অবশেষে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হয়ে গেল। আজ ভোর ৬টা থেকে সেতুর ওপর দিয়ে যানবাহন চলাচল শুরু হলো। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণ করে বিশ্বদরবারে নিজের সক্ষমতা তুলে ধরতে পেরেছে। ব্রাজিলের আমাজান নদীর পরে বিশ্বের দ্বিতীয় খরস্রোতা নদী পদ্মার বুকে সেতু নির্মাণ অত সহজ ছিল না। আকাশে মেঘ জমলে যে নদীতে ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়; সে নদীতে খুঁটি স্থাপন কতটা কঠিন ছিল, তা যাঁরা নদী ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাঁরাই বোঝেন।

'নদী ব্যবস্থাপনা' কথাটির সঙ্গে আমরা অত বেশি পরিচিত নই। কারণ এদেশের প্রায় সব বয়সের মানুষই 'নদীশাসন' কথাটির সঙ্গে পরিচিত। বুয়েটের পানিসম্পদ প্রকৌশল বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক, পদ্মা সেতু প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সদস্য অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাতের একটি সাক্ষাৎকার ২৫ জুন সমকালে প্রকাশিত হয়েছে। সমকাল থেকে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়- নদী ব্যবস্থাপনার কাজটি কীভাবে করলেন? জবাবে এ বিশেষজ্ঞ বলেন, 'ভালো যে, আপনি নদীশাসন বলেননি। আমিও মনে করি না যে, রিভার ট্রেইনিংয়ের বাংলা নদীশাসন। কিন্তু সেটা চালু হয়ে গেছে। নদীকে কখনও শাসন করা যায় না। পদ্মার মতো নদীকে তো শাসন করতে পারার প্রশ্নই আসে না।' নদীকে শাসন করা যায় না; অথচ চালু হয়ে যাওয়ার কারণে এ ভুল শব্দটির ব্যবহার যুগ যুগ ধরে হয়ে যাচ্ছে। আমাদের মূলধারার সংবাদমাধ্যমও সেই প্রচলিত ভুল থকে বের হয়ে আসতে পারেনি। এদেশ ১৯০ বছর শাসন করেছে ব্রিটিশ। তাদের ভাষা ইংরেজি থেকে অনুবাদ করে যেটা বাংলা হিসেবে আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে, সেটাই আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে বয়ে বেড়াচ্ছি। এসব বিষয়ে সংস্কার দরকার। রিভার ট্রেইনিংয়ের বাংলা নদীশাসন না লিখে নদী ব্যবস্থাপনা লেখাই উত্তম। সংস্কার যে হচ্ছে না; তা কিন্তু না। পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ যে মন্ত্রণালয়ের অধীনে হয়েছে, তার নাম ছিল যোগাযোগ মন্ত্রণালয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এ মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে এখন করা হয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়।

সরকার সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় করেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ও উপমহাব্যবস্থাপকের (ডিজিএম) পদবি পরিবর্তন করে যথাক্রমে পরিচালক ও অতিরিক্ত পরিচালক করা হয়েছে। অথচ এতদিন বাংলাদেশ ব্যাংকে সহকারী পরিচালক পদে চাকরিতে যোগদান করে উপপরিচালক, যুগ্ম পরিচালক হওয়ার পর ডিজিএম ও পরে জিএম হতেন। তারপর নির্বাহী পরিচালক। দীর্ঘদিনের অসংগতি দূর করার জন্য ডিজিএমকে অতিরিক্ত পরিচালক ও জিএমকে পরিচালক করা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের সচিবকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা করা হচ্ছে। পুলিশ সদরদপ্তরে প্রধান সহকারীকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা করা হয়েছে। এ রকম আরও যেসব পদ-পদবিতে অসংগতি রয়েছে, সেগুলো এখন পরিবর্তন করা দরকার। যদিও সময়ের সঙ্গে অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়েছে। এক সময় মহকুমা প্রশাসককে এসডিও বলা হতো। থানার প্রধান নির্বাহীকে থানা নির্বাহী অফিসার (টিএনও) বলা হতো। উপজেলা পদ্ধতি চালু হওয়ার পর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বলা হচ্ছে। কিন্তু থানার প্রধান পুলিশ কর্মকর্তার নামটি এখনও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রয়েছে। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শুনলে মনে হয়, অন্য কোনো অফিসারের পরিবর্তে তিনি দায়িত্বরত। যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিদেশ ভ্রমণে গেলে সহ-উপাচার্য ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাই ওসির পদটিকে থানা পুলিশ নির্বাহী টিপিই করা যেতে পারে। মাঠ প্রশাসনে জেলার প্রধান নির্বাহীকে বাংলায় বলা হয় জেলা প্রশাসক (ডিসি)। ইংরেজিতে ডিস্ট্রিক্ট কমিশনার না বলে ডেপুটি কমিশনার বলা হচ্ছে। এখানেও একটা সংগতি আনা দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগীয় প্রধান না বলে চেয়ারপারসন বলা যেতে পারে। ছাত্র সংসদ না বলে শিক্ষার্থী সংসদ বলা যেতে পারে। সংসদ সদস্য বলার জন্য জাতীয় সংসদের রুলিং থাকলেও আমরা অনেকেই সাংসদ বলছি। শুধু যে প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব পদ-পদবি নিয়ে অসংগতি রয়েছে; তা নয়। আমরা অনেকেই পত্রিকা বা টেলিভিশনকে গণমাধ্যম বলি। অথচ এখানে যৌক্তিক শব্দ হবে সংবাদমাধ্যম। কারণ গণমাধ্যম বললে ঢোলের বাড়ি থেকে শুরু করে আরও অনেক কিছু চলে আসে।

মিজান শাজাহান: সাংবাদিক
mizanshajahan@gmail.com