আজ আওয়ামী লীগের ৭৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠাকালে আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে প্রতিষ্ঠিত দলটির সভাপতি ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী; শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন যুগ্ম সম্পাদক। বঙ্গবন্ধু তখনও জেলে। পরে তিনি দলটির সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি হন।
আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য। দলটির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে সেই সংগ্রামের পথ বেয়েই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল বাঙালির তথা বাংলাদেশের মানুষের উন্নয়ন ও কল্যাণ। আমরা চাই সেই লক্ষ্যে দলটি এগিয়ে যাক। কিন্তু ইতিহাস থেকে দেখা গেছে, এই দলের বাইরে তো তাদের শত্রু আছেই; এমনকি ভেতরেও অনেক শত্রু ঘাপটি মেরে আছে। আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই নানা ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করছে। বস্তুত মানব সূচনা থেকেই ষড়যন্ত্র শুরু হয়। এমনকি বলা হয়, পৃথিবীতে যখন কোনো যন্ত্র আবিস্কৃত হয়নি; তখন একটি যন্ত্র আবিস্কার হয়। সেটি হলো 'ষড়যন্ত্র'। আওয়ামী লীগ নিয়ে যে ষড়যন্ত্র হয়- বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডই তার প্রমাণ। আমরা দেখেছি, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কাজ করেছে খন্দকার মোশতাক গং। তারাই বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল। এমনকি যারা বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল, তারাই রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য পেয়েছিল। এখনও সে ষড়যন্ত্র শেষ হয়ে যায়নি।
তবে একটি রাজনৈতিক দলের যে শক্তি থাকা উচিত; আওয়ামী লীগের সে শক্তি রয়েছে। তৃণমূলের সমর্থন নিয়েই আওয়ামী লীগ সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে। আমাদের মনে আছে, এক-এগারোর সময় গণতন্ত্র অভিবাসনে পাঠানোর চক্রান্ত হয়। শেখ হাসিনাকে কারান্তরীণ করা হয়। সে সময় আওয়ামী লীগ নেতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান ও সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন থেকে যে বার্তা দেন; তাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়। তত্ত্বাবধায়কের সময় আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা সংস্কারের কথাও বলছিলেন। কিন্তু তৃণমূলের শক্তির কারণেই শেখ হাসিনা মুক্তি পান। সে শক্তি আমরা এরশাদের সময়েও দেখেছি। তখন নূর হোসেন গায়ে লিখেছিলেন- স্বৈরাচার নিপাত যাক/ গণতন্ত্র মুক্তি পাক। গণতন্ত্রের আন্দোলনে নূর হোসেন প্রাণ দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু যে সংবিধান প্রণয়ন করেছিলেন, সেখানে শুরুতেই রয়েছে- এই প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ। নূর হোসেনও তাই অগণতান্ত্রিক, স্বৈরশাসন মেনে নিতে পারেননি। এর আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের জনগণের অধিকার নিশ্চিতে যে ৬ দফা দিয়েছিলেন, সে আন্দোলনে মনু মিঞাসহ অনেকেই প্রাণ দিয়েছিলেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল সে অধিকারের লড়াই। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ৩০ লাখ মানুষ প্রাণ দিয়েছিল। মনে রাখতে হবে, সেই চেতনাতেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আওয়ামী লীগ।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার তার পথচলার এ পর্যায়ে যে পদ্মা সেতু নির্মাণ করেছে, তার লক্ষ্যও জনগণের অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করা। আর এক দিন পরই উন্নয়নের সেই 'ল্যান্ডমার্ক' পদ্মা সেতুর উদ্বোধন। এ সেতুটি নির্মাণ সম্ভব হয়েছিল শুধু শেখ হাসিনার একক দূরদর্শিতা ও সততার কল্যাণে। এ পথেও প্রতিবন্ধকতা ছিল। বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকার মতো উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো মিথ্যা অপবাদ দিয়ে পিছিয়ে গেলেও শেখ হাসিনার দৃঢ় প্রতিজ্ঞায় পদ্মা সেতু আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। শেখ হাসিনা জনগণের প্রয়োজন বুঝতে পেরেছিলেন। এ সেতুর মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হবে। প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির বিষয়টি বলাই বহুল্য।
আওয়ামী লীগের সমস্যা হলো দলের মধ্যে কিছু সুবিধাবাদী গোষ্ঠী। এ গোষ্ঠীটি সুযোগ নিতে চেষ্টা করে। তারা দলের মধ্যে থেকে মীরজাফর ও খন্দকার মোশতাকের মতো চক্রান্ত করছে। তারা মুখে মুখে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কথা বললেও মনে তা ধারণ করে না। এদেশের মাটিতে জন্ম হলেও তারা দেশের চিন্তা না করে অর্থ পাচার করে। পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনা দরকার।


আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িক দল হলেও দলের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা অনেকের মধ্যে সে চেতনা অনুপস্থিত থাকার বিষয়টিও কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বঙ্গবন্ধু যে চারটি দর্শন দিয়ে গেছেন, এর মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ। তারা নামে আওয়ামী লীগ হলেও কাজে সুযোগসন্ধানী। অওয়ামী লীগে সাম্প্রদায়িকতার কোনো স্থান নেই। মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মান রক্ষার রাষ্ট্রীয় যে দায়িত্ব; সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ কঠোর। যারা সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়ায়, তাদের বিরুদ্ধে তাই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। আমি মনে করি, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুঝতে সবার তিনটি বই পড়া জরুরি- অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা এবং আমার দেখা নয়া চীন। বঙ্গবন্ধুর এ বইগুলো আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের তো বটেই; অন্যদেরও পড়া উচিত। তাহলে আমরা বুঝব বঙ্গবন্ধু কেমন মানুষ ছিলেন; তিনি বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামে কতটা ত্যাগ-তিতিক্ষা করেছেন এবং কেমন মানুষ চাইতেন।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের জানা জরুরি- বঙ্গবন্ধু দুটি জিনিস চেয়েছিলেন। একটি হলো স্বাধীন দেশ এবং অন্যটি সোনার মানুষ। দেশ স্বাধীন হওয়ার মাধ্যমে তাঁর প্রথম স্বপ্ন পূরণ হয়। কিন্তু বিভিন্ন বক্তব্যে তিনি যে সোনার মানুষের কথা বলেছিলেন, সেখানে আমাদের অবস্থান দেখতে হবে। বঙ্গবন্ধু বাংলা একাডেমিতে এক বক্তৃতায় শিক্ষক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীদের সম্মেলনে বলেছিলেন, আমি সোনার মানুষ চাই এবং আপনারাই সে সোনার মানুষ তৈরি করবেন। বঙ্গবন্ধু দলের কাউন্সিলে নেতাকর্মীদেরও সেটা বলেছেন।
এখন আওয়ামী লীগের কাজে জোর দেওয়ার জায়গাও সেটাই- সোনার মানুষ হওয়া এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করা। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নেতাদেরকে ষড়যন্ত্রের ব্যাপারেও সতর্ক থাকতে হবে। চলার পথে এই অগ্রযাত্রায় কোনো চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র যেন আওয়ামী লীগকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে না পারে। কারণ আওয়ামী লীগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া মানে বাংলাদেশের মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া মানে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। কাজেই দেশ, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, বঙ্গবন্ধুর চেতনা কোনোভাবেই যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে আওয়ামী লীগের সব নেতাকর্মীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। শেষ করব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার একটি অংশ দিয়ে- 'যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে, মুক্ত করো হে বন্ধ।' সবার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক: সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়