বাংলাদেশের অব্যাহত উন্নয়ন অভিযাত্রায় এবার বিশ্বের কাছে বিস্ময় জাগানো মাইলফলক অর্জন যোগ হচ্ছে আজ। প্রধানমন্ত্রী তাঁর স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধন করতে যাচ্ছেন। পদ্মা সেতু একদিকে যেমন এক সময়ের ৮৮ শতাংশ বৈদেশিক সাহায্যনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার ইতিহাস সৃষ্টির সেতু, তেমনি ষড়যন্ত্র ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সাহস ও সততার উদাহরণ সৃষ্টিরও সেতু। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একজন দূরদর্শী নেতা। প্রমত্ত পদ্মা নদীর ওপর সেতু একটি নির্মাণ তাঁর দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন। কারণ পদ্মা সেতু নির্মিত হলে দেশের তা শুধু দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটাবে না, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিরাট অবদান রাখবে। কৃষি-শিল্প-অর্থনীতি-শিক্ষা-বাণিজ্য সব ক্ষেত্রেই এই সেতুর বিশাল ভূমিকা থাকবে। এ অঞ্চলকে ট্রান্স এশিয়ান হাইওয়ে ও ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ের সঙ্গে যুক্ত করবে। ভারত, ভুটান এবং নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক কানেক্টিভিটি প্রতিষ্ঠিত হবে। মোংলা বন্দরের গুরুত্ব বেড়ে যাবে বহুগুণ। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পর্যটনসহ শিল্পের প্রসার ঘটবে। বিশ্বব্যাংকের স্বাধীন পরামর্শক এবং সেতু বিভাগের নিয়োজিত পরামর্শক সংস্থার সমীক্ষায় বলা হয়, পদ্মা সেতু নির্মিত হলে জিডিপি বৃদ্ধি পাবে ১ দশমিক ২৩ শতাংশ। এ ছাড়া দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিডিপি বৃদ্ধি পাবে ২ দশমিক ৩ শতাংশ।

১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হলে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে অগ্রাধিকার তালিকায় স্থান পায় প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের পদ্মা সেতু। ১৯৯৯ সালে পদ্মা সেতুর প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। ২০০১ সালের ৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় পদ্মা সেতু প্রকল্পের বাস্তবায়নের শুরু সরল পথে হয়নি। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র এই সেতুর বাস্তবায়নকে বাধাগ্রস্ত করে। যাহোক, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু নির্মাণের এতটাই আগ্রহী ছিলেন যে, ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে পদ্মা সেতু নির্মাণ অঙ্গীকার আকারে অন্তর্ভুক্ত করেন। দেশের মানুষের সৌভাগ্য যে, ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়। তিনি আবারও পদ্মা সেতু নির্মাণ অগ্রাধিকার দিয়ে তার বাস্তবায়ন দ্রুততর করার উদ্যোগ নেন।

দুঃখজনক হলেও সত্য, বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পদ্মা সেতু প্রকল্প দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়। ২০১১ সালে বিশ্বব্যাংক অভিযোগ করে, তারা পদ্মা সেতু প্রকল্পে 'বিশ্বাসযোগ্য' দুর্নীতির ষড়যন্ত্র খুঁজে পেয়েছে, উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ অভিযোগের ব্যাপারে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন এবং বিশ্বব্যাংককেই অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করতে বলেন। বিশ্বব্যাংক কানাডিয়ান এসএনসি-লাভালিনের বিরুদ্ধে কানাডিয়ান রয়্যাল মাউন্টেড পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করে। পরে কানাডিয়ান আদালতে একটি মামলা দায়ের করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালের ২৯ জুন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট রবার্ট জোয়েলিক পদ্মা সেতুর ঋণ বাতিল করেন। প্রশ্ন হলো, যে প্রকল্প ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ তার বাস্তবায়নে তো একটি টাকাও রিলিজ করা হয়নি। তাহলে দুর্নীতি কোথায়? আসলে এর নেপথ্যে ছিল সুগভীর ষড়যন্ত্র। ঋণ বাতিলের এই সিদ্ধান্ত শুধু বিশ্বব্যাংকের একার নয়, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কুশীলবদের প্রভাব এতে কাজ করেছে।

বিশ্বব্যাংকের ঋণ বাতিল-পরবর্তী কার্যক্রমগুলোর ওপর আলোকপাত করলে ষড়যন্ত্রের গভীরতা আরও স্পষ্ট হবে। পুনরায় ঋণ পেতে বিশ্বব্যাংক সরকারকে একের পর শর্ত দিতে থাকে। বিশ্বব্যাংকের দাবি অনুসারে সরকার সৈয়দ আবুল হোসেনকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। সেতু বিভাগের সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াকে গ্রেপ্তারের দাবি তোলে এবং তাঁকে কারাগারে যেতে হয়। তিনি চাকরিও হারান। প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমানকে ছুটিতে যেতে হয়। এত কিছুর পরও বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ সহায়তা পাওয়ার ব্যাপারে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। লক্ষণীয় যে, দেশের আলোচ্য চিহ্নিত বিরোধী রাজনীতিক, নোবেল লরিয়েটসহ সুশীল সমাজের কিছু ব্যক্তি পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণে সচেষ্ট হন। তাঁরা বিবৃতিও দেন। পুনরায় ঋণ পেতে নেপথ্যের ষড়যন্ত্র আঁচ করতে পেরে প্রধানমন্ত্রী কঠোর অবস্থান নেন। তিনি ২০১২ সালের জুলাইয়ে জাতীয় সংসদে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন। এটি ছিল সময়োপযোগী সাহসী উচ্চারণ। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালে ৩১ জানুয়ারি অর্থমন্ত্রী এ এম এ মুহিত বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট এবং এডিবি, জাইকা এবং আইডিবিকে লেখা দুটি পত্রে পদ্মা সেতু প্রকল্পে তাদের অর্থায়নের প্রয়োজন নেই বলে সরকারের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দেন। ২০১৫ সাল থেকে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর কাজ শুরু হয়। এই নির্মাণযজ্ঞ চলার মধ্যেই কানাডার ফেডারেল কোর্টের রায়ে বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতির অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়। সরকার সাত বছরে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয়। অর্থনীতিবিদসহ অনেকেই বলেছিলেন, নিজস্ব অর্থায়নের পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে গিয়ে বাংলাদেশ বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকির মধ্যে পড়তে যাচ্ছে। তা হয়নি। প্রকৃত সত্য হলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ়তা, সাহস ও সততার কাছে ষড়যন্ত্র পরাভূত হয়েছে।

জুনাইদ আহমেদ পলক: তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য
me@palak.net.bd