আগের মতো তেড়েফুঁড়ে আসেনি সত্য; করোনাভাইরাসের নতুন ঢেউয়ের আঁচ মিলছে আশপাশেই। আগের ঢেউগুলোর মতোই নাগরিকদের মধ্যে গলা ব্যথা, সর্দি-কাশি, মাথায় যন্ত্রণার উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। পরীক্ষা করলে ক্রমাগত হারে করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হচ্ছে। বুধবারও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানা যাচ্ছে, আগের ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ১৫ হাজার জনের নমুনা পরীক্ষা করে করোনা আক্রান্তের হার ১৫ শতাংশের বেশি পাওয়া গেছে। অথচ ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত শনাক্তের সংখ্যা ১০০-এর নিচে থেকেছে; শনাক্তের হারও কখনও ১০ শতাংশের ওপের ওঠেনি। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, আমরা করোনার চতুর্থ ঢেউয়ের মুখোমুখি। খোদ প্রধানমন্ত্রী বুধবার জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনার সমাপনী বক্তৃতায় একই ইঙ্গিত দিয়েছেন। আমরা মনে করি, করোনার চতুর্থ ঢেউয়ের তিনটি মাত্রা রয়েছে।
প্রথমত, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিকল্প নেই। অতীতের তিনটি ঢেউয়ে স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে যেসব অবহেলা ও ঔদাসীন্য দেখা গেছে; এবার তার পুনরাবৃত্তি উচিত হবে না। এটাও প্রত্যাশিত যে, তিনটি ঢেউ মোকাবিলার পর বাংলাদেশের সক্ষমতা বেড়েছে। এ ছাড়া এবারের ঢেউয়ের আগেই ৭০-৮০ শতাংশ নাগরিকের টিকাদান সম্পন্ন হয়েছে বলে সরকারের পক্ষে যে দাবি করা হচ্ছে, তা বাস্তবতার কাছাকাছি। কিন্তু এটাও সত্য যে, বুস্টার ডোজ দেওয়ার ক্ষেত্রে আগের দুই ডোজের মতো উৎসাহ ও সক্রিয়তার অভাব স্পষ্ট। এটা যেমন কর্তৃপক্ষের দিক থেকে, তেমনই নাগরিকদের দিক থেকে। বুধবার সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, করোনা সংক্রমণ যখন ঊর্ধ্বমুখী, তখন বুস্টার ডোজ গতিহীন। এই চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতেই হবে।
দ্বিতীয়ত, করোনা সংক্রমণের হার যদি আরও বাড়তে থাকে, তাহলে দেশের বিভিন্ন প্রবেশপথে কড়াকড়ির বিকল্প নেই। বিশেষত এই সময়ে যখন ভারতেও করোনা সংক্রমণের হার বেড়ে চলেছে, তখন প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে স্থলবন্দরগুলোতে করোনা পরীক্ষা জোরদার করতেই হবে। দুই দেশের মধ্যে চলাচলকারী যাত্রী ও মালপত্র খালাসকারী শ্রমিকদের মাধ্যমে বাংলাদেশও সংক্রমিত হলে তা সামলানো কঠিন হয়ে যাবে। স্থলবন্দর ছাড়াও বিমান, এমনকি নৌবন্দরেও করোনা পরীক্ষার বিষয়টি যাতে বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, গত কয়েক সপ্তাহে দেশে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার যেভাবে বাড়ছে, তাতে অবহেলা ও ঔদাসীন্য আত্মঘাতী হতে পারে। এ ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতারও অবকাশ নেই। গত এক বছরে বাংলাদেশেই একাধিকবার প্রমাণ হয়েছে- কর্তৃপক্ষের গদাই লস্করি চালের জন্য করোনাভাইরাস কখনও বসে থাকে না। বিধিনিষেধ প্রতিপালনে বিন্দুমাত্র ছাড় জীবন নিয়ে খেলার নামান্তর।
তৃতীয়ত, করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বল্পোন্নত বাংলাদেশ প্রথম থেকে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা থাকলেও সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ নেই। অর্থনৈতিক সামর্থ্য, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও কারিগরি দক্ষতার কথা যদি ভাবি, তাহলে স্বীকার করতেই হবে, দক্ষিণ এশিয়া ও বাকি বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় এ পর্যন্ত আমাদের পরিস্থিতি মন্দের ভালো। একই সঙ্গে টিকাকরণ কর্মসূচিও সাধুবাদযোগ্য। এখন বুস্টার ডোজের ক্ষেত্রে ঔদাসীন্য তীরে এসে তরী ডোবার সমতুল্য হতে পারে। আমরা দেখেছি, নতুন ঢেউয়ের ক্ষেত্রে সংক্রমণ ও অভিঘাত আগের তুলনায় মৃদু হলেও চীন কিংবা ইউরোপের কোনো কোনো দেশ নতুন করে লকডাউন প্রয়োগ করেছে। বাংলাদেশ আরেকটি লকডাউন কোনোভাবেই সামলাতে পারবে না। ভুলে যাওয়া চলবে না- গত দুই বছরের করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা করে অর্থনীতি সবে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। এর মধ্যে কয়েক দফা বন্যার অভিঘাতও সইতে হয়েছে। এখন করোনার চতুর্থ ঢেউ মোকাবিলার একমাত্র উপায় হতে পারে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। করোনাভাইরাসের নতুন ঢেউ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষের অবহেলা বা ঔদাসীন্যের কারণে দেশজুড়ে ছড়িয়ে গেলে ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি যে বহুগুণে বেড়ে যাবে, তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই।

বিষয় : সম্পাদকীয়

মন্তব্য করুন