে ক্ষিপ্ত হতেন, যাকে আমি বলছি শুচিবায়ু। একবার দেখা হলে তিনি এক প্রথিতযশা সাংবাদিকের লেখার প্রসঙ্গ তুলে বললেন- এই তথ্যটি ঠিক নয়। রেফারেন্স হিসেবে যে বইয়ের কথা সাংবাদিক উল্লেখ করেছেন, সে নামে কোনো বই নেই। আমি বললাম, মানুষের কি ভুল হয় না? তিনি বললেন, 'হয়, তবে আমি তাঁর লেখা অনুসরণ করে দেখেছি এই বইটার নাম তাঁর কলামে প্রায়ই থাকে।' এমনই খুঁটিয়ে পড়তেন তিনি।
মহিউদ্দিন আহমেদের কথা উঠলে ১৯৭১ আর বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গ আসবেই। লন্ডনের পাকিস্তান হাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিব থাকা অবস্থায় তিনি পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করেন। তারপর তো লম্বা ইতিহাস। বঙ্গবন্ধু লন্ডন এলে মহিউদ্দিন আহমেদ তাঁর সঙ্গে থাকলেন পুরোটা সময়। সেসব প্রসঙ্গ খুব একটা বলতে চাইতেন না। তবে আমরা জানতে চাইতাম। পক্ষ ত্যাগের কথা বললে তিনি বলেছিলেন, লন্ডনের ট্রাফালগার স্কয়ারে জনতার সমাবেশে গিয়ে ১৯৭১ সালের ১ আগস্ট তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন- তিনি আর পাকিস্তানের সঙ্গে নেই।
কূটনীতিকের আরামদায়ক চাকরি ছেড়ে কেন স্বাধীনতাকামীদের পাশে দাঁড়ানো হলো; যখন যুদ্ধে বাঙালির জয়ও নিশ্চিত নয়? এমন প্রশ্নে মহিউদ্দিন আহমেদ আমাকে বলেছিলেন, 'সময়টাই এমন ছিল যে, স্বদেশপ্রেমের বাইরে আর কোনো বড় প্রেম বা আশার কথা আমাদের মনে আসেনি।' মহিউদ্দিন আহমেদসহ সেসব কূটনীতিক শুধু পক্ষ ত্যাগ করেননি; ট্রাফালগার স্কয়ারে হাজারো মানুষের সামনে তিনি এবং তাঁর সহযোদ্ধারা বাংলাদেশে পাকিস্তানের গণহত্যা ও বাঙালি নিপীড়নের বর্ণনা দিয়ে ব্রিটিশ জনমতকে প্রভাবিত করেছিলেন। যুক্তরাজ্যের পাকিস্তান দূতাবাসের পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। এখনকার বিচারে খুব সহজ মনে হলেও কাজটি সেই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। সবচেয়ে বেশি ছিল এক অনিশ্চিত জীবনের ঝুঁকি।
যতবার ১৫ আগস্ট বা ১৭ মার্চ এসেছে; আমার কোনো না কোনোভাবে কথা হয়েছে মহিউদ্দিন ভাইয়ের সঙ্গে; হয় কোনো লেখার জন্য বা টেলিভিশনে টকশোতে তাঁকে পাওয়ার জন্য। সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর তাঁকে প্রায় সব টেলিভিশন বা পত্রিকা এই যন্ত্রণা দিয়েছে। তবে তিনি না করতেন না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর কূটনৈতিক দর্শন; সদ্য স্বাধীন দেশের কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ; কীভাবে বাংলাদেশ চীনের মতো এমন একটি পরাক্রমশালী দেশের বিরোধিতা মোকাবিলা করে জাতিসংঘের সদস্যপদ পেল; কীভাবে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে যেতে পারল; কীভাবে নানা দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ল; সবই বলতেন দিন-তারিখ, ব্যক্তি, দেশ ও সংস্থার নাম উল্লেখ করে।
তবে তাঁর আবেগের জায়গাটি ছিল পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধুর লন্ডন আসা। ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডনে যান। সেখানে মহিউদ্দিন আহমেদসহ কয়েকজন কর্মকর্তা তাঁকে স্বাগত জানান। সাবেক পররাষ্ট্র সচিব, মুক্তিযোদ্ধা ও কলাম লেখক মহিউদ্দিন আহমেদ সেই সময়ের কথা বলতে গিয়ে অনেক সময় আবেগাপ্লুত হয়ে যেতেন। তিনি বলতেন, 'পেশাদার কূটনীতিক হিসেবে বিশ্বের অনেক দেশে দায়িত্ব পালন করেছি। এ সময় অনেক রাজা-বাদশা-প্রেসিডেন্ট-প্রাইম মিনিস্টারকে কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় আলোচনা, কথাবার্তা, সৌজন্য প্রকাশে তাঁদের ঘনিষ্ঠভাবেও দেখেছি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো এমন সাহসী, প্রজ্ঞা ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব; মাটি ও মানুষের প্রতি এমন মমত্ববোধ, দেশপ্রেম আমি কোথাও কারও মধ্যে দেখিনি।'
বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি লন্ডনে যান। ওইদিন ভোরে লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে যে তিনজন বাঙালি কূটনীতিক অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন; তাঁদের একজন ছিলেন মহিউদ্দিন আহমেদ। তাঁর ভাষায়, 'সেদিন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ যে সম্মান বঙ্গবন্ধুকে দেখিয়েছিলেন, তা আর কোথাও আমি দেখিনি। লন্ডনে ব্রিটিশ সরকার এবং জনগণকে ৭১-এ আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সমর্থন জানানোর জন্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাতে বঙ্গবন্ধু গিয়েছিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে। আলোচনা শেষে বঙ্গবন্ধু যখন তাঁর হোটেলে ফিরে আসছিলেন, তখন বঙ্গবন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে প্রথা ভেঙে ডাউনিং স্ট্রিটের বাইরে এসে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী রোলস রয়েস গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থাকেন যাতে বঙ্গবন্ধু গাড়িতে উঠতে পারেন।' টেলিভিশন টকশোতে মহিউদ্দিন আহমেদ সেই ছবিটি সঙ্গে করে আনতেন আমাদের দেখানোর জন্য। কথা বলতে আসতেন অনেক অনেক রেফারেন্স নিয়ে।
মহিউদ্দিন আহমেদ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাঁর কূটনৈতিক জীবন চালু রাখেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে। জাতিসংঘসহ অনেক সংস্থা ও বিভিন্ন দেশে তিনি সুনামের সঙ্গে কাজ করেছেন। ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাঁকে মিথ্যা অভিযোগে চাকরিচ্যুত করা হয়। তাঁর একমাত্র দোষ ছিল তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং বঙ্গবন্ধুর অনুগত সহযোদ্ধা। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় ফিরলে তাঁকে আবার চাকরিতে ফেরানো হয়। ২০০১ সালে অবসরে যান। মহিউদ্দিন আহমেদ মুক্তিযুদ্ধ ও তাঁর সরকারি চাকরি শেষ হওয়ার পরও বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কাজ করে গেছেন। পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখেছেন, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ নিয়ে বই লিখেছেন। বিএনপি আমলে নির্যাতিত হয়েছেন, কিন্তু খুব চড়া গলায় সেটা তিনি বলতেন না।
তিনি ছিলেন এক অভাবনীয় সৎ মানুষ। মিথ্যা কথা মানতে কষ্ট হতো তাঁর। এ কারণে অনেকেই তাঁকে সইতে পারত না। একবার এক টকশোতে তিনি পেয়েছিলেন তাঁরই এক সাবেক সহকর্মীকে, যিনি লন্ডনে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতি নিয়ে লাইভে নানা কথা বলছিলেন। বঙ্গবন্ধুর লন্ডনের সেই সময়টায় ওই ভদ্রলোকের কোনো ভূমিকাই ছিল না, অথচ বলে যাচ্ছেন বিরতিহীনভাবে। মহিউদ্দিন ভাই পরে আমাকে বলেছিলেন, এর সঙ্গে আমাকে আর ডাকবেন না। নীতির প্রশ্নে তিনি আপসহীন ছিলেন এবং সত্য বলতে কখনও কুণ্ঠিত হতেন না। তাঁর ফেসবুক যদি কেউ ফলো করে থাকেন তবে দেখবেন, আদর্শবাদী মানুষের মতো বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ঠ ভক্ত হয়েও আওয়ামী লীগ সরকারের নীতিকৌশলের সমালোচনা করতেন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অনেকের নাম নানাভাবে লিপিবদ্ধ আছে। মহিউদ্দিনের নামও আছে তাঁর মতো করে। বৈরী সময়ের অকুতোভয় কূটনৈতিক যোদ্ধাকে স্যালুট জানাই।
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা: সাংবাদিক