গুলশানের হলি আর্টিসান বেকারিতে ২০১৬ সালের ১ জুলাই জঙ্গি হামলায় দেশি-বিদেশি ২২ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এ জঙ্গি হামলাটি ছিল তামিম চৌধুরীর একটি পরিকল্পিত অপারেশন। তার লক্ষ্য ছিল বিশ্ববাসী এবং সিরিয়া-ইরাকের আইএসআই নেতাদের কাছে এ মেসেজ পৌঁছে দেওয়া- বাংলাদেশে আইএসআই আছে এবং তারা শক্তিশালী ও সক্রিয়। কিন্তু সেটাই হয়েছিল তাদের জীবনের কালো অধ্যায়।
তখন আমি বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি)। সিদ্ধান্ত নিলাম, যে কোনো প্রকারেই হোক হামলাকারী জঙ্গিদের মূল নেতা তামিম চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করতে হবে। ডিএমপি কমিশনার, সিটিটিসির প্রধানসহ অন্যান্য অফিসার এবং পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের অফিসারদের নিয়ে সভা করে করণীয় ঠিক করলাম। তামিম চৌধুরী ও মেজর (চাকরিচ্যুত) জিয়াকে গ্রেপ্তারের জন্য প্রত্যেকের জন্য ২০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করলাম। নারায়ণগঞ্জে তামিম চৌধুরীর আস্তানার খোঁজ পেয়ে সিটিটিসির সোয়াত টিম দিয়ে অভিযান করাই। অভিযানে তামিম চৌধুরী নিহত হয়। এর পর দেশব্যাপী আরও বড় বড় অভিযান সোয়াত টিম দিয়ে করানো হয়। বগুড়া জেলা পুলিশসহ অন্যান্য জেলা পুলিশও ছোট ছোট অভিযান করে কিছু জঙ্গি গ্রেপ্তার করে।
বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের শিকড় খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে আশির দশকের দিকে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য বাংলাদেশ থেকে কিছু সংখ্যক মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষক আফগানিস্তানে যায়। যুদ্ধ শেষে তাদের অনেকেই তালেবানের কাছ থেকে জঙ্গিবাদের দীক্ষা নিয়ে দেশে ফেরে। তারা জঙ্গি সংগঠন তৈরি করে এবং তাতে সদস্য নিয়োগের কাজ হাতে নেয়। কিছু ইসলামী এনজিও, ইসলামপন্থি কতিপয় ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ সাহায্য নিয়ে এবং তাদের নিজেদের দেওয়া চাঁদায় তারা সংগঠনের তহবিল তৈরি করে। সদস্যদের প্রশিক্ষণ ও অপারেশনের কাজে তহবিল ব্যবহূত হয়।
মাওলানা আবদুর রহমান, মুফতি হান্নান ও শায়খ আবদুর রহমান জঙ্গি সংগঠন তৈরি করে। আবদুর রহমান ও আফগান-ফেরত কতিপয় আলেম ১৯৯২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে গঠন করে হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশ, সংক্ষেপে হুজিবি। পরবর্তী সময়ে মুফতি হান্নান হুজিবিতে যোগদান করেন এবং হুজির অন্যতম নেতা হয়ে ওঠেন। হুজিবির নাম হয় হরকাতুল জিহাদ (হুজি)। শায়খ আবদুর রহমান জমিয়তে ওলামা বাংলাদেশের (জেএমবি) শীর্ষ নেতা ছিলেন। বাংলা ভাই শায়খ আবদুর রহমানের দোসর ছিলেন। সংগঠন তৈরি করেই তারা ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড শুরু করেন। মুফতি হান্নানের নেতৃত্বে হুজি ১৯৯৯ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ১৪টি নাশকতার ঘটনা ঘটিয়ে জানমালের ক্ষতি সাধন করে। তন্মধ্যে ১৯৯৯ সালে কবি শামসুর রাহমানকে হত্যার চেষ্টা, যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলা, খুলনায় আহমদিয়া মসজিদে বোমা হামলা, ২০০০ সালে শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য গোপালগঞ্জে ৭০ কেজি ওজনের বোমা পাতা, ২০০১ সালে ঢাকায় ছায়ানটের পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে বোমা হামলা, কমিউনিস্ট পার্টির সমাবেশে বোমা হামলা, গোপালগঞ্জে চার্চে বোমা হামলা, ২০০৪ সালে সিলেটে হজরত শাহজালালের মাজারে বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনারকে হত্যার জন্য বোমা হামলা উল্লেখযোগ্য। ২১ আগস্ট পল্টনে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় হুজিই প্রধান ভূমিকা পালন করে। ওই হামলায় আইভি রহমানসহ ২৪ জনকে হত্যা করা হয়। হুজিই ২০০৫ সালে হবিগঞ্জে বোমা হামলা করে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়াকে হত্যা করে।


শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বে ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট ৬৩ জেলায় ৩০০ স্থানে ৫০০ বোমা বিস্ম্ফোরণ ঘটিয়ে দেশব্যাপী আতঙ্ক সৃষ্টি করে। জেএমবি ২০০৫ সালের ১৪ নভেম্বর ঝালকাঠিতে দু'জন বিচারককে হত্যা করে। ওদিকে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম আল কায়দার আদলে গড়ে ওঠে। সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত মেজর জিয়া এ দলের নেতৃত্ব নেন। আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্যরা কয়েকজন মুক্তচিন্তার ব্লগারকে হত্যা করে।
শায়খ আবদুর রহমান, বাংলা ভাইসহ কয়েকজন জঙ্গির ফাঁসির আদেশ কার্যকর হওয়ার পর তাদের সংগঠনের সদস্যরা নিষ্ফ্ক্রিয় হয়ে আত্মগোপনে চলে যায়। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান নাগরিক তামিম চৌধুরী ২০১৩ সালে সিরিয়া হয়ে বাংলাদেশে আসে। সে আইএসআই কর্তৃক বাংলাদেশে আইএসআইর কর্মকাণ্ড চালানোর জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত হয় বলে জানা যায়। তামিম চৌধুরী
বাংলাদেশে এসে জেএমবির নিষ্ফ্ক্রিয় সদস্যদের খুঁজে বের করে তাদের আইএসআইর আদলে অতি গোপনে প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তোলে। এদের মধ্য থেকে বেশ কয়েকটি আত্মঘাতী দলও তৈরি করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আসে হলি আর্টিসানে হামলা।
হলি আর্টিসানের ঘটনাটিই ছিল জঙ্গিদের বড় অভিযান। আমাদের অভিজ্ঞতাও ছিল কম। এর পর থেকে জঙ্গি দমনে পুলিশ দক্ষতা, পারদর্শিতা, সাহস ও কৌশলগত জ্ঞান অর্জন করে। পুলিশের ইন্টেলিজেন্স, সিটিটিসির সোয়াত ও বোম ডিসপোজাল ইউনিটের সাহস ও দক্ষতাই জঙ্গি দমনে প্রধান ভূমিকা পালন করে। হলি আর্টিসানে অভিযান চালানোর জন্য সোয়াত টিম খুবই আগ্রহী ছিল। এ ধরনের অভিযান প্রথম হওয়ায় এবং রেস্টুরেন্টের ভেতরে দেশি-বিদেশি হোস্টেজ থাকায় আমি নিজ উদ্যোগে অভিযান করার জন্য বেশি আগ্রহ প্রদর্শন করিনি। সরকারের শীর্ষ মহলের সিদ্ধান্তে সেনাবাহিনীর কমান্ডো টিম অভিযান করে। পুলিশ ও র‌্যাব তাদের সহায়তা করে। এর পর সিলেটের অভিযান ছাড়া সব অভিযানই পুলিশ করে। র‌্যাবও তাদের নিজস্ব ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে জঙ্গি আস্তানা খুঁজে কয়েকটি অভিযান করে। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার জন্য আমি একটি এসওপি তৈরি করে দিই। সে অনুযায়ী পুলিশ বেশ পেশাদারিত্বের সঙ্গে জঙ্গিবিরোধী অভিযানগুলো শতভাগ সফলতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পেরেছিল।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের উন্নয়নের রোল মডেল তৈরি করেছেন। একইভাবে জঙ্গি দমনেও বাংলাদেশ একটি রোল মডেল। বিশ্বের অনেক ধনী ও শক্তিশালী দেশও জঙ্গি দমনে বাংলাদেশের মতো সফলতা লাভ করতে পারেনি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ও অনুপ্রেরণা, জনগণ ও আলেম সমাজের সহায়তায় জঙ্গি দমনে সফলতা এসেছে। বাংলাদেশ পুলিশ এখন যে কোনো সংকট মোকাবিলা করতে সক্ষম। তবে তাদের সব সময় বিভিন্ন কমিউনিটির নেতৃবৃন্দ তথা জনগণের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে কাজ করতে হবে। পুলিশ, প্রশাসন ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সব মহলের সচেতনতাই পারে দেশকে জঙ্গিমুক্ত রাখতে।
এ কে এম শহীদুল হক: সাবেক ইন্সপেক্টর জেনারেল, বাংলাদেশ পুলিশ