নড়াইলে ধর্ম অবমাননার ধুয়া তুলে আবারও যেভাবে শিক্ষক স্বপন কুমার বিশ্বাসকে হেনস্তা করা হয়েছে, তা আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। সম্প্রতি আমরা শিক্ষক হৃদয় মণ্ডলের ক্ষেত্রে দুঃখজনক ঘটনা ঘটতে দেখেছি। নড়াইলে যেভাবে শিক্ষককে অভিযুক্ত করা হয়েছে, তা বিস্ময়কর। সেখানে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির বহিস্কৃৃত মুখপাত্র নূপুর শর্মার ছবি দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক কলেজছাত্রের পোস্টকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে শিক্ষককে গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় ওই শিক্ষক তথা কলেজটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের কোনো ভূমিকা না থাকা সত্ত্বেও যেভাবে তাঁকে হেনস্তা করা হলো, তাতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে- এটি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের চেয়ার দখলের অপতৎপরতা কিনা। অভিযোগ রয়েছে, একটি চক্র ওই চেয়ার দখল করে কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে মোটা অংকের নিয়োগ বাণিজ্য করতে দীর্ঘ দিন ধরে অপতৎপরতা চালিয়ে আসছে। আমরা মনে করি, বিষয়টি খতিয়ে দেখা জরুরি।
বস্তুত ধর্ম অবমাননার নামে সম্প্রতি যেসব শিক্ষককে অপমান করা হয়েছে, তার নেপথ্যেও নানা হীনস্বার্থের বিষয় বেরিয়ে আসছে। এটা স্পষ্ট- ঘটনাগুলোর মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে কেবল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শিক্ষকদেরই নিশানা করা হয়েছে। আমরা এর আগে ২০১৬ সালে নারায়ণগঞ্জেও প্রায় একই ধরনের ঘটনা ঘটতে দেখেছি। সেখানেও এক স্কুলের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে প্রথমে তাঁর ছাত্ররা ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে হেনস্তা করে; পরে স্থানীয় সাংসদ তাঁকে প্রকাশ্যে কান ধরে ওঠবস করিয়ে আবারও চরমভাবে অপমানিত করেন। তা ছাড়া গত কয়েক বছরে দিনাজপুর, বাগেরহাটসহ দেশের বিভিন্ন জায়গাতেও আমরা বেশ কয়েকজন শিক্ষককে একইভাবে লাঞ্ছিত হতে এবং কারাগারে যেতে দেখেছি। সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য এসব কোনো শুভ লক্ষণ হতে পারে না।
নড়াইলের শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনা বিচ্ছিন্নভাবে দেখার অবকাশ নেই। সাধারণভাবেই একজন শিক্ষকের অসম্মান অগ্রহণযোগ্য। সেখানে ধর্ম অবমাননার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে অভিযোগ আনা নিঃসন্দেহে গুরুতর অপরাধ। বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশে সব ধর্মের মানুষ শান্তিতে বসবাস করছে। একজন শিক্ষক সম্প্রীতির এ বিষয়টি ভালোভাবেই অনুধাবন করেন। যখনই তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, আমরা মনে করি, তা ভালোভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি। নড়াইলের ঘটনায় দেখা গেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বহিনীর সামনেই শিক্ষককে অপমান করা হয়েছে। শিক্ষক লাঞ্ছনায় কোথাও জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিও দেখা গেছে। এমনকি শিক্ষক লাঞ্ছনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রশাসনের উদাসীনতা লক্ষণীয়। শিক্ষক হৃদয় মণ্ডলের ঘটনায় আমরা এ সম্পাদকীয় স্তম্ভেই লিখেছি, শ্যামল কান্তির ঘটনাটি উদ্দেশ্যমূলকভাবে ঘটানো হয়েছিল- তা প্রমাণিত হওয়ার পরও সরকার কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি; শ্যামল কান্তিও কোনো প্রতিকার পাননি। এমনটি প্রত্যাশিত নয়।
আমরা দেখছি, শিক্ষক লাঞ্ছনা এখন শিক্ষক হত্যায় উপনীত। সাভারে একজন শিক্ষককে সবার সামনে ছাত্র কর্তৃক যেভাবে পিটিয়ে মারা হয়েছে, তা সভ্য সমাজে কল্পনা করা কঠিন। একজন ছাত্র কীভাবে তারই পিতৃতুল্য শিক্ষকের গায়ে হাত তুলতে পারে! সমকালের প্রতিবেদন অনুসারে, সাভারে নিহত শিক্ষক উৎপল কুমার সরকার কলেজটিতে শিক্ষকতার পাশাপাশি শৃঙ্খলা কমিটির প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তিনি শিক্ষার্থীদের আচরণগত সমস্যা সমাধানে কাউন্সেলিং ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতেন। একজন শিক্ষক হিসেবে এটি তাঁর দায়িত্বও বটে। শিক্ষক তাঁর দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে; শিক্ষার্থীর মঙ্গল কামনায় কাজ করতে গিয়ে যদি উল্টো শিক্ষার্থী কর্তৃক হামলার শিকার হন; এর চেয়ে দুঃখজনক ঘটনা আর কী হতে পারে! কবি কাজী কাদের নওয়াজ তাঁর কবিতায় বাদশাহ আলমগীরের যে 'শিক্ষাগুরুর মর্যাদা' তুলে ধরেছেন, তা এখন বিরল বটে। কিন্তু এতটা অধঃপতন হবে কেন? শিক্ষক লাঞ্ছনা ও তাঁদের ওপর হামলার বিরুদ্ধে কেবল শিক্ষক সমাজকেই নয়, বরং প্রতিবাদে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে রুখে দাঁড়ানোর সময় এসেছে।
আমরা চাই, শিক্ষক হত্যা-নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রশাসন কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করুক। সরকারের পক্ষ থেকে শূন্য সহিষুষ্ণতা ঘোষণা করা না হলে এ ধরনের প্রবণতা চলতেই থাকবে। শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারের হত্যাকারী এবং স্বপন কুমার বিশ্বাসকে হেনস্তাকারীদের আইনের আওতায় এনে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।

বিষয় : অমর্যাদা শুধু নয় গুরুতর অপরাধ

মন্তব্য করুন