এটা ঠিক, গঙ্গা উপমহাদেশের তিন প্রধান নদীর অন্যতম। দৈর্ঘ্যেও বাকি দুটির- ব্রহ্মপুত্র ও সিন্ধু- পিছিয়ে। কিন্তু জলে কিংবা জীবনে, আর্থসামাজিকতা কিংবা আধ্যাত্মিকতায় গঙ্গা উপমহাদেশ তো বটেই, যেন বিশ্বের বাকি সব নদী থেকে এগিয়ে। প্রাচীন আর্য সভ্যতা থেকে ইংরেজ শাসনামল পর্যন্ত গঙ্গা নদীকে ঘিরে ভারতীয় উপমহাদেশে যে ভূ-রাজনৈতিক চক্র আবর্তিত হয়েছে, তারও তুলনা মেলা ভার। বস্তুত গঙ্গা নিছক রক্ত-মাংসের নদী নয়। ভারতীয় পুরাণে যে দুটি নদী দেবীর মর্যাদায় পূজিত হয়, গঙ্গা তার একটি। অপরটি সরস্বতী, সে ভিন্ন প্রসঙ্গ।
গঙ্গার পৌরাণিক জন্মকাহিনিও চমকপ্রদ। পুরাণমতে, গঙ্গা দেবী হিসেবে ছিলেন স্বর্গে তথা ঊর্ধ্বলোকে। এখনও যে 'আকাশগঙ্গা' দেখা যায়, তা সেই প্রবাহেরই স্মৃতি। অযোধ্যার রাজা সগরের ষাট হাজার পুত্র তাদের অশ্বমেধ যজ্ঞের হারিয়ে যাওয়া ঘোড়া খুঁজতে পাতালে গিয়ে কপিল মুনীর ক্রোধে ভস্মীভূত হয়। সগর রাজা জানতে পারেন, আকাশগঙ্গা যদি মর্ত্যে বা ভূলোকে নেমে পাতালে গিয়ে পুত্রদের স্পর্শ করলে তাঁরা বেঁচে উঠবেন। কিন্তু বংশপরম্পরায় সাধনা করেও তা সম্ভব হয়নি। পরে ওই বংশের এক রাজা ভগীরথ কঠিন সাধনায় ব্রহ্মাকে সন্তুষ্ট করে স্বর্গ থেকে গঙ্গাকে মর্ত্যে আনতে সক্ষম হন। তবে গঙ্গা হিমালয়ে নামার সময় শিবের জটায় আটকে যান। ভগীরথ তারও সাধনা করে ছাড়িয়ে আনেন গঙ্গাকে।
ভারতের 'গঙ্গা' বাংলাদেশে এসে 'পদ্মা' কেন? লোককাহিনিতে ফিরি। ভগীরথের পিছু পিছু সাগর তথা পাতালের দিকে যেতে থাকে। ভগীরথ বঙ্গে এসে গঙ্গাকে বসিয়ে রেখে কোন পথে সাগরে যাওয়া সহজ হবে, দেখতে যায়। এরই মধ্যে পদ্মার শঙ্খধ্বনি শুনে গঙ্গা সেদিকে হাঁটা দেয়। এই হচ্ছে গঙ্গা বিভক্ত হয়ে একটি ধারা ভাগীরথী নামে পশ্চিমবঙ্গ এবং অপরটি ও প্রধান ধারাটি পদ্মা নামে পূর্ববঙ্গ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার পৌরাণিক ইতিহাস। পরে উভয়ই ভিন্ন পথে সাগরে গিয়ে পাতালে মিলিত হয় এবং গঙ্গার জল-স্পর্শে ভগীরথের ষাট হাজার পূর্বপুরুষ পুনরুজ্জীবন লাভ করে। গঙ্গাজল তাই এখনও হিন্দু অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ।
প্রসঙ্গত, গঙ্গার সঙ্গে সংযোগ রয়েছে, এমন সব নদীর পানিও একই পবিত্রতার অংশ। এ ছাড়া পুরাণমতে, বিশেষ বিশেষ তিথিতে প্রায় প্রতিটি নদীই গঙ্গার মর্যাদা লাভ করে। এ জন্যই সম্ভবত, বিশেষত বঙ্গে 'গঙ্গা' নামাঙ্কিত নদীর ছড়াছড়ি, যেমন- আদিগঙ্গা, নবগঙ্গা, কালীগঙ্গা, বুড়িগঙ্গা, তুলশীগঙ্গা, পোড়াগঙ্গা, গঙ্গাজলী, গঙ্গারাম, গঙ্গাধর, রামগঙ্গা, নারায়ণীগঙ্গা, কাষ্টগঙ্গা।
মূল গঙ্গা ও এর শাখা-প্রশাখারও রয়েছে আক্ষরিক অর্থেই শতাধিক নাম। যেমন ভগীরথের সাধনায় গঙ্গা স্বর্গ থেকে নেমে এসেছে বলে এর অপর নাম ভাগীরথী। আবার শিবের জটা থেকে মুক্ত হয়েছে বলে এর আরেকটি নাম অলকানন্দা তথা শিবের কেশ-পুত্রী। আধুনিক ভূগোলেও দেখা যায়, দেবপ্রয়াগে মিলিত হয়েছে ভাগীরথী ও অলকানন্দা নদী। দেবপ্রয়াগ থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত- পথে বিভিন্ন ঘটনা ও উপলক্ষে আরও নানা নাম ধারণ করে গঙ্গা। হিন্দুধর্মীয় শাস্ত্রে একত্রে বলা হয় 'অষ্টোত্তর শত নামাবলী' বা গঙ্গার ১০৮টি নাম।
গত শতাব্দীর ষাটের দশকে গঙ্গার গতিপথ ধরে ভারতের বর্তমান উত্তরাখন্ড রাজ্যের হরিদ্বার থেকে পশ্চিমবঙ্গে ভাগীরথীর মোহনা পর্যন্ত ভ্রমণ করেছিলেন খ্যাতিমান ইংরেজ ভ্রমণ লেখক এরিক নিউবাই। ১৯৬৬ সালে পিকাডোর প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর সেই বিচিত্র অভিজ্ঞতা 'স্লোললি ডাউন দ্য গ্যাঞ্জেস'। ওই গ্রন্থের সূচনাতেই রয়েছে গঙ্গার ১০৮ নামের তালিকা। প্রথম নামটি অবশ্যই গঙ্গা, আর শেষ নামটি 'অজানা-তিমির-ভানু'। ভেঙে বললে, অজ্ঞতার আঁধারে উদিত আলোক-রেখা। দুর্ভাগ্যবশত, খোদ গঙ্গাই এখন দখল, দূষণ, বাঁধ, ব্যারাজের অজ্ঞতায় নিমজ্জিত।
ভারতের গঙ্গা বাংলাদেশে পদ্মায় রূপান্তরের পৌরাণিক ইতিহাস কেবল আধ্যাত্মিকতার নয়। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে প্রাচীন আর্থসামাজিক বাস্তবতাও। গঙ্গা যেখানে আর্য দেবী, পদ্মা বা মনসা সেখানে অনার্য দেবী। পুরাণে তাঁর স্থান নেই বলেই লোকসাহিত্যে স্থান করে নিয়েছেন। অভিজাত পূজারির গৃহে পদ্মা পূজিত না হওয়ার ক্ষোভ থেকেই পূর্ববঙ্গে মনসামঙ্গলে ছড়াছড়ি।
খোদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও পদ্মাকে তুলনা করেছেন 'সাব অল্টার্ন' দেবী কালীর সঙ্গে। তাঁর 'পদ্মা' নামের বজরা দিয়ে শিলাইদহ থেকে শাহজাদপুর যেতে যেতে উনিশ শতকের পদ্মা নিয়ে ছিন্নপত্রে লিখেছেন- 'তাকে মনে করলে আমার কালীর মূর্তি মনে হয়- নৃত্য করছে, ভাঙছে, এবং চুল এলিয়ে দিয়ে ছুটে চলছে।'
অভিন্ন নদীর অংশ হলেও গঙ্গা ও পদ্মা যে ভিন্ন চরিত্রের, সে কথা লিখেছেন রবীন্দ্রনাথেরই শিষ্য প্রমথনাথ বিশী। 'শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথ' (১৩৭৯) গ্রন্থে তিনি লিখেছেন- 'গঙ্গা চলেছে দুই কূলের বন্ধন রক্ষা করে, শাস্ত্র এবং আচারের শাসন স্বীকার করে, দেশে দেশে মুক্তি বিতরণ করে শাপে ভস্মীভূত সগর রাজার দুর্বিনীত সন্তানদের মুক্তিদানের উদ্দেশ্যে। পদ্মা মুক্তিদান করে না, মুক্ত করে। সে শৃঙ্খলকে করে ঊর্ণতন্ত্র, পায়ের বেড়িকে করে পাঁয়জোর, কৃষককে করে কিরীচধারী, করণিককে করে শস্ত্রপাণি...। ...গঙ্গা শান্তি আর পদ্মা অশান্ত।'
বলা বাহুল্য, বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে গঙ্গা ও পদ্মা এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে। সেই চর্যাপদের কবি ডোম্বী পাদ বলছেন- 'গঙ্গা জঔনা মাঝেঁরে বহই নাই।' রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পদ্মা নদীর যে নৈকট্য গড়ে উঠেছিল, সেটা কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে এভাবে- 'ওরে পদ্মা, ওরে মোর রাক্ষসী প্রেয়সী/ লুব্ধ বাহু বাড়াইয়া উচ্ছ্বসি উল্লসি।' আর সংগীতে কাজী নজরুল ইসলাম 'পদ্মার ঢেউ রে/ ও মোর শূন্য হৃদয়-পদ্ম নিয়ে যা যা রে' বলে যে লহরি সৃষ্টি করেন, তা কেবল পদ্মাকে নিয়েই সাজে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম পদ্মা নদীর যে রোমান্টিক চিত্র অঙ্কন করেন, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সেটাকে বাস্তবের কঠিন জগতে ফিরিয়ে আনেন। তাঁর পদ্মা রক্ত-মাংসের মানুষের সম্মিলনীস্থল মাত্র। এই নদী নিয়ে লেখেন 'পদ্মা নদীর মাঝি'। এই নদীর সঙ্গে জড়িত জীবন ও জীবিকা। তাদের ঘিরে শোষক ও শোষিতের লড়াইয়ের সমাজ-কাঠামো তাই নদীর মতোই আবহমান।
জীবনানন্দ দাশ স্পষ্টতই সমাজের সঙ্গে ইতিহাসও মেলান, পুরাণের সঙ্গে পরানের সংযোগ ঘটান, পদ্মাকে ঘিরে সভ্যতার উত্থান-পতনের দিকে লক্ষ্য রাখেন। তাই তিনি লেখেন, 'গভীর অন্ধকারে ঘুম থেকে নদীর চ্ছল চ্ছল শব্দে জেগে উঠলাম আবার;/ তাকিয়ে দেখলাম পাণ্ডুর চাঁদ বৈতরণীর থেকে তার অর্ধেক ছায়া/ গুটিয়ে নিয়েছে যেন/ কীর্তিনাশার দিকে।' (অন্ধকার)।
এই 'কীর্তিনাশা' পূর্ববঙ্গীয় পদ্মার আরেকটি নাম। পদ্মা কেবল ভাগীরথী থেকে ভাগ হয়ে আসেনি, ভূগোলের ফেরে ব্রহ্মপুত্র তথা যমুনার সঙ্গেও মিশেছে। গোয়ালন্দের কাছে যমুনা এসে মেশে গঙ্গার সঙ্গে। দুই নদী মিলে সৃষ্টি করে আক্ষরিক অর্থেই 'প্রমত্তা পদ্মা'। অনেক মনে করেন, ভাগীরথীর সঙ্গে বিযুক্ত হওয়ার বা বাংলাদেশের প্রবেশের পর থেকেই বুঝি গঙ্গার নাম পদ্মা। কিন্তু দাপ্তরিকভাবে যমুনার সঙ্গে মিলিত হওয়ার আগ পর্যন্ত গঙ্গা নামই বহাল। যে কারণে রাজবাড়ী এলাকায় প্রস্তাবিত ও বর্তমানে স্থগিত জল-স্থাপনাটির নাম 'গঙ্গা ব্যারাজ'। এই মিলিত স্রোতকে যে অনেক সময় দেশের সবচেয়ে খরস্রোতা নদী বলা হয়, তাতে অত্যুক্তি নেই। কারণ, উপমহাদেশের দুই বিপুলা নদীর স্রোত এর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। বিশেষত, ১০-১৫ কিলোমিটার চওড়া যমুনা যেভাবে গঙ্গাসহ পদ্মার অপেক্ষাকৃত সরুপথে প্রবাহিত হয়, তা বিস্ময়কর। উনিশ শতকের গোড়ায় ব্রহ্মপুত্রের গতিপথ পরিবর্তনে যমুনা সৃষ্টি এবং গঙ্গার সঙ্গে মিলিত হয়ে পদ্মার মধ্য দিয়ে বের হয়ে যাওয়ার সময় স্বভাবতই বিক্রমপুরের প্রাচীন ও সমৃদ্ধ জনপদ তছনছ করে গিয়েছিল। তখন থেকেই এর নাম 'কীর্তিনাশা'।
কীর্তিনাশা পদ্মার বুকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কারিগরি সক্ষমতার কীর্তি হিসেবে প্রতীক হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে গেল পদ্মা সেতু। এই প্রমত্তা নদীকে বশে আনা কিংবা বুকের গভীরে খুঁটি বসানো যে সম্ভব, তাও আবার নিজস্ব অর্থায়নে- কয়েক দশক আগে তা চিন্তা করাও কঠিন ছিল। এখন সেটা আরূঢ় বাস্তব।
পদ্মা নদী যেমন, অভিন্ন নামের সেতুটিও তাই- সমীহ-জাগানিয়া।
লেখক :গবেষক; মহাসচিব, রিভারাইন পিপল