কারমাইকেল কলেজে নব্বইয়ের দশকে বিতর্ক পরিষদের মূল মর্মবাণী ও দার্শনিক কার্ল মার্কসের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ আলোচনার প্রতিপাদ্য আমাকে আজও আলোড়িত করে। আবার অবসর জীবনে চিন্তা ও কল্পনার জায়গায় বিচরণের মানসে এবং একাল-সেকালের মননশীল শিক্ষার্থী, সহকর্মী ও শুভার্থীদের মাঝে শিক্ষক সত্তাকে সচল ও প্রাণময় রাখার উদ্দেশ্যে ফেসবুককে প্রধানত মননের চর্চার জায়গা বিবেচনা করি। নব্বইয়ের দশকে কারমাইকেল কলেজে কর্মকালে বিতর্ক পরিষদ ছিল সম্ভাবনাময় তরুণদের জ্ঞানালোচনার সভা এবং আমার কর্মজীবনে শিক্ষার্থীদের শ্রেষ্ঠ একটি জ্ঞানচর্চার পরিবেশ। আর তা নিয়মিত অনুষ্ঠিত হতো ছায়া-সুনিবিড় সবুজ ও শান্তির নীড় বাংলা মঞ্চে, যেখানে আজও কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদি হয়ে থাকে। উল্লেখ্য, উত্তর জনপদের শ্রেষ্ঠ চারটি কলেজ, এডওয়ার্ড কলেজ, কারমাইকেল কলেজ, রাজশাহী কলেজ ও আজিজুল হক কলেজে কর্মজীবন অতিবাহিত করার সুযোগ আমার হয়েছিল। তন্মধ্যে কারমাইকেল কলেজের ওই বিতর্ক পরিষদে জ্ঞানচর্চায় শিক্ষার্থীদের মেধা, প্রজ্ঞা ও প্রতিভার পরশ যেমনটি পেয়েছিলাম; তেমনটি আর কোথাও মেলেনি।

জ্ঞান বিনির্মাণ কার্যক্রমে আমাদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতেই পারে; সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তন ও সুস্থ সমাজ গঠনেও তেমনটা ঘটতে পারে। তবে কারমাইকেল কলেজে সেকালে বিতর্ক পরিষদের মূল মর্মবাণী ছিল- 'বিতর্কের দ্বন্দ্বে বিকশিত হোক সুন্দর'। তা আবার দার্শনিক কার্ল মার্কসের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। বিতর্ক চর্চায় দ্বন্দ্ব, অনৈক্য ও মতপার্থক্যের মাঝেও ঐক্যের সুর অনুরণিত হয়। সেখানে জয়-পরাজয়ের নির্ধারক বিষয়বস্তু নয়; বরং বক্তব্য উপস্থাপনায় বস্তুনিষ্ঠতা, বিচক্ষণতা, নিরপেক্ষতা; তথ্য-যুক্তি-বুদ্ধিবৃত্তিক হওয়াটাই মুখ্য। বিতার্কিকদের তথ্য উপস্থাপনা, যুক্তি প্রদর্শন, যুক্তি খণ্ডনে শৈল্পিক উপস্থাপনায় একজন নবীন শিক্ষক হিসেবে পুলকিত হতাম এবং একে আমি সেকালের মননশীল শিক্ষার্থীদের শিল্প-সাধনা বিবেচনা করতাম। কবিতা, নাটক ও সংগীতের মতোই তা আমার কাছে উপভোগ্য ও আনন্দময় মনে হতো।

শিক্ষার্থীদের অনুশীলনের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিয়মিতভাবেই সেখানে সংসদ বিতর্ক, আদালত বিতর্ক, রম্য বিতর্কসহ নানা নামে বিতর্ক উৎসব আয়োজিত হতো। আমি তরুণ বিতার্কিকদের শৈল্পিক উপস্থাপনার আকর্ষণে প্রাণের টানে সে আয়োজনে শ্রেণিকক্ষে দায়িত্ব পালন শেষে সব সময় উপস্থিত থাকতাম। তা ছাড়া অনেক বিতার্কিককে বিতর্ক বিষয়ে স্ট্ক্রিপ্ট তৈরিতে সহায়তা করতাম। বিতর্কের বিষয়বস্তু নিয়ে তাঁদের সঙ্গে আলোচনাও করতাম। আরও অনেক শিক্ষকের বিতর্ক পরিষদের কার্যক্রমে নিবেদিতপ্রাণ ও অনুপ্রেরণাদায়ী ভূমিকা প্রশংসনীয়।

আমার ধারণা, ভিন্নমত ও মতপার্থক্যের পরিবেশে তার্কিকদের অগ্রসর হতে হয় বিধায় তাঁদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের ক্ষেত্রে পরমতসহিষুষ্ণতার সংস্কৃতিচর্চা করার সুযোগ তাঁরা পেয়ে থাকেন এবং তা তাঁদের মার্জিত রুচির চিন্তাশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। আবার অনৈক্য, বিভেদ ও মতপার্থক্যের মধ্য দিয়ে তাঁরা পরস্পর ঐক্য গড়েন ও মিলিত হতে পারেন। আর তাতে তাঁরা পরমতসহিষুষ্ণতা ও সহনশীলতার শিক্ষা পেয়ে মহৎ মনের অধিকারী হয়ে উঠতে পারেন। রাগলেন তো হারলেন- এই নীতি অনুসরণ করে যুক্তি, বুদ্ধি ও বিচক্ষণতার অস্ত্র সেখানে শানিত হয় ও গর্জে ওঠে। আমার জানামতে, কারমাইকেল কলেজের বিতর্ক পরিষদের ওই হীরের টুকরো সন্তানরা আজ সবাই মহৎ মনের অধিকারী হয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত। সবাই আপন প্রতিভাগুণে নিজ নিজ পেশায় সমুজ্জ্বল হয়ে আমাদের গৌরব দান করে চলেছেন।

আমার কারমাইকেল কলেজ জীবনের ওই অভিজ্ঞতার আলোকে ধারণা হয়, প্রয়োজনীয় পাঠদানের সঙ্গে সঙ্গে দেশের স্কুল-কলেজগুলোতে কেবল নিয়ম রক্ষার জন্য নয়; বরং নিয়মিত বিতর্ক প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হলে তাঁদের পরমতসহিষুষ্ণ ও মার্জিত মনের অধিকারী করে গড়ে তোলা সম্ভব হতে পারে। আর তা তাঁদের প্রতিকূল পরিবেশকে জয় করা ও সুস্থ সমাজ গঠনে নেতৃত্বের গুণাবলিসম্পন্ন করতে সহায়ক হতে পারে।

ড. মো. মোস্তাফিজার রহমান: সাবেক অধ্যক্ষ, নওগাঁ সরকারি কলেজ