এতদিন মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাট নদী পার হতে আসা মানুষের ভিড়ে ঠাসা ছিল। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় এখন সেই ঘাট রূপ নেবে নিস্তব্ধতায়। তবে এ ঘাট রাতে পরিণত হয় নাগরিক ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলার কেন্দ্র হিসেবে। পদ্মা সেতু ঘিরে পর্যটকের পদভারে আবারও মুখর হবে আশপাশের এলাকা। এ ছাড়া দক্ষিণবঙ্গের দৃষ্টিনন্দন স্থানগুলোতে বাড়বে পর্যটক। এতে প্রাণ পাবে এ বিস্তীর্ণ এলাকার পর্যটন।

শিমুলিয়া ঘাটের হোটেল ব্যবসায়ী নুর হোসেন বলেন, ঘাটের পালা শেষ হলেও নদীর ধারে বেড়াতে আর ইলিশ খেতে আসা মানুষের আনাগোনায় পর্যটন জমবে পদ্মা সেতুর পথে। এখন তাঁরা সেই আশাতেই বুক বাঁধছেন।

আদি পেশা বদল করে মাওয়া-জাজিরার অনেকেই এখন পর্যটনকেন্দ্রিক নতুন ব্যবসায় ঝুঁকছেন। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের পর্যটনের উদ্যোক্তারাও নতুন সেবা দেওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন।

পদ্মা সেতু চালুর ফলে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রসৈকত কুয়াকাটায়, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরার উপকূলজুড়ে অবস্থিত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনও নতুন রূপে জেগে উঠবে। পাশাপাশি শ্বাসমূলীয় বনাঞ্চল বরগুনার তালতলী উপজেলার টেংরাগিরি, শুভসন্ধ্যা সৈকত, পাথরঘাটার হরিণঘাটা বন, সমুদ্রসৈকত, বরিশালের দুর্গাসাগর দিঘি, সাতলার শাপলাবিল, পিরোজপুর ও ঝালকাঠির ভাসমান পেয়ারা বাজার, ভোলার চর কুকরী মুকরী, মনপুরা হতে পারে পর্যটকদের নতুন গন্তব্য।

কুয়াকাটা ট্যুর গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কে এম বাচ্চু বলেন, আগামী দিনে পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে এতে কোনো সন্দেহ নেই। এ কারণে আমরা ট্যুর গাইডের সংখ্যা যেমন বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছি, তেমনি গাইডদের প্রশিক্ষণ দিয়ে পর্যটকের সেবায় নিয়োজিত করারও চেষ্টা রয়েছে।

ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব) সভাপতি শিবলুল আজম কোরেশী বলেন, পদ্মা সেতু ঘিরে পর্যটনের বড় একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্য যে পর্যটন স্পটগুলো রয়েছে, সেগুলোর জন্যও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। পাশাপাশি পদ্মার দুই পাড়েও নতুন নতুন স্পট তৈরি হবে। এখানকার মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নেও পদ্মা সেতু বড় ভূমিকা রাখবে।

পদ্মা সেতু চালুর আগেই দুই পাড়ের সংযোগ সড়কের উভয় পাশেই শুরু হয়েছে পর্যটকদের জন্য নানা বিনোদনের আয়োজন। স্থানে স্থানে চা-কফির দোকান, খাবার হোটেল, বিশ্রামাগার, সুদৃশ্য যাত্রী ছাউনিও নির্মাণ করা হয়েছে। ফরিদপুরের ভাঙ্গার চার রাস্তা মোড়ে গোল চত্বরের পাশে নির্মাণ করা হয়েছে দর্শনার্থীদের জন্য আকর্ষণীয় কয়েকটি স্পট। বরিশালের দপদপিয়া, বিমানবন্দর, গড়িয়ার পাড়, শিকারপুর এলাকায় মহাসড়কের দুপাশে বেসরকারি খাতে অবকাঠামো উন্নয়ন চলছে একের পর এক। আর এসবই হচ্ছে পদ্মা সেতুকে টার্গেট করে। জাজিরার নাওডোবা থেকে শিবচরের মাদবরচর পর্যন্ত পদ্মা সেতুর জন্য নির্মিত সাড়ে ১০ কিলোমিটার নদীশাসন এলাকা এখন দৃষ্টিনন্দন বিনোদনকেন্দ্র। খুব কাছ থেকে সেতু দেখার জন্য সেখানে প্রতিদিন শত শত মানুষ ভিড় করছেন।

শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক পারভেজ হাসান বলেন, এ অঞ্চলে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের কাজে লাগিয়ে পর্যটনের বিস্তার ঘটাতে চাই। সে জন্য সরকার সব ধরনের পদক্ষেপ নেবে।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের সহকারী পরিচালক মাজহারুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ৪০ লাখ পর্যটক আসেন। তাঁদের বেশিরভাগ সুন্দরবন ও উত্তরবঙ্গে চলে যান। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর এ অঞ্চলের যোগাযোগ অনেক সহজ হবে। তখন পর্যটকদের এ অঞ্চলমুখী করার চেষ্টা করতে হবে।