চীনের বেইজিংয়ে আয়োজিত এবারের ১৪তম ব্রিকস সম্মেলন শেষ হয়েছে গত শুক্রবার। ব্রিকসের সদস্য অর্থনীতির উদীয়মান পাঁচ দেশ। তাদের নামের আদ্যাক্ষর দিয়ে নামকরণ করা এই গ্রুপের সদস্য- ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকা। এবারের ব্রিকস সম্মেলনটি নানা কারণে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ভার্চুয়ালি হলেও এমন সময়ে ব্রিকস সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, যখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চলমান। এদিকে বিশ্বের শীর্ষ শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি৭-এর সম্মেলন শেষ হলো মঙ্গলবার। জার্মানিতে অনুষ্ঠিত জি৭ সম্মেলন শেষ হতে না হতেই সামরিক জোট ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে স্পেনের মাদ্রিদে গেছেন নেতারা। মঙ্গলবার শুরু হওয়া ন্যাটো সম্মেলন শেষ হচ্ছে বৃহস্পতিবার। জি৭ এবং ন্যাটো সম্মেলনের পরিপ্রেক্ষিতেও ব্রিকস সম্মেলনের তাৎপর্য আমরা দেখব।
মনে রাখা দরকার, ২০০৯ সালে যখন ব্রিকস প্রতিষ্ঠা হয় তখনকার বিশ্ব আর বর্তমান বিশ্বের মেরূকরণ এক রকম নয়। তারপরও জি৭-এর বাইরে অনেকটা জি৫ হিসেবে ব্রিকসের আগমন। ব্রিকসের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আমরা এক ধরনের সহযোগিতার ঐক্য দেখে আসছি। তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকলেও পারস্পরিক আস্থা ও বোঝাপড়া উল্লেখযোগ্য। ব্রিকসকে পশ্চিমারা কোনো চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেনি। কারণ এটি দৃশ্যত একটি অর্থনৈতিক জোট। যদিও প্রথম কয়েকটি ব্রিকস সম্মেলনে বিকল্প অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার বিষয় আলোচনায় আসে। আমরা দেখেছি, ব্রিকস নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে। এর সঙ্গে চীনের এআইআইবি তথা এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ব্রিকস পশ্চিমাদের বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবির বিপরীতে এক ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করে।
ব্রিকসের প্রথম কয়েক বছরে আমরা দেখেছি, বিশ্বব্যবস্থায় বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকলেও সরাসরি কেউ কারও বিরুদ্ধে উচ্চবাচ্য করেনি কিংবা সেভাবে একে অপরের শত্রু হিসেবে মুখোমুখি দাঁড়ায়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর সরাসরি চীনের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। তা ছাড়া আমরা ভারত-চীন সীমান্তে উত্তেজনা দেখেছি। দুই দেশের সীমান্তবর্তী লাদাখে ফের সংঘাতময় পরিস্থিতির উদ্ভব হয়; যদিও পরিস্থিতি পরে শান্ত হয়। এখন বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে বহু মেরূকরণ দেখা যাচ্ছে। বিশেষত ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন হয়েছে। একদিকে যেমন ইন্দো-প্যাসিফিক ইকোনমিক ফ্রেমওয়ার্ক গঠিত হয়েছে। হয়েছে কোয়াড সংলাপ। অন্যদিকে চীনও তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ-বিআরআই প্রকল্প এগিয়ে নিচ্ছে। আবার ভারতের ইসরায়েল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও আরব আমিরাত নিয়ে রয়েছে আই২ইউ২ উদ্যোগ।
এবারের ব্রিকস সম্মেলনে জোটভুক্ত প্রতিটি রাষ্ট্র অংশগ্রহণ করেছে। ভারত-চীনের মধ্যে বৈরিতা থাকলেও উভয়েরই সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। চীনের সঙ্গে রাশিয়ার সাম্প্রতিক সম্পর্ক আমরা জানি। অন্যদিকে ভারতের সঙ্গেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু বিষয়ে বোঝাপড়া রয়েছে। তারপরও বলা চলে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ভারত একটা স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ব্রিকস সম্মেলনে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় যেটা ঘটেছে, সেটা হলো রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভদ্মাদিমির পুতিনের বিশ্বমঞ্চে ফিরে আসা। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পুতিন অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। পশ্চিমা বিশ্ব নানাভাবে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিয়ে পুতিন পশ্চিমাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন- ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রাশিয়া 'একা' নয়। ব্রিকস সম্মেলনে তাঁর ভাষণে বৈশ্বিক সংকট সৃষ্টি করার জন্য পুতিন পশ্চিমাদের দায়ী করেন। অন্যদিকে আমরা দেখেছি, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভদ্মাদিমির পুতিনকে ইউক্রেনে জয়ী হতে দেওয়া হবে না- এমন অঙ্গীকার করেছেন জি৭-এর নেতারা। এ সম্মেলনে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন বেশ কিছু নিষেধাজ্ঞা এসেছে। এর মধ্যে আছে- দেশটির তেলের দাম কমানো, স্বর্ণ আমদানি নিষিদ্ধ করা এবং সামরিক নিষেধাজ্ঞা। ইউক্রেনকে দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার ব্যাপারেও দেশগুলো সম্মত হয়েছে। এমনকি চীনকে টেক্কা দিতে জি৭ সম্মেলনে ৬০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের অবকাঠামো পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বলাবাহুল্য, ব্রিকস সম্মেলন সেদিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। জি৭-এর এসব পদক্ষেপ সত্ত্বেও ব্রিকসের সব সদস্যের সক্রিয় অংশগ্রহণের মানে, তারা এ জোটকে আরও সামনে এগিয়ে নিতে চায়। এবারের ব্রিকস সম্মেলনে বেইজিং ঘোষণায় দেওয়া বৈশ্বিক উন্নয়নের জন্য অংশীদারিত্বের বিষয় উল্লেখ করা হয়। সেখানে বারবার 'ডেভেলপমেন্ট' এবং 'কো-অপারেশন'-এর কথা বলা হয়েছে। বিশেষ করে চীনের আগ্রহে দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের ওপর জোর দেওয়া হয়। এবার ব্রিকস জোটে নতুন করে যোগ দেওয়ার আবেদন করেছে ইরান। আর্জেন্টিনারও সদস্য হওয়ার আগ্রহ রয়েছে। ব্রিকসের সম্প্রসারণের ব্যাপারে সবাই একমত হয়েছে।


এবারের ব্রিকস সম্মেলনে দেওয়া চীনের প্রেসিডেন্টের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। ষাটের দশকে তিনি যেখানে কৃষির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন; আজকে সেখানে উন্নয়নের মাধ্যমে ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। তাঁর মতে, পেটে ভাত থাকলে তখন মানুষ ভালো আচরণ শেখে। অর্থাৎ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ছাড়া সামাজিক ও রাজনৈতিক উন্নয়ন প্রায় অসম্ভব।
ব্রিকস সম্মেলনের পরই চলমান ন্যাটো সম্মেলনের তাৎপর্যও বলা প্রয়োজন। সামরিক এ জোটটি যেভাবে তার সম্প্রসারণ ঘটিয়ে চলেছে, তাও দেখার বিষয়। এবারের সম্মেলনে দুই সদস্য সুইডেন ও ফিনল্যান্ডকে স্বাগত জানিয়েছে ন্যাটো। যদিও তুরস্ক দেশ দুটির সদস্য হওয়ার বিষয়টি প্রথমে মেনে নেয়নি। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান জোর দিয়ে বলেছিলেন, কুর্দি বিদ্রোহীদের বিষয়ে দুই নরডিক দেশ অবস্থান পরিবর্তন করলেই কেবল তিনি তাদের ন্যাটোভুক্ত হওয়ার সুযোগ দেবেন। কারণ আমরা জানি, তুরস্ক কুর্দি বিদ্রোহীদের সন্ত্রাসী হিসেবে বিবেচনা করে। অথচ সুইডেন ও ফিনল্যান্ড কুর্দিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে। কিন্তু আমরা দেখলাম, দেশ দুটি ন্যাটোর সদস্য হওয়ার জন্য তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছে। এমনকি তুরস্ক বলেছে, তাদের কাছ থেকে তুরস্ক যা চেয়েছে, তা পেয়েছে। বলাবাহুল্য, ন্যাটো কেবল ইউরোপেই সম্প্রসারিত হচ্ছে না; এশিয়াতেও নজর দিচ্ছে। এবারের ন্যাটো সম্মেলনে প্রথমবারের মতো 'অবজারভার' হিসেবে ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিয়েছে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও নিউজিল্যান্ড।
আমরা মনে করি, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ভারসাম্য তৈরির জন্য হলেও ব্রিকস গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের যেভাবে অর্থনৈতিক উত্থান ঘটছে এবং উন্নয়নে দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে; তাতে অদূর ভবিষ্যতে ব্রিকস জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ব্রিকসের সদস্য হওয়ার সুযোগ এলে তা গ্রহণ করা উচিত। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের বৈশ্বিক অবস্থান সুসংহত হবে। মনে রাখা দরকার, এটা কোনো পশ্চিমাবিরোধী জোট নয়। উদীয়মান অর্থনৈতিক দেশগুলোর জোট হিসেবে ব্রিকস নিজ সদস্যদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা করছে।
ভবিষ্যতে ব্রিকস যে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, তা এখনই বলা যায়। এবারের সম্মেলনে পুতিনের উপস্থিতির বার্তাও স্পষ্ট। তার পরও বেইজিং ঘোষণায় যেভাবে বহুপক্ষবাদ, সুশাসন ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে; ব্রিকসের শক্তি সেখানেও। উন্নয়নশীল বিশ্বের কথা চিন্তা করে ব্রিকস যে অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণের কথা বলছে, সেটাও বিশ্বের জন্য অনুকরণীয়।
ড. দেলোয়ার হোসেন: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; প্রেষণে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সদস্য হিসেবে নিয়োজিত