পদ্মা সেতুর উদ্বোধন মঞ্চের ডিজাইন অত্যন্ত প্রশংসনীয় অনেক দিক থেকেই। তবে এখানে সংগত কারণে মঞ্চের উঁচু পাটাতনের দেয়ালব্যাপী ব্যবহূত জামদানি শাড়ির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ্য। উদ্বোধনের পূর্বমুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসীকে চমকপ্রদ তথ্য প্রদান করেছেন যে, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন জামদানি শাড়ির এই ডিজাইনকে বাংলাদেশের নারীর অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। বাংলাদেশের প্রারম্ভিক যুগের এত বড় একটি তথ্য তেমন প্রচার পায়নি! প্রতি বছর নারীর প্রতি জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে ১৬ দিনের ক্যাম্পেইন বিপুল আয়োজনে পালন করা হয়। তাতে বিশেষ বিশেষ রংকে নারীর মর্যাদার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আশা করা যায়, জাতিসংঘের সংশ্নিষ্ট আয়োজক সংস্থাসহ বাংলাদেশের আয়োজকরা পরবর্তী কোনো না কোনো আয়োজনে জামদানির নকশা ব্যবহারের চিন্তা করবেন। পদ্মা সেতুর উদ্বোধন আয়োজনে বাংলাদেশের নারী উন্নয়ন ও নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করায় স্পষ্ট বোঝা যায়, সরকার এ দেশের নারীর সমঅধিকারের প্রতি পূর্ণ সংবেদনশীল। সম্প্রতি জেসিআই বাংলাদেশ আয়োজিত উইমেন অব ইন্সপাইরেশন অ্যাওয়ার্ড ২০২২-এর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীও বলেছেন, 'নারীর ক্ষমতায়ন ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা দেশের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনের পূর্বশর্ত। নারীরা অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের নিয়ামক। সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে প্রতিটি স্তরে নারীদের অংশ নেওয়া প্রয়োজন।' তদুপরি বাংলাদেশের প্রতিটি খাতের বাজেটে জেন্ডার সমতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। 
অথচ এমন সব ঘটনা একের পর ঘটে চলেছে, যা নারীর অগ্রগতির পথে কেবল বাধাই নয়; নারীর মর্যাদার ওপর আঘাতও বটে। গত ২ এপ্রিল ঢাকার তেজগাঁও কলেজের থিয়েটার অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক লতা সমদ্দারকে পোশাকের সঙ্গে টিপ পরার কারণে হেনস্তা করেছে পুলিশ সদস্য নাজমুল তারেক। এর পর মে মাসে পোশাকের কারণে নরসিংদী রেলস্টেশনে এক তরুণীর শ্নীলতাহানি করে মার্জিয়া আক্তার নামের ৬০ বছর বয়সী আরেক নারী। এ অপরাধের শিকার তরুণী পরে ট্রমায় আক্রান্ত হয়েছেন। এসব ঘটছে এ কারণে যে, বাংলাদেশে নারীবান্ধব নীতি ও আইন যথেষ্ট থাকলেও নেই জেন্ডার সমতার শিক্ষা। শিক্ষা ছাড়া নারীর প্রতি হীন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন সম্ভব নয়। এমনকি মূলধারার শিক্ষার মধ্যেও গলদ স্পষ্ট।
কয়েক দিন আগে ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ, রংপুরের দশম শ্রেণির অর্ধবার্ষিক পরীক্ষায় ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ের সৃজনশীল প্রশ্নপত্র বিশ্নেষণ করা যাক। ১ নম্বর প্রশ্নের উদ্দীপকটি বানানসহ উদ্ধৃত করছি- 'বিত্তশালী বাবার একমাত্র মেয়ে এসএসসি পাস করে কলেজে ভর্তি হয়ে শার্ট প্যান্ট পড়ে আধুনিক ভাবে  ঘুরে বেড়ায়। পাড়ার বখাটে যুবকরা প্রায়ই তাকে অশালীন কথাবার্তা বলে উত্ত্যক্ত করে। এ ব্যাপারে সেঁজুতি বাবার কাছে অভিযোগ করলে বাবা বললেন- 'তুমি শালীনভাবে চলাফেরা করো, কেউ তোমাকে কিছু বলার সাহস পাবে না।' এর পর প্রথমে একটি আরবি শব্দের অর্থ জানতে চাওয়া হয়েছে; তারপর 'হাদিস কাকে বলে' প্রশ্নটি করা হয়েছে! উদ্দীপকের সঙ্গে এই প্রশ্ন দুটির সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় না। তৃতীয়ত, 'অশালীন পোষাকের কারণে অধিকাংশ যৌন হয়রানি হয়ে থাকে'- এই ভয়ংকর বিবৃতিকে ব্যাখ্যা করতে এবং শেষে সেঁজুতির বাবার কথার মূল্যায়ন করতে বলা হয়েছে। ধরেই নেওয়া হয়েছে যে বিত্তশালী বাবার (মায়ের নয়!) মেয়ে হলেই সে প্যান্ট-শার্ট পরবে। প্যান্ট-শার্ট মানেই (মেয়েদের) আধুনিক এবং অশালীন পোশাক! পাড়ার বখাটেদের উত্ত্যক্ত করা বন্ধ করতে নারী ও কন্যাশিশুদেরই 'ঠিক' পোশাকটি পরতে হবে- এমন শিক্ষাই বিস্তারের প্রচেষ্টা আছে! বখাটেদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শিক্ষা এতে নেই। 'ভিকটিম ব্লেম' শেখানোর এর চেয়ে উৎকৃষ্ট উদাহরণ আর হয় না। একজন শিক্ষক এই প্রশ্ন প্রণয়ন করেছেন; প্রশ্ন নির্বাচন কমিটির সদস্য শিক্ষকরা তাতে অনুমোদন দিয়েছেন। কারও কিছুই মনে হয়নি। তাঁরা সবাই পুরুষতন্ত্রের প্রতিনিধি বলেই। অধিকন্তু প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে ভুল বানান ও শব্দ (উদ্ধৃতিগুলোর ভেতরে বাঁকা অক্ষরে লেখা) ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। শিক্ষা পদ্ধতির ভেতর দিয়ে নতুন প্রজন্মের মধ্যে নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার কাজটাই আসলে
করা হচ্ছে।
এই নারীবিদ্বেষী প্রক্রিয়া কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নয়। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্তৃক ২০১৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে নবম-দশম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকরূপে নির্ধারিত মুহাম্মদ আব্দুল মালেক, ড. মুহাম্মদ আব্দুর রশিদ ও ড. মুহাম্মদ ইউছুফ রচিত এবং ড. মো. আখতারুজ্জামান সম্পাদিত ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বইটির ১৩৪ পৃষ্ঠার দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- 'পোশাক-পরিচ্ছদ ও চলাফেরায় শালীনতার অভাব অনেক সময় সমাজে অশ্নীলতার প্রসার ঘটায়। ইভটিজিং, ব্যভিচার ইত্যাদির জন্ম হয়।' যৌন হয়রানি বিষয়ে ২০১০ সালে উচ্চ আদালত প্রদত্ত নির্দেশনা মোতাবেক ইভটিজিং শব্দের ব্যবহার বিলুপ্ত হলেও পাঠ্যপুস্তকে তা রয়ে যাওয়া বিস্ময়কর। এর বাইরেও আদালত পরে সাত দফা নির্দেশনা দিয়েছিলেন, যেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন ও তাদের কার্যক্রম বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই কমিটির যৌন হয়রানিমুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করার কথা। এমনকি প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে নারী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রতি যৌন হয়রানি উস্কে দেওয়ার ঘটনা তদারকও তাঁরা করবেন। কিন্তু পিতৃতন্ত্র সর্বত্র এতটাই প্রতিষ্ঠিত যে, আদালতের নির্দেশনা শিক্ষা প্রশাসন উপেক্ষা করতে পেরেছে। ফলে পাঠ্যক্রম, পাঠদান, পরীক্ষা পদ্ধতি সব পর্যায়েই নারীকে নিয়ন্ত্রণ করার সংস্কৃতি শক্ত হয়েছে। শিক্ষা কাঠামোর এই ভয়ানক ত্রুটি দূর না করলে 'নারীরা অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের নিয়ামক' হয়ে উঠতে পারবে কি? বন্ধ হবে কি পোশাকের কারণে নারীর প্রতি সহিংসতা?
নূরুননবী শান্ত: গল্পকার ও অনুবাদক