২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে ইতোমধ্যে অনেকেই কথা বলেছেন। আমি মনে করি, বাজেটকে গতানুগতিকতা থেকে বের করে আনা প্রযোজন। এ জন্য নিম্নলিখিত বিষয়গুলো সেখানে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
১. দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনে আস্থা সৃষ্টির জন্য নিরপেক্ষ সরকার ও উন্নত মন সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। দলীয় সরকারের স্থলে নির্বাচনের একাধিক বছর আগে নিরপেক্ষ সরকার সৃষ্টিতে জনগণের আগ্রহ, প্রচার ও পরামর্শ সংগ্রহের জন্য ২০ কোটি টাকা বরাদ্দকল্পে আলাপ-আলোচনা দেশে শান্তির পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়ক হবে। জাতীয় সরকারের বিষয়টিও আলোচনায় নেওয়া যায়।
২. কেবল বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১৫ শতাংশ আয়কর ধার্য হয়েছে, যা অত্যন্ত গর্হিত, ভুল, অনৈতিক এবং শিক্ষা প্রসারে প্রতিবন্ধকও বটে। মেডিকেল যন্ত্রপাতির ওপর ধার্য বিভিন্ন শুল্ক্ক ও অগ্রিম কর চিকিৎসাসেবার প্রতিবন্ধক। বড় হাসপাতালকে ১০ বছর আয়করমুক্ত করা হয়েছে। বারবার কর্তৃপক্ষের নজরে আনার পরও বিগত কয়েক বছর ধরে হাসপাতালের শয্যা, মেডিকেল যন্ত্রপাতির ওপর ১৫ থেকে ৫৮ শতাংশ বিবিধ শুল্ক্ক ও অগ্রিম আয়কর চালু রাখা হয়েছে। ছোট হাসপাতালের আমদানিকৃত যন্ত্রপাতির ওপর অত্যধিক শুল্ক্ক রয়েছে যা স্কয়ার, ল্যাবএইড, ইউনাইটেড, এভারকেয়ার- ধনী লোকের হাসপাতালের ওপর প্রযোজ্য হয় না। তারা মাত্র ১ শতাংশ ট্যাক্স দিয়ে এসব মেডিকেল যন্ত্রপাতি আমদানি করে। এই জাতীয় নিয়ম সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। হাসপাতাল, মেডিকেল, ল্যাবরেটরি ও শিক্ষা উপকরণ আমদানিতে সব রকম শুল্ক্ক, ভ্যাট ও অগ্রিম আয়কর রহিত করা হবে নূ্যনতম মৌলিক পরিবর্তন।
৩. প্রিন্টিং প্লেট, ফিল্ম আমদানিতে ১ শতাংশ থেকে শুল্ক্ক বৃদ্ধি করে ১০ শতাংশ করা সংবাদ ও মিডিয়ার কণ্ঠরোধের পূর্ব পদক্ষেপ।
৪. বাংলাদেশে নতুন করে অতিরিক্ত বিভাগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। অথচ ১৯৩৪ সালে ফ্লাউড কমিশন বিভাগ প্রথা প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছিল। সুশাসন ও গণতন্ত্রায়নের জন্য প্রয়োজন বাংলাদেশকে ১৫ বা ১৭টি প্রদেশ বা স্টেটে বিভক্ত করে নিয়মিত সুষ্ঠু ভোটের মাধ্যমে প্রাদেশিক বা স্টেট ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। এতে জনগণতান্ত্রিক শাসনের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হবে এবং দেশে বহুলাংশে দুর্নীতিমুক্ত সেবার নতুন যুগ সৃষ্টি হবে।
বর্তমানে সরাসরি ঢাকা থেকে নিয়োগকৃত ব্যক্তিরা  সার্বক্ষণিক নির্ধারিত কর্মস্থলে অবস্থান করেন না। এমনকি নিম্ন আদালতের অনেক বিচারকও সপ্তাহে মাত্র তিন-চার দিন আদালত পরিচালনা করেন। অবস্থান নিশ্চিত করতে জনপ্রতিনিধি ও পেশাজীবীর প্রতিনিধি সমন্বয়ে গঠিত প্রাদেশিক কর্ম কমিশন ও বিবিধবিষয়ক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিয়োগ, প্রমোশন ও পদায়ন নিয়ন্ত্রণ করলে সুশাসন সহজলভ্য হবে।


৫. আগামী ২০ বছরে বাংলাদেশের জনসংখ্যা দ্বিগুণ হওয়ার বিষয় স্মরণ রেখে সুষ্ঠু স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ৫ লাখ চিকিৎসক, ৪০ লাখ নার্স, টেকনিশিয়ান, ১ লাখ দাঁতের চিকিৎসক, ১০ লাখ সার্টিফায়েড ফার্মাসিস্ট, ২০ হাজার মেডিকেল ফিজিসিস্ট ও বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ার এবং ২ লাখ ফিজিওথেরাপিস্টের প্রয়োজন হবে। সঙ্গে প্রবর্তন করতে হবে এমবিবিএস চিকিৎসকের জেনারেল প্র্যাকটিশনার পদ্ধতি ও হাসপাতালে রেফারেল প্রথা। নার্সিং শিক্ষার দুর্বলতার কারণে উন্নত দেশগুলোয় বাংলাদেশি নার্সদের চাহিদা তুলনামূলক কম। দেশে ও বিদেশে বয়োবৃদ্ধদের সেবার জন্য প্রয়োজন ছয় মাস থেকে এক বছর বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একাধিক ভাষা জানা শিক্ষিত, হাস্যোজ্জ্বল ৫০ লাখ তরুণ-তরুণী। এদের এক-পঞ্চমাংশ দেশের বয়োবৃদ্ধদের সেবা দেবে; বাকিরা উন্নত দেশগুলোর বয়োবৃদ্ধ সেবায় অংশ নিয়ে বিপুল রেমিট্যান্স দেশে প্রেরণ করবে।  
একই মেডিকেল কলেজ থেকে বিবিধ প্রকার ডিগ্রি ডিপ্লোমা পড়িয়ে পরীক্ষা নিয়ে সার্টিফিকেট দেওয়া হোক। সব মেডিকেল কলেজে বছরে ২০ হাজার শিক্ষার্থীকে এমবিবিএসে ভর্তির সুযোগ দিতে হবে। এতে সরকারের বাড়তি কোনো বিনিয়োগ লাগবে না; ছাত্ররা নিজ খরচেই পড়বে। ৫০০০ বিদেশি ছাত্রকে বাংলাদেশে এমবিবিএস পড়ার সুযোগ দিলে বছরে ২৫ মিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ ২৫০ কোটি  টাকা অর্জিত হবে। 
৬. বাংলাদেশে অন্তত ৫০০০ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র আছে, যা প্রায়ই দুপুর ২টার পর খোলা থাকে না। ২৪ ঘণ্টা সেবা নিশ্চিত করার জন্য মাত্র ১০০টি (শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ) সেন্টার সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজকে এবং ১০০টি প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ১০টি এনজিওকে ৫ বছর চালানোর জন্য বরাদ্দ দেওয়া হোক। উভয় ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় বরাদ্দের টাকা খুশিমনে দ্রুত বড় দাতাগোষ্ঠী দিতে সম্মত।
তা ছাড়া, প্রায় সব ইউনিয়নে একটি দোতলা বিল্ডিংয়ে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র আছে, যার নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে পড়ছে; ইলেকট্রিক সাব-স্টেশন ও গভীর নলকূপ অকেজো হয়ে গেছে। সেখানে ঢাকা থেকে পাঠানো এমবিবিএস চিকিৎসক যান না; অবস্থান করেন না বিবিধ অজুহাতে। পেশাজীবীদের প্রদেশ বা জেলা কর্তৃপক্ষ মনোনীত করলে চিকিৎসকরা বিভিন্ন প্রণোদনার কারণে কাজের আনন্দে ইউনিয়ন পর্যায়ে সার্বক্ষণিক অবস্থান করে জনগণকে উন্নত সেবা দেবেন। ১২ কোটি প্রান্তিক নাগরিকের জন্য প্রথম বছরে মূলধনি ও অমূলধনি ব্যয় এ বছরের বাজেটের সুদ পরিশোধের মাত্র ২০ শতাংশ বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। আকর্ষণীয় বেতন-ভাতায় খরচ হবে প্রতি বছর মাত্র ৪ কোটি টাকা। মেডিকেল ছাত্ররা তিন প্রফেশনাল সময়কালে এক মাস করে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে  অবস্থান করে জ্ঞান অর্জন করবে। এতে বছরে সরকারের মাত্র ২৪ কোটি টাকা ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে কেবল গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজ শিক্ষা কার্যক্রমে নিবিড়ভাবে এ নিয়ম অনুসরণ করা হয়। এ পদ্ধতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক উচ্চ প্রশংসিত হচ্ছে।
কয়েক বছর আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সদ্য পাস করা চিকিৎসকদের ইন্টার্নশিপের মেয়াদ এক বছরের স্থলে দুই বছর করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিলেন। ওই বিধানমতে, তরুণ চিকিৎসকরা প্রথম বছর নিজ নিজ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং দ্বিতীয় বছর ইউনিয়ন ও উপজেলা হাসপাতালে কাজ করবেন। কিন্তু ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের সামান্য চাপে এক মাসের মধ্যে অত্যন্ত দেশ-উপযোগী প্রজ্ঞাপনটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। দেশের সর্বত্র সমমানের উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হলে চিকিৎসক ও অন্যান্য সেবাকর্মীকে ২৪ ঘণ্টা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। নতুবা সদ্য আমদানিকৃত আধুনিক যন্ত্রপাতি বাক্সবন্দি হয়ে পড়ে থাকবে; জং ধরে যাবে। বিনা ব্যবহারেই ওয়ারেন্টি সময় পার হয়ে যাবে।
৭. ১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধ নীতির বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি অনুসরণ করলে দেশে প্রস্তুত ওষুধের বিক্রয়মূল্য ৪০-৬০ শতাংশ কমে আসবে। কোম্পানিগুলোকে ওষুধের মূল্য নির্ধারণ করতে দেওয়া অনৈতিক। এর ফলে সর্বসাধারণকে প্রতারণার শিকার হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। 
৮. অতিরিক্ত বরাদ্দ কোথা থেকে জোগাড় হবে? এক কথায় তা আসবে মদ, জর্দা, বিড়ি ও প্রসাধনীর বর্ধিত শুল্ক্ক থেকে। এসব ভয়ানক ক্ষতিকর সামগ্রীর ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে প্রতিনিয়ত দেশের সব  শিক্ষা, ব্যবসায়ী, ধর্মীয়, পরিবহন, সভা-সমিতিতে ব্যাপক প্রচারণার পাশাপাশি এসব সামগ্রীর ওপর নিম্নরূপ হারে বিভিন্ন কর, শুল্ক্ক, অগ্রিম আয়, সম্পূরক কর, পরিবেশ বিধ্বংসী কর ইত্যাদি আরোপ করতে হবে। যেমন, প্রতিটি বিড়ি শলাকার নূ্যনতম মূল্য হবে ৫ টাকা। নিম্নস্তরের প্রতি শলাকা সিগারেট ৩০ টাকা। উচ্চস্তরের বিদেশি প্রতি শলাকা সিগারেটের মূল্য হবে ১০০ টাকা। ১০ গ্রাম গুলের বিক্রয়মূল্য হবে ২০০ টাকা। উপরোক্ত ক্ষতিকর সামগ্রী উৎপাদন কোম্পানির ওপর ধার্যকৃত আয়কর হবে ব্যাংক-বীমা কোম্পানির দ্বিগুণ।
জাফরুল্লাহ্‌ চৌধুরী: ট্রাস্টি, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র